খুলনা | বৃহস্পতিবার | ০৩ এপ্রিল ২০২৫ | ১৯ চৈত্র ১৪৩১

বড় শিরক ও ছোট শিরকের হাকিকত (শিরক পর্ব-৫)

প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউসুফ আলী |
০১:১০ এ.এম | ০৮ অক্টোবর ২০২১


শিরক সবচেয়ে মারাত্মক ও ধ্বংসাত্মক। শিরকের গোনাহ অমার্জনীয়। আমাদের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করছে শিরক ও কুফরির বীজ। শিরকের বিষাক্ত ধোঁয়া গ্রাস করছে তাওহীদের ঘর, মুসলমানের অন্তরকে। ইতিপূর্বে এই কলামে আমরা জেনেছিলাম যে কিভাবে পৃথিবীতে, পবিত্র মক্কানগরী ও বায়তুল­ায় প্রথম মুর্তিপূজা ও শিরক চালু হয়েছিল। আজ আমরা জানবো বড় শিরক ও ছোট শিরক কি এবং তাদের মাঝে পার্থক্য কতটুকু। বর্তমান সময়ে শিরকের এই ভাগগুলো জানা একান্ত কর্তব্য। এগুলো জানা না থাকলে হয়ত আমরা নিজের অজান্তেই শিরকে জড়িয়ে পড়ব। ইসলামের বিজ্ঞ ওলামায়ে কেরাম কুরআন, হাদিসের আলোকে বলেছেন যে, মানুষ সাধারণত তিন ধরনের শিরকে জড়িয়ে পড়ে। এক. আল­াহ পাকের রুবুবীয়্যাত বা রবের ব্যাপারে শিরক; দুই. আল­াহ তায়ালার উলুহীয়্যাত বা ইবাদতে ব্যাপারে শিরক ও তিন. আল­াহ পাকের পবিত্র নাম ও গুণাবলীর বাপারে শিরক। তবে শিরকের মাত্রার ওপর ভিত্তি করে শিরককে আবার মোটা দাগে দুই ভাগে ভাগ করা হয়। শিরকে আকবার বা বড় শিরক এবং শিরকে আসগর বা ছোট শিরক।
শিরকে আকবার ও শিরকে আসগরের পার্থক্য :
শিরকে আকবার এবং শিরকে আসগরের মধ্যে প্রধান প্রধান পার্থক্য হলো : ১. কোন ব্যক্তি শিরকে আকবারে লিপ্ত হলে সে ইসলামের গন্ডী থেকে বের হয়ে যায়। অর্থাৎ তাকে আর মুসলিম মিল­াতের মধ্যে গণ্য করা হয় না। পক্ষান্তরে শিরকে আসগরের ফলে সে মুসলিম মিল­াত থেকে বের হয় না, তবে গোনাহগার হয়। ২. শিরকে আকবরে লিপ্ত থাকা অবস্থায় কোন মৃত্যুবরণ করলে সে চিরকাল জাহান্নামে অবস্থান করবে। পক্ষান্তরে শিরকে আসগরে লিপ্ত ব্যক্তি জাহান্নামে গেলে চিরকাল সেখানে অবস্থান করবেনা। জাহান্নামের শাস্তি ভোগ করার পর সে মহান আল­াহর করুণায় জান্নাতে প্রবেশের সুযোগ পাবে। ৩. শিরকে আকবার বান্দার জীবনের সমস্ত আমল নষ্ট করে দেয়। অর্থাৎ সে পরকালে এর কোন বদলা পাবে না। পক্ষান্তরে শিরকে আসগর সব আমল নষ্ট করেনা, বরং নির্দিষ্টভাবে সেই আমলকে নষ্ট করে যার মধ্যে শিরকে আসগর করা হয়েছে।

যেমন : হাদিসে রিয়া বা লোক দেখানো আমলকে শিরকে আসগর বলা হয়েছে। সুতরাং শিরকে আসগর করার কারণে রিয়া ও দুনিয়া অর্জনের উদ্দেশ্যে কৃত আমল বাতিল হয়ে যায়। ৪. শিরকে আকবারে লিপ্ত ব্যক্তি মুশরিকদের পর্যায়ভ‚ক্ত। এই কারণে তাদের জান-মালকে মুসলমানদের জান-মাল হিসেবে গণ্য করা হবে না। অর্থাৎ এক ব্যক্তি মুসলমান হিসেবে যে অতিরিক্ত মর্যাদা, সম্মান ও ইজ্জত পেতো সেটা সে পাবে না। পক্ষান্তরে শিরকে আসগারে লিপ্ত ব্যক্তির জান-মাল কারো জন্য হালাল নয়। তাকে মুসলমান হিসেবেই গণ্য করা হয়।
বড় শিরক কোনগুলো : বড় শিরক অনেক ধরনের হতে পারে। ইসলাম ছাড়া অন্যান্য প্রায় সকল ধর্মের মধ্যেই শিরকে আকবার বা বড় শিরকের অস্বিত্ব লক্ষ্য করা যায়। শিরকে আকবারের মধ্যে রয়েছে, মহান আল­াহকে বাদ দিয়ে তার বিভিন্ন সৃষ্টি বা মাখলুকের ইবাদত করা, তাদের সামনে মাথা নত করা, তাদের সেজদা করা, পূণ্যবান ব্যাক্তিদের কবরে সেজদা করা, তাদের কবরে মানত-নজরানা পেশ করা, তাদের কাছে দোয়া করে নিজের মনোবাঞ্চনা পেশ করা, পূজার বেদীতে অর্ঘ অর্পন করা, পশু কুরবানি করা, ঈসা (আ:) কে আল­াহর পুত্র সাব্যস্ত করা (নাউজুবিল­াহ), সূর্য ও চন্দ্রের পূজা করা, পূণ্যবান ব্যাক্তিদের আল­াহ পর্যন্ত পৌঁছানোর একমাত্র মাধ্যম মনে করা ইত্যাদি ইত্যাদি।
ছোট শিরক কোনগুলো : ছোট শিরক প্রধানত দুই প্রকারের হয়ে থাকে। প্রথম প্রকার : এ প্রকারের শিরক কথা ও কাজের ক্ষেত্রে হয়ে থাকে। যেমন : মহান আল­াহ ব্যতীত অন্য কিছুর নামে কসম ও শপথ করা। এক হাদিসে রসূলুল­াহ সল­াল­াহু আলাইহিস সালাম বলেন “যে ব্যক্তি গাইরুল­াহ বা আল­াহ ছাড়া অন্য কারও কসম করল, সে কুফুরী কিংবা শিরক করল’ (তিরমিযী, মুসতাদরাক হাকিম)। অনুরূপভাবে এমন কথা বলা যে, আল­াহ এবং তুমি যেমন চেয়েছো। কোন এক ব্যক্তি মহানবী সল­াল­াহু আলাইহিস সাল­ামকে “আল­াহ এবং আপনি যেমন চেয়েছেন” কথাটি বললে তিনি বললেন, “তুমি কি আমাকে আল­াহর সাথে সমকক্ষ স্থির করলে? বরং বল, আল­াহ এককভাবে যা চেয়েছেন” (নাসায়ী)। আর কাজের ক্ষেত্রে ছোট শিরকের উদাহরণ হলো : এরুপ বিশ্বাস করা যে সূতা, দাগা বাঁধা, তাবীজ-কবজ ইত্যাদি রোগ সারাতে পারে ও বিপদাপদ দূর করতে পারে। এসব ব্যাপারে যদি এ বিশ্বাস থাকে যে, এগুলো বলা-মসীবত দূর করার মাধ্যম ও উপকরণ, তাহলে তা হবে শিরকে আসগর। কেননা মহান আল­াহপাক এগুলোকে সে উপকরণ হিসেবে সৃষ্টি করেননি। তবে কুরআনের আয়াতের মাধ্যমে ঝাঁড়-ফুঁক করা জায়েজ আছে, যা একটি স্বতন্ত্র বিষয়। দ্বিতীয় প্রকার : গোপন শিরক হলো শিরকে আসগর বা ছোট শিরকের আর একটি ধরণ। এ প্রকার শিরকের স্থান হলো ইচ্ছা, সঙ্কল্প ও নিয়তের মধ্যে। যেমন লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে ও প্রসিদ্ধি অর্জনের জন্য কোন আমল করা। এক হাদিসে এসেছে, যে ব্যাক্তি লোক দেখানো নামায পড়ল সে শিরক করল, সে লোক দেখানো দান করল সে শিরক করল, যে লোক দেখানো রোযা রাখল সে শিরক করল। অর্থাৎ আল­াহ তায়ালার নৈকট্য অর্জন করা যায় এমন কোন কাজ করে তা দ্বারা মানুষের প্রশংসা লাভের ইচ্ছা করা। যেমন সুন্দর ভাবে নামায আদায় করা, কিংবা সদকা করা এ উদ্দেশ্যে যে, মানুষ তার প্রশংসা করবে, অথবা স্বশব্দে যিকির-আযকার পড়া ও সুললিত কন্ঠে তেলাওয়াত করা যাতে তা শুনে লোকজন তার গুণগান করে। যদি কোন আমলে রিয়া তথা লোক দেখানোর উদ্দেশ্য সংমিশ্রিত থাকে, তাহলে আল­াপাক তা বাতিল করে দেন। রাসূলে পাক সল­াল­াহু আলাইহিস সালাম এরশাদ করেন : “তোমাদের উপর আমি যে জিনিসের ভয় সবচেয়ে বেশি করছি তা হল শিরকে আসগর। সাহাবায়ে কেরাম (রা.) জিজ্ঞেস করলেন : ইয়া রসূলাল­াহ! শিরকে আসগর কি? তিনি বললেন : রিয়া বা লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে আমল করা” (আহমদ, ইবনে মাজাহ)। পার্থিব লোভে পড়ে কোন আমল করাও এ প্রকার শিরকের অন্তর্গত। যেমন কোন ব্যক্তি শুধু মাল-সম্পদ অর্জনের জন্যেই হজ্জ করে, কিংবা শরয়ী জ্ঞান অর্জন করে বা জিহাদ করে ইত্যাদি।
পরিশেষে একটি কথা মনে রাখতে হবে, শিরকে আসগর বান্দাকে যদিও ইসলামের গন্ডী থেকে বের করে দেয় না, তবে তার ঈমান ও আক্বীদায় ত্র“টি ও কমতির সৃষ্টি করে। শিরকে আসগর বা ছোট শিরক ধীরে ধীরে বান্দাকে শিরকে আকবারে লিপ্ত করে সর্বনাশ ঘটাতে পারে। যেমন ছোট আগুন থেকে বড় আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকে। মহান আল­াহ পাক আমাদের সবাইকে সহিহ বুঝ দান করুন এবং সব ধরনের শিরক থেকে বেঁচে থাকার তৌফিক দান করুন।
(লেখক : মৎস্য-বিজ্ঞানী ও অধ্যাপক, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়।)

্রিন্ট

আরও সংবদ

অন্যান্য

প্রায় ৩ মাস আগে