খুলনা | সোমবার | ০১ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১৬ অগ্রাহায়ণ ১৪৩২

এ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছা ব্যবহার বন্ধ করুন

|
১২:৪৮ এ.এম | ২৮ নভেম্বর ২০২৫


এ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছা ও অতিরিক্ত ব্যবহার জনস্বাস্থ্যের জন্য কত বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে যাচ্ছে, সরকারের রোগতত্ত¡, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইইডিসিআরের পর্যবেক্ষণে তার স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলেছে। গত বছরের জুলাই থেকে এ বছরের জুন পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৯৬ হাজার রোগীর নমুনা পরীক্ষার ফলাফলে মিলেছে, ৪১ শতাংশ আইসিইউ রোগীর ক্ষেত্রে প্রচলিত কোনো এ্যান্টিবায়োটিক কাজ করছে না। সব মিলিয়ে ৭ শতাংশ রোগীর শরীরে এ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী প্যান-ড্রাগ-রেজিট্যান্স বা পিডিআর পাওয়া গেছে। এ তথ্য নিশ্চিত করেই স্বাস্থ্য খাতের নীতিনির্ধারক, চিকিৎসক ও নাগরিকদের জন্য এখনই সজাগ হওয়ার জন্য সতর্কবার্তা।
গত শতকের বিশের দশকে এ্যান্টিবায়োটিকের আবিস্কার চিকিৎসাবিজ্ঞানে যুগান্তর সৃষ্টি করেছিল। মৃত্যুহার নাটকীয়ভাবে কমানো ও গড় আয়ু বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এ্যান্টিবায়োটিকের ভূমিকা সর্বাগ্রে। শিশু, বৃদ্ধ, দুর্বল ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাহীন মানুষের জন্য এ্যান্টিবায়োটিক জীবন রক্ষাকারী। এ ছাড়া কাটাছেঁড়া, অগ্নিদগ্ধ, অস্ত্রোপচারের রোগীদের জীবন রক্ষায় এ্যান্টিবায়োটিক ভূমিকা রাখে। কিন্তু কঠিন অসুখ হলেও এ্যান্টিবায়োটিকের কল্যাণে রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে-এই বিশ্বাসে চিড় ধরেছে। কেননা সা¤প্রতিক বছরগুলোতে কার্যকর এ্যান্টিবায়োটিকের সংখ্যা কমে আসছে। ফলে অণুজীব ও জীবাণুগুলো এ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী হয়ে উঠেছে। চরম ক্ষমতাধর এসব জীবাণুকে বিজ্ঞানের পরিভাষায় বলা হয় সুপারবাগ-সাক্ষাৎ এই মৃত্যুদূত বিশ্বজুড়ে জনস্বাস্থ্যবিদদের দুশ্চিন্তার প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশের মতো অত্যধিক জনবহুল ও অপ্রতুল স্বাস্থ্যসেবার একটি দেশে কার্যকর এ্যান্টিবায়োটিকের সংখ্যা কমে আসার ঝুঁকি অনেক বেশি। মহামারির চেয়েও বড় স্বাস্থ্যগত বিপদ আসন্ন জেনেও আমরা এখন পর্যন্ত এ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে কোনো নীতিমালা করতে পারিনি। ফলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের চিকিৎসাপত্র ছাড়াই পাড়ার মোড়ের ফার্মেসিগুলোতে দেদার এ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি হয়। চিকিৎসা সেবা ব্যয়বহুল হওয়ায় অনেকেই চিকিৎসকের কাছে না গিয়ে ফার্মেসি থেকে এ্যান্টিবায়োটিক নেন, আবার অনেক চিকিৎসকও প্রয়োজনে, অপ্রয়োজনে এক বা একাধিক এ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের পরামর্শ দেন। এ্যান্টিবায়োটিকের এই অপ্রয়োজনীয় ও অতিব্যবহারই জীবাণুকে এ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী করে তুলছে। কৃষি, গবাদিপশু, মুরগি, ডিম ও মাছ উৎপাদনের ক্ষেত্রেও নিয়ন্ত্রণহীন ও অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে এ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার করছেন খামারিরা। খাদ্যের মাধ্যমে মানুষের শরীরে এ্যান্টিবায়োটিক প্রবেশ করছে এবং জনস্বাস্থ্যের ওপর তার প্রভাব গিয়ে পড়ছে। ফলে খাদ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রেও এ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন।
আইইডিসিআরের গবেষকেরা সতর্ক করেছেন, এান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (এএমআর) বর্তমানে দেশে বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। এটিকে তাঁরা দেশের সবচেয়ে বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি বলে শনাক্ত করেছেন। এখনই নিয়ন্ত্রণমূলক ও কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে এক দশকের মধ্যেই চিকিৎসা খাতে বড় সংকট তৈরি হবে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, স্বাস্থ্যের নীতিনির্ধারক, স্বাস্থ্যকর্মী ও জনসাধারণের মধ্যে এ নিয়ে সচেতনতার বড় ধরনের ঘাটতি আছে। এই বিপদ এড়ানোর একমাত্র পথ হচ্ছে এ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার কমানো।
এ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার কমাতে ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টির পাশাপাশি এটি ব্যবহারের নীতিমালা প্রণয়ন করা জরুরি। চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়া এ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি যেকোনো মূল্যে বন্ধ করতে হবে। ফার্মেসিগুলোকে তদারকি ও নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আনা প্রয়োজন। গবাদিপশু, মাছ, মুরগি উৎপাদনে এ্যান্টিবায়োটিকের ঢালাও ব্যবহার বন্ধ করতে হবে।

্রিন্ট

আরও সংবদ