খুলনা | শনিবার | ২১ মার্চ ২০২৬ | ৬ চৈত্র ১৪৩২

ঈদে আল-আকসা বন্ধ: ফিলিস্তিনিদের জন্য সবচেয়ে দুঃখের দিন

খবর প্রতিবেদন |
০৪:২০ পি.এম | ২০ মার্চ ২০২৬

 

পবিত্র আল-আকসা মসজিদ ফিলিস্তিনের জেরুসালেমের সবচেয়ে স্পর্শকাতর ধর্মীয় স্থান। যা ১৯৬৭ সালের পর এই প্রথম রমজানের শেষ দিকে বন্ধ করে দেয়া হয়। ফলে পবিত্র ঈদুল ফিতরের দিন মুসল্লিরা মসজিদে ঢুকতে না পারেনি। ফলে কাছাকাছি জায়গায় নামাজ আদায় করতে বাধ্য হয়েছেন মুসল্লিরা।

স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য মতে, আজ শুক্রবার (২০ মার্চ) সকালে শত শত মানুষ ওল্ড সিটি জেরুসালেম-এর বাইরে নামাজ পড়তে বাধ্য হয়েছেন। কারণ ইসরাইলি পুলিশ মসজিদে প্রবেশের সব পথ বন্ধ করে দিয়েছে।

ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের সঙ্গে ইরানের চলমান সংঘাতের কারণে নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এই কারণ দেখিয়ে ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু করে পুরো রমজানজুড়ে বেশিরভাগ মুসল্লির জন্য মসজিদ এলাকা কার্যত বন্ধ রাখা হয়। এতে হাজার লাখ লাখ ফিলিস্তিনি বাধ্য হয়ে পুরনো শহরের গেটের বাইরে নামাজ পড়েছেন।

ফিলিস্তিনিদের অভিযোগ, এটি শুধু নিরাপত্তা নয়; বরং একটি বড় কৌশলের অংশ। তারা মনে করেন, উত্তেজনাকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে আল-আকসা কমপ্লেক্সের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত করা হচ্ছে।

এই পুরো এলাকাটি মুসলিমদের কাছে ‘আল-হারাম আল-শরিফ’ নামে পরিচিত, যেখানে ডোম অব দ্য রক-সহ গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থাপনা রয়েছে। অন্যদিকে ইহুদিদের কাছে এই স্থানটি ‘টেম্পল মাউন্ট’ নামে পরিচিত, যেখানে প্রাচীনকালে প্রথম ও দ্বিতীয় মন্দির ছিল।

‘এবারের ঈদ আমাদের জন্য সবচেয়ে দুঃখের দিন’
আল-আকসা মসজিদে ঈদের নামাজ বন্ধ থাকায় জেরুজালেমের মুসলিম অধিবাসীদের মধ্যে গভীর হতাশা দেখা গেছে। ৪৮ বছর বয়সি বাসিন্দা হাজেন বুলবুল বলেন, ‘এবারের ঈদ আমাদের জন্য সবচেয়ে দুঃখের দিন হতে যাচ্ছে।’

তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ‘এটা একটি খারাপ নজির তৈরি করল—ভবিষ্যতে এমন ঘটনা আরও ঘটতে পারে। তার মতে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে জেরুজালেমে ইসরাইলের হস্তক্ষেপ অনেক বেড়েছে।’

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পুরান শহরে ফিলিস্তিনি মুসল্লি ও ধর্মীয় কর্মীদের গ্রেফতার বেড়েছে। একই সঙ্গে ইসরাইলি বসতকারীরা বারবার মসজিদ এলাকায় ঢুকছে। নামাজের সময়েও অনেককে আটক করা হয়েছে এবং অনেক ফিলিস্তিনিকে মসজিদে ঢুকতে বাধা দেয়া হচ্ছে।

সাধারণত ঈদের আগে ওল্ড সিটি জেরুসালেম-এ মানুষের ভিড় থাকে, কিন্তু এবার পুরো এলাকা প্রায় ফাঁকা ছিল। দোকানপাটও বেশিরভাগ বন্ধ রাখা হয়—শুধু ওষুধ ও প্রয়োজনীয় খাবারের দোকান খোলা ছিল। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এতে তারা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

আল-আকসার খতিব ও সাবেক গ্র্যান্ড মুফতি একরিমা সাবরি ফিলিস্তিনি মুসলিমদের আহ্বান জানান—মসজিদে ঢুকতে না পারলে যতটা সম্ভব কাছাকাছি জায়গায় ঈদের নামাজ আদায় করতে। তবে পুরান শহরের ভেতরে কড়া নিরাপত্তা, তল্লাশি ও মানুষের সঙ্গে সংঘর্ষের আশঙ্কায় উত্তেজনা বাড়ছে।

আল-আকসা মসজিদ বন্ধ রাখার ইসরাইলি সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে আরব লীগ। সংস্থাটি বলেছে, এটি আন্তর্জাতিক আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর আঘাত।

এছাড়া অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কোঅপারেশন (ওআইসি) এবং আফ্রিকান ইউনিয়ন কমিশনও এই পদক্ষেপের নিন্দা জানিয়েছে। তারা এক যৌথ বিবৃতিতে বলেছে, রমজানের মতো পবিত্র সময়ে আল-আকসা বন্ধ করা শুধু ধর্মীয় অধিকার লঙ্ঘন নয়, বরং মুসলিম বিশ্বের অনুভূতিতে আঘাত।

তাদের মতে, এই পদক্ষেপ চলতে থাকলে সহিংসতা ও উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শান্তি হুমকির মুখে পড়তে পারে।

আল-আকসা মসজিদ বন্ধ করে দেয়াকে ‘ফিলিস্তিনিদের জন্য একটি বড় বিপর্যয়’ বলে মন্তব্য করেছেন আল-কুদস ইউনিভার্সিটির প্রেসিডেন্ট অফিসের মিডিয়া ইউনিটের পরিচালক খলিল আসালি।

তিনি বলেন, অনেক তরুণ ফিলিস্তিনি যখন আল-আকসার যতটা সম্ভব কাছাকাছি গিয়ে নামাজ পড়ার চেষ্টা করেন, তখন ইসরাইলি বাহিনী তাদের ধাওয়া করে এবং নামাজরত অবস্থাতেই সেখান থেকে বের করে দেয়।

গাজার ধ্বংসস্তূপে দুঃখ ও আনন্দ
এদিকে ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় মানুষের দৈনন্দিন জীবন এখন যুদ্ধ ও মানবিক সংকটের ছায়ায় কাটছে। রমজানের শেষে বিভিন্ন দেশের মুসলিমরা যখন ঈদ উদযাপন করছেন, তখন ফিলিস্তিনি শহরগুলো ধ্বংসের কোলাহলে ঘেরা। ইসরাইলের বোমাবর্ষণ বিক্ষিপ্ত হলেও থামেনি। ফলে বহু মানুষ ধ্বংসস্তূপের মাঝেই ঈদ পালন করছেন।

৩২ বছর বয়সি মাতা সাদিকা ওমর উত্তর গাজা থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে এখন দেইর আল-বালাহে আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি বলছিলেন, ‘ঈদের আনন্দ অসম্পূর্ণ। প্রত্যেকের নিজস্ব কষ্ট আছে—কেউ বাড়ি হারিয়েছেন, কেউ পরিবার। আমার স্বামী দূরে থাকায় গাজায় ফিরতে পারেননি। তবু আমরা চেষ্টা করি ধর্মীয় নিয়ম মেনে ঈদে আনন্দ দেখানোর।’

খান ইউনিসে আশ্রয় নেয়া ৪৯ বছর বয়সি আলা আল-ফাররা বললেন, ‘যুদ্ধের প্রথম বছর রমজানে আমরা আল-ক্বারারা থেকে বিতাড়িত হয়েছি। চলমান দৈনিক হামলার কারণে চলাফেরা সীমিত, তাই এবারও ঈদ অনেকটা আগের মতোই সীমিত।’

যুদ্ধের মাসের পর সীমিতভাবে ঐতিহ্য ফিরে আসছে। ঘনবসতিপূর্ণ শিবিরে ছোট ভাঁড়ার চুলায় কায়েক ও মামুল পেস্ট্রির সুগন্ধ ছড়িয়ে যায়। বাজারে রঙিন মিষ্টি দেখা গেলেও অনেকের নাগালে পৌঁছায় না—হাত বাড়ানো হয়, তারপর ফিরে আসে, বাবা-মা ছোট ছোট কিছু কিনে শিশুরা সামান্য আনন্দ অনুভব করতে পারে।

বেশ কিছুদিন বন্ধ থাকার পর গত বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ) গাজার দক্ষিণে রাফাগ সীমান্ত ক্রসিং আবারও খুলে দেয়া হয়। এতে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের ইরানের বিরুদ্ধে হামলা শুরু হওয়ার পর প্রথমবারের মতো জাতিসংঘের একটি বহর গাজায় প্রবেশের সুযোগ পায়। তবে ঈদের আনন্দ অসমভাবে অনুভূত হচ্ছে।

গাজা সিটি থেকে ৪২ বছর বয়সি খলুদ বাবা বলছিলেন, ‘যুদ্ধবিরতির পর আপাত নিরাপত্তা কিছুটা আছে, কিন্তু যথেষ্ট নয়। শুধু গত সপ্তাহেই পশ্চিম গাজার আমাদের এলাকায় বিমান হামলার প্রস্তুতিতে মানুষকে সরানো হয়েছে, ইফতার সময়ের কাছাকাছি, কোনো জিনিস না নিয়ে চলে যেতে হয়েছে।’

নিরব ও সীমিত উদযাপনের পেছনে আছে ক্ষতি ও শোকের দৃশ্যপট: অনেক মা সাম্প্রতিক হামলায় নিহত সন্তানদের শোক পালন করছেন, কেউ কেউ স্মৃতির ওপর নির্ভর করে ঈদ পালন করছেন—ঐতিহ্য ও রীতিনীতির চেয়ে স্মৃতি এবং সামান্য আনন্দেই দিন কেটেছে।
দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন

প্রিন্ট

আরও সংবাদ