খুলনা | সোমবার | ০১ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১৬ অগ্রাহায়ণ ১৪৩২

নগরীতে ডাবল মার্ডারের ঘটনায় আটক নেই, হয়নি মামলা : শঙ্কিত আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীরা, নিরাপত্তা জোরদারের দাবি

আদালত পাড়ায় প্রকাশ্যে মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি, পড়ে গেলে এলোপাতাড়ি কোপ

নিজস্ব প্রতিবেদক |
০১:২৩ এ.এম | ০১ ডিসেম্বর ২০২৫


সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবসে রোববার খুলনার আদালতপাড়া ছিল মানুষে ঠাসা। মহানগর দায়রা জজ ও চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বাইরে সড়কেও ছিল মানুষের ভীড়। ভর দুপুরে এমন মানুষের সামনে হেঁটে এসে মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি করা হয় দুই যুবককে। গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে গেলে ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাদের এলোপাতাড়ি কোপানো হয়। মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর আবার ওই সড়ক দিয়েই পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। দুপুর সোয়া ১২টার দিকে মহানগর দায়রা জজ ও চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের সামনে ঘটে এই ঘটনা। ঘটনাস্থল থেকে দু’টি মোটরসাইকেল, ধারালো অস্ত্র ও এক রাউন্ড তাজা গুলি, গুলির খোসা উদ্ধার করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। রাতে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত এ ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত কাউকে আটক করতে পারেনি পুলিশ। 
নিহতরা হলেন, ফজলে রাব্বি রাজন ও হাসিব হাওলাদার। এর মধ্যে রাজন রূপসার বাগমারার দক্ষিণডাঙ্গা এলাকার ইজাজ শেখের ছেলে। হাসিব নগরীর নতুন বাজার এলাকার মান্নান হাওলাদারের ছেলে। 
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, অস্ত্র মামলায় হাজিরা দিতে মহানগর দায়রা জজ আদালতে এসেছিলেন রাজন ও হাসিব। হাজিরা দিয়ে প্রধান ফটক থেকে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ৬ থেকে ৭ জনের একটি দল রাজনের ঘাড়ে চাপাতি দিয়ে কোপ দেয়। অপর একজন এসে তার মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি করে। একই সময় হাসিবকে গুলি করে। তারা মাটিতে পড়ে গেলে কয়েকজন ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকে। এ সময় আশপাশের মানুষ নিরাপদ স্থানে সরে যান। কিছুক্ষণ পর আরও কয়েকটি ফাঁকা গুলি ছোড়ে দুর্বৃত্তরা। এরপর তারা পূর্বপাশের সড়ক দিয়ে চলে যায়। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন পুলিশসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা।
হত্যাকান্ডের সময় মহানগর দায়রা জজ ও চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের ভবনের বারান্দায় শত শত মানুষ দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাদেরই একজন মোবাইলে হত্যাকান্ডের ভিডিও ধারণ করেন। 
ওই ভিডিও চিত্রে দেখা যায়, আদালত চত্বরের সীমানা প্রাচীরের গা ঘেঁষে এক যুবক পড়ে আছে। আরেক যুবক রাম দা দিয়ে তাকে কুপিয়ে যাচ্ছে। এ সময় পিস্তল হাতে আরও কয়েকজন যুবক আশপাশে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। কিছুসময় পর পূর্বপাশের সড়ক দিয়ে দলবেঁধে চলে যাচ্ছেন তারা।
এ ঘটনার কারণে পুরো আদালত চত্বরে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক। প্রকাশ্যে হত্যাকান্ডের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন আদালতের আইনজীবীরা।
আইনজীবী ও পুলিশের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নগরীর সোনাডাঙ্গা থানায় দায়ের হওয়া একটি অস্ত্র মামলায় হাজিরা দিতে রোববার সকালে আদালতে যান রাজন ও হাসিব। তাদের সঙ্গে আরও কয়েকজন ছিল। তাদের হত্যার উদ্দেশ্যে আগে থেকেই ৬ থেকে ৭ জন দুর্বৃত্ত সার্কিট হাউজ ও আশপাশের সড়কে অপেক্ষায় ছিল। হাজিরা দিয়ে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা হত্যাকান্ড ঘটায়।
খুলনা সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শফিকুল ইসলাম জানান, রাজন শীর্ষ দুর্বৃত্ত পলাশের সহযোগী। তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্রসহ ছয়টি মামলা রয়েছে। গত মার্চ মাসে সোনাডাঙ্গা থানায় দায়ের করা অস্ত্র মামলার ৬জন এজাহারভুক্ত আসামিদের একজন ছিলেন রাজন। ওই মামলায় সন্দেহভাজন আসামী হিসেবে হাসিব হাওলাদারকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। মামলার চার্জশিটে দু’জনেরই নাম রয়েছে। এজন্য দু’জন একসঙ্গে আদালতে যান।
মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারী কমিশনার (মিডিয়া) মোঃ রোকনুজ্জামান বলেন, আদালতের সামনে গুলিবিদ্ধ দুইজনকে স্থানীয়রা উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। ঘটনাস্থলে হাসিব নিহত হন। আর রাজনকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে তার মৃত্যু হয়। তারা দুইজনই সন্ত্রাসী পলাশ বাহিনীর সদস্য বলে জানা গেছে। তাদের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে। শুনেছি আদালতে হাজিরা দিতে গিয়েছিলেন। 
পুলিশের আরেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, নগরীতে শীর্ষ দুই সন্ত্রাসী গ্র“পের দ্বন্দ্বের জেরধরে এরআগেও একাধিক হত্যাকান্ড ঘটেছে। কিছুদিন আগে কারাগারের ভেতরেও দুই গ্র“পের হাতাহাতি হয়। এর প্রেক্ষিতে কারাগারে থাকা সন্ত্রাসীদের দেশের বিভিন্ন কারাগারে স্থানান্তর করা হয়। পুরানো দ্বন্দ্বের জেরে এই হত্যাকান্ড ঘটেছে কিনা যাচাই করে দেখা হচ্ছে।
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার জুলফিকার আলী হায়দার বলেন, বিচারকদের পরামর্শ অনুযায়ী আদালতের চত্বরে পুলিশ সদস্যরা দায়িত্ব পালন করেন। ঘটনাটি আদালত চত্বরের বাইরে হয়েছে। আমরা বিভিন্ন সোর্স কাজে লাগিয়ে হত্যার কারণ ও জড়িতদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি।
প্রসঙ্গত, অভ্যুত্থানের পর গত ১৬ মাসে নগরীতে ৪৮টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে সন্ত্রাসীদের অভ্যন্তরীণ বিরোধ, মাদক ও আধিপত্য বিস্তারের জেরে হত্যাকান্ড হয়েছে ২০টি। এর প্রতিটিতেই আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার হয়েছে।
অন্যদিকে, খুলনায় আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি বিশেষ করে আদালত অঙ্গনে দিনে দুপুরে লোমহর্ষক জোড়া খুনের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন খুলনা জেলা আইনজীবী সমিতি নেতৃবৃন্দ। 
বিবৃতিতে সমিতির আহবায়ক কমিটির আহবায়ক এড. আব্দুল্লাহ হোসেন বাচ্চু ও সদস্য সচিব শেখ নুরুল হাসান রুবা আদালত অঙ্গনে নিরাপত্তা জোরদারসহ খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নে পুলিশ প্রশাসনসহ দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের আরো কঠোর ভূমিকা গ্রহণের আহবান জানান।

্রিন্ট

আরও সংবদ