খুলনা | বৃহস্পতিবার | ১৯ মার্চ ২০২৬ | ৪ চৈত্র ১৪৩২

আজ শাওয়ালের চাঁদ দেখা গেলে কাল পবিত্র ঈদুল ফিতর * ঈদের প্রধান জামাত সকাল ৮টায় খুলনা সার্কিট হাউজ ময়দানে

রোজার শেষে দুয়ারে এলো ভ্রাতৃত্ব-সাম্যের ঈদ

নিজস্ব প্রতিবেদক |
০১:২৬ এ.এম | ১৯ মার্চ ২০২৬

 

‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ। তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে, শোন আসমানী তাগিদ...’ ঈদ-উল ফিতর নিয়ে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সেই বিখ্যাত গানের মতো করেই রমজানের পূর্ণ এক মাস সিয়াম সাধনার পর এলো খুশির ঈদ। 
পবিত্র ঈদুল ফিতর মুসলমানদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব। আনন্দ ও খুশির দিন। শুধু নেক বান্দাদের জন্যই খুশির দিন। যারা এক মাস ধরে সিয়াম সাধনা করেছেন, তাদের জন্যই আনন্দ ও উৎসবের দিন হচ্ছে ঈদুল ফিতর। এ দিনটি আল্লাহর কাছ থেকে পুরস্কার লাভেরও দিন। রমজানের বরকত লাভের জন্য ত্যাগ, কষ্ট-ক্লেশ ও আয়াস সাধ্য-সাধনার পর বহুল প্রতীক্ষিত ঈদ আমাদের জীবনে বয়ে আনে অনাবিল আনন্দ ও সুখ সমৃদ্ধি। 
ঈদের পূর্ণাঙ্গ আনন্দ-খুশি ও কল্যাণ অর্জন করতে হলে আরো ঘনিষ্ঠ করতে হবে আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে। সুসম্পর্ক, ঘনিষ্ঠ ও অন্তরঙ্গ করতে হবে পরিবার-পরিজনের সঙ্গে, হৃদ্যতা ও ভালোবাসার সম্পর্কের মাধ্যমে। উষ্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে বন্ধু-বান্ধব স্বজনদের সঙ্গে সহমর্মিতা ও সুন্দর ব্যবহারের মাধ্যমে।
ইসলামে ঈদের প্রবর্তন হয়েছে দ্বিতীয় হিজরির মাঝামাঝি সময়ে। আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহর রাসুল (সাঃ) যখন মদিনায় আসেন, তখন দেখেন যে সেখানকার লোকরা বছরে দু’দিন (নওরোজ ও মেহেরজান) আনন্দ করে, খেলাধুলা করে। তিনি বললেন, আল্লাহ তা’আলা তোমাদের এ দু’দিনের পরিবর্তে আরও বেশি উত্তম ও কল্যাণকর দু’টি দিন দিয়েছেন। ১. ঈদুল আযহা। ২. ঈদুল ফিতর। (আবু দাউদ, হাদিস : ১/১৬১)
ঈদের দিনে ঈদের ময়দানে উপস্থিত হয়ে নামাজ আদায় করা একটি মহিমান্বিত ঈবাদত। এই দিনটির তাৎপর্য ও গুরুত্ব অপরিসীম। এ দিনটিতে বিশ্বজগতের সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তার বান্দাদেরকে নেওয়ামাত ও অনুগ্রহ দ্বারা বারবার ধন্য করেন।
ঈদুল ফিতরের এর ঈদ শব্দটি ‘আওদ’ শব্দমূল থেকে উদ্ভূত। এর আভিধানিক অর্থ হলো ফিরে আসা, প্রত্যাবর্তন করা, বার বার আসা। আর ফিতর শব্দের অর্থ হলো, ফাটল, ভেঙে ফেলা, বিদীর্ণ করা। দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর শাওয়ালের চাঁদ দেখার সাথে সাথে রোজা ভেঙে ফেলা তথা রোজা রাখা ছেড়ে দেয়া হয় বলে এ দিনটির নাম ঈদুল ফিতর।
মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) ইরশাদ করেন, ‘ঈদুল ফিতরের দিন যখন আসে তখন আল্লাহ তা’আলা রোজাদারদের পক্ষে গর্ব করে ফেরেশতাদেরকে বলেন, হে আমার ফেরেশতাগণ তোমরাই বলো রোজাদারদের রোজার বিনিময়ে আজকের এই দিন কি প্রতিদান দেয়া যেতে পারে? সেই সমস্ত রোজাদার যারা তাদের দায়িত্ব পুরোপুরি আদায় করেছে, তখন ফেরেশতারা আল্লাহকে বলেন, হে দয়াময় আল্লাহ উপযুক্ত উত্তম প্রতিদান তাদের দান করুন। কারণ তারা দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনা করেছেন, প্রাপ্য পারিশ্রমিক তাদেরকে দান করুন।
তখন আল্লাহ তা’আলা রোজাদারদেরকে বলতে থাকেন, ‘হে আমার বান্দা তোমরা যারা যথাযথভাবে রোজা পালন করেছ, তারাবিহর নামাজ পড়েছ, তোমরা তাড়াতাড়ি ঈদগাহে মাঠে ঈদের নামাজ পড়ার জন্য যাও এবং তোমরা তোমাদের প্রতিদান গ্রহণ করো। ঈদের নামাজের শেষে আল্লাহ তা’আলা তার বান্দাদের উদ্দেশ্যে বলতে থাকেন, হে আমার প্রিয় বান্দারা আমি আজকের এ দিনে তোমাদের সকল পাপগুলোকে পুণ্যের দ্বারা পরিবর্তন করে দিলাম। অতএব তোমরা নিষ্পাপ হয়ে বাড়িতে ফিরে যাও’। 
ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের রমজান মাসের রোজার ভুলত্র“টির দূর করার জন্যে ঈদের দিন অভাবী বা দুস্থদের কাছে অর্থ প্রদান করা হয়, যেটিকে ফিতরা বলা হয়ে থাকে। এটি প্রদান করা মুসলমানদের জন্য ওয়াজিব। হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী-‘তুহরাতুল্লিস সায়িম’ অর্থাৎ একমাস সিয়াম সাধনায় মুমিনের অনাকাক্সিক্ষত ত্র“টি-বিচ্যুতির কাফফারা হলো সাদকায়ে ফিতর। ঈদের নামাজের পূর্বেই ফিতরা আদায় করার বিধান রয়েছে। 
এবার রাষ্ট্রের পক্ষে ইসলামিক ফাউন্ডেশন মাথাপিছু ফিতরা ধার্য করেছে সর্বোচ্চ ২ হাজার ৬৪০ টাকা এবং সর্বনিম্ন ১১৫ টাকা।
পরিশেষে, ঈদুল ফিতরের গুরুত্ব ও তাৎপর্য অপরিসীম। প্রত্যেক মুসলিম জীবনের ধর্মীয় করণীয়গুলো পালনের মাধ্যমে নিজেকে একজন প্রকৃত মুসলিম হিসেবে গড়ে তোলা অত্যাবশ্যক।
সৌদি আরব: সৌদি আরবে পবিত্র শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখা যায়নি। ফলে দেশটিতে ১৪৪৭ হিজরি সনের রমজান মাস ৩০ দিনে শেষ হচ্ছে। আর আগামীকাল শুক্রবার পবিত্র ঈদুল ফিতর উদ্যাপন করবেন সৌদিবাসী। বুধবার রাতে সৌদির চাঁদ দেখার খবর প্রকাশ করেছে খালিজ টাইমস।
খবরে বলা হয়েছে, সৌদি আরব ঘোষণা করেছে যে শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখা যায়নি। অর্থাৎ দেশটিতে ২০ মার্চ শুক্রবার হবে পবিত্র ঈদুল ফিতর।
আরবি বর্ষপঞ্জিকা অনুযায়ী, রমজান হলো নবম মাস। আর শাওয়াল হলো দশম মাস। এই শাওয়াল মাসের প্রথম দিনই বিশ্বব্যাপী পবিত্র ঈদুল ফিতর উদ্যাপিত হয়।
এক মাস রোজা রাখার পর শাওয়াল মাসের প্রথম দিন মুসলমানরা ঈদুল ফিতর উদ্যাপন করেন। এটি সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব। চাঁদ দেখা সাপেক্ষে এই তারিখ নির্ধারণ করা হয়।
সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলোতেও সাধারণত ঈদ উদ্যাপন হয়। অন্যদিকে বাংলাদেশে সাধারণত সৌদি আরবের একদিন পর ঈদ উদ্যাপিত হয়।
তবে আজ বৃহস্পতিবার বাংলাদেশের আকাশে পবিত্র শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখা গেলে আগামীকাল শুক্রবার পবিত্র ঈদুল ফিতর উদ্যাপিত হবে। আর বাংলাদেশের কোথাও চাঁদ দেখা না গেলে শুক্রবার রমজান মাসের ৩০ দিন পূর্ণ হবে। সেক্ষেত্রে ঈদ উদ্যাপিত হবে শনিবার। 
চাঁদ দেখা কমিটির সভা আজ : পবিত্র ঈদুল ফিতর শুক্রবার না শনিবার তা জানা যাবে আজ বৃহস্পতিবার। এদিন সন্ধ্যায় জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সভাকক্ষে ঈদুল ফিতরের তারিখ নির্ধারণে সভা করবে জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি।
বুধবার ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে অবস্থিত ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সম্মেলনকক্ষে কাল সন্ধ্যা ছয়টায় বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হবে।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, এই বৈঠকে সভাপতিত্ব করবেন ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ।
বাংলাদেশের আকাশে কোথাও শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখা গেলে ০২-৪১০৫৩২৯৪, ০২-২২৬৬৪০৫১০ ও ০২-২২৩৩৮৩৩৯৭ এই ফোন নম্বরগুলোতে জানানোর জন্য অনুরোধ করেছে ইসলামিক ফাউন্ডেশন। এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক বা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) জানানোর অনুরোধ করা হয়েছে।
শুভেচ্ছা : পবিত্র ঈদ-উল-ফিতর উপলক্ষে দেশবাসীর প্রতি আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। 
অন্যদিকে পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে নগরবাসীকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন খুলনা সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু।
অপর দিকে পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে সকল শিক্ষকমন্ডলী, কর্মকতা-কর্মচারী, শিক্ষার্থী, সাংবাদিকবৃন্দকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. মোঃ রেজাউল করিম, প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. হারুনর রশিদ খান ও ট্রেজারার প্রফেসর ড. মোঃ নূরুন্নবী।
অনুরূপ ভাবে পবিত্র ঈদ-উল-ফিতর উপলক্ষে সকলকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেরর প্রফেসর ড. মুহাম্মদ মাছুদ।
খুলনায় কর্মসূচি : পবিত্র ঈদ-উল-ফিতর যথাযোগ্য মর্যাদা ও ভাবগাম্ভীর্যের সাথে উদ্যাপনের লক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। ঈদ-উল-ফিতরের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হবে সকাল আটটায় খুলনা সার্কিট হাউজ ময়দানে। সকাল সাড়ে আটটায় খুলনা আলিয়া মাদ্রাসা সংলগ্ন মডেল মসজিদে জামাত অনুষ্ঠিত হবে। আবহাওয়া প্রতিকূল থাকলে খুলনা টাউন জামে মসজিদে  সকাল আটটায় প্রথম জামাত, নয়টায় দ্বিতীয় এবং সকাল ১০টায় তৃতীয় জামাত অনুষ্ঠিত হবে। 
এছাড়া খালিশপুর ঈদগাহ ময়দান এবং বসুপাড়া ইসলামাবাদ ঈদগাহ ময়দানে সকাল আটটায় ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হবে। 
খুলনা সিটি কর্পোরেশন : খুলনা সিটি কর্পোরেশন পরিচালিত বায়তুন নূর জামে মসজিদে পবিত্র ঈদ-উল-ফিতরের দু’টি জামায়াত অনুষ্ঠিত হবে। 
সকাল ৮টায় অনুষ্ঠিত ১ম জামায়াতে ইমামতি করবেন মসজিদের খতিব হাফেজ মাওলানা মুহাম্মদ ইমরান উল্লাহ এবং সকাল ৯টা অনুষ্ঠিত ২য় জামায়াতে ইমামতি করবেন মসজিদের ইমাম হাফেজ মাওলানা মোঃ জাকির হোসেন। কর্পারেশনের জনসংযোগ কর্মকর্তা প্রেসবিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছেন।
এছাড়া কর্পোরেশনের ব্যবস্থাপনায় ও ওয়ার্ডের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের তত্ত¡াবধানে নগরীর প্রতিটি ওয়ার্ডে পৃথক ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হবে। অন্যান্য মসজিদ ও ঈদগাহসমূহে পরিচালনা কমিটি জামাতের সময় নির্ধারণ করবেন। 
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় : পবিত্র ঈদ-উল ফিতরের নামাজের জামাত সকাল সাড়ে ৭টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে অনুষ্ঠিত হবে। এ জামাতে এবার মহিলাদের জন্য পৃথক নামাজের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
জামাত শেষে বৃহত্তর মুসলিম উম্মাহ, দেশ ও খুলনা বিশ্বদ্যিালয়ের উত্তরোত্তর সাফল্য ও সমৃদ্ধি কামনা করে মোনাজাত করা হবে। ঈদের জামাতে অংশ নেওয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও শিক্ষার্থীসহ এলাকার মুসল্লিদের আহŸান জানানো হয়েছে। 
খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় : পবিত্র ঈদ-উল-ফিতরের জামাত সকাল সকাল সাড়ে ৭টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হবে। ঈদের এই জামাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী, শিক্ষার্থী, কুয়েট পরিবারের সদস্যবৃন্দ এবং আশপাশের এলাকার মুসল্লিরা অংশগ্রহণ করবেন।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ