খুলনা | বৃহস্পতিবার | ১৯ মার্চ ২০২৬ | ৪ চৈত্র ১৪৩২

প্রোটিনের ঘাটতিতে বাড়ছে রোগের ঝুঁকি

নিত্যপণ্যের চড়া দামে অপুষ্টিতে ভুগছে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ

এস এম জাহিদ |
০১:৩৮ এ.এম | ১৯ মার্চ ২০২৬


পবিত্র মাহে রমজান বিদায়ের পথে। মুসলমানদের সিয়াম সাধনার এই মাসে বিশ্বের অনেক মুসলিম দেশে দ্রব্যমূল্য সহনীয় রাখতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাংলাদেশে প্রায়শই ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। রমজান এলেই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার অভিযোগ করেন ভোক্তারা। চাল, ডাল, তেল, শাক-সবজি, ডিম ও ব্রয়লার মুরগিসহ প্রায় সব ধরনের খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ।
বাজারে কয়েক দিনের ব্যবধানে সবজির দামও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ফলে সারা দিন রোজা রেখে ইফতার ও সেহেরির জন্য প্রয়োজনীয় খাবার জোগাড় করাই অনেক পরিবারের জন্য কঠিন হয়ে উঠেছে। অনেক ক্ষেত্রে পেট ভরে খাওয়ার ব্যবস্থা হলেও পুষ্টির চাহিদা পূরণ হচ্ছে না। এতে বাড়ছে অপুষ্টি, দুর্বলতা এবং বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘদিন প্রোটিনের ঘাটতি থাকলে শরীরে নানা অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। শিশুদের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পুষ্টি না পেলে তাদের শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। দীর্ঘমেয়াদে এই অপুষ্টি দেশের সামগ্রিক মানবসম্পদ ও উৎপাদনশীলতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচক বা গ্লোবাল হাংগার ইনডেক্স (জিএইচআই) ২০২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রায় ১১ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষ অপুষ্টিতে ভুগছে। শিশু ও নারীদের মধ্যে অপুষ্টির হার উদ্বেগজনক। দেশের মোট জনসংখ্যার ৩৫ শতাংশের বেশি মানুষ খাদ্য-নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। অপুষ্টিজনিত কারণে ২৩ দশমিক ৬ শতাংশ শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে এবং প্রায় ৩ শতাংশ শিশু জন্মের পাঁচ বছরের মধ্যে মারা যাচ্ছে। দেশে প্রায় ৩৮ লাখ ৭৮ হাজার শিশু খর্বকায় এবং ১১ শতাংশ শিশু তীব্র অপুষ্টির শিকার।
অপুষ্টি ও খাদ্য-নিরাপত্তাহীনতার প্রভাব গ্রামীণ ও শহরতলির নারীদের ওপর সবচেয়ে বেশি পড়ছে। নারীদের পুষ্টির ঘাটতি গর্ভকালীন সময়ে অনাগত শিশুর স্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
ইউএসএআইডির তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় ৫০ শতাংশ গর্ভবতী মা ও শিশু আগে থেকেই পুষ্টিহীনতায় ভুগছে। লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধির কারণে নিম্ন আয়ের মানুষ খাবারের পরিমাণ কমিয়ে দিলে ভবিষ্যতে পুষ্টিহীনতার পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দেশে গরীবের প্রোটিন হিসেবে পরিচিত ডিম ও দুধের দাম বেড়ে যাওয়ায় এর প্রভাব পড়ছে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর ওপর। বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের পুষ্টির চাহিদা পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
খুলনা নগরীর গৃহকর্মী স্বপ্না বেগম বলেন, বাজারে সবকিছুর দাম এত বেড়েছে যে ঠিকমতো কিছুই কেনা যায় না। অনেক সময় ভাতের সঙ্গে নুন-মরিচ দিয়েই দিন পার করতে হয়। এখন কাঁচা মরিচের দামও বেশি হওয়ায় শুকনা মরিচ দিয়ে ভাত খেয়ে থাকতে হচ্ছে। বাসাবাড়িতে কাজ করে যে আয় হয় তার বেশির ভাগই ঘরভাড়া ও গ্রামের পরিবারে পাঠাতে হয়। এতে নিজের জন্য পুষ্টিকর খাবার কেনা সম্ভব হয় না বলে জানান তিনি।
অন্যদিকে গৃহকর্মী নাহার বেগম জানান, ছয় সদস্যের পরিবারে তিন সন্তান ও বৃদ্ধ শাশুড়িকে নিয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। তিনি মাসে প্রায় ১০ হাজার টাকা আয় করেন এবং তার স্বামী রিকশা চালিয়ে আয় করেন প্রায় ১৫ হাজার টাকা। আগে এই আয় দিয়ে কোনোভাবে সংসার চললেও এখন বাজারদরের কারণে খেয়ে না খেয়ে দিন পার করতে হচ্ছে বলে জানান তিনি।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় শর্করা, আমিষ, ভিটামিন, খনিজ, পানি ও চর্বি, এই ছয় ধরনের উপাদানের সুষম সমন্বয় থাকা জরুরি। দৈনিক খাদ্যে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ শর্করা, ১৫ শতাংশ প্রোটিন এবং ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ স্নেহজাতীয় খাবার থাকা প্রয়োজন। কিন্তু খাদ্যতালিকায় এই ভারসাম্য না থাকলে তা মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং দীর্ঘমেয়াদে কর্মদক্ষতা কমিয়ে দেয়।
খুলনার ডেপুটি সিভিল সার্জন ডাঃ মিজানুর রহমান বলেন, দ্রব্যমূল্য বেড়ে গেলে নিম্ন আয়ের মানুষ সাধারণত পেট ভরানোর জন্য শর্করা নির্ভর খাবারের ওপর নির্ভর করেন। এতে শরীরে প্রোটিনের ঘাটতি দেখা দেয়। এর ফলে আয়রনের ঘাটতি, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া, ওজন হ্রাস এবং শিশুদের বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়।
তিনি আরও বলেন, ফল কিনতে না পারলে রঙিন শাক-সবজি থেকেও ভিটামিন ও খনিজ পাওয়া সম্ভব। গাজর, মিষ্টি কুমড়া বা বিটরুট ফলের বিকল্প হিসেবে পুষ্টির চাহিদা কিছুটা পূরণ করতে পারে। আর মাছ-মাংস বা দুধ কেনা সম্ভব না হলে ডিম ও ডাল প্রোটিনের ভালো উৎস হতে পারে। ডাল সহজলভ্য হওয়ায় পরিবারের সবার খাদ্য তালিকায় এটি রাখা জরুরি বলে তিনি পরামর্শ দেন।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ