খুলনা | রবিবার | ২৪ অক্টোবর ২০২১ | ৮ কার্তিক ১৪২৮

সংগ্রামী নারী উদ্যোক্ততা তাসনিমের গল্প

খুব কষ্টে জমানো মাটির ব্যাংকের ১০০০ টাকা নিয়ে ‘বীরাঙ্গনা’র পথচলা

স্নিগ্ধা মৌ |
১২:৩৫ এ.এম | ০৯ অক্টোবর ২০২১


২০১২ সালে গ্রাম থেকে শহরে আসা মেয়েটার মনের মধ্যে অনেক স্বপ্ন, না বলা অনেক কথা। সপ্তম শ্রেণিতে পড়া মেয়েটি ততদিনে শিখে গিয়েছে জীবন সহজ না, বেশ জটিল। বাবার কাজ নেই, মায়ের হাতের কাজ আর নকশী কাঁথা সেলাই একমাত্র ভরসা। ছোট ভাইসহ ৪ জনের সংসারে অভাব অতিথি নয়, নিত্যদিনের সঙ্গী। এমন সময় সাহায্য এলো মামা বাড়ি থেকে। শহরে মামা বাড়ি থেকে পড়ার সুযোগ পেল তাসনিয়া তাসনিম। মায়ের আঁচল ছেড়ে আসাটা কঠিন ছিল, কিন্তু ছোট তাসনিয়া বুঝতে পেরেছিল এটাই সুযোগ। ‘বীরাঙ্গনা’-এর ত্বত্বাধিকারী তাসনিয়া তাসনীম ২০১২ সালে খুলনায় আসেন। ২০১৬ সালে এসএসসি পর টিউশনি শুরু। ততদিনে বাড়ির অবস্থা আরো খারাপ। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত টিউশনি, রাতে নিজের পড়া। মামা বাড়ির সাহায্য ছিলো বলেই এতকিছু সম্ভব হচ্ছিল। কিন্তু তাদেরও সীমাবদ্ধতা আছে। এছাড়া প্রতিদিন মানুষের বাসায় ঘুরে ঘুরে নেতিবাচক অভিজ্ঞতাও কম হয়নি। তাসনিয়া তখন চেষ্টা করছে নিজে কিছু করার। অনলাইন প্লাটফর্ম তখন সবে মাত্র আস্থা অর্জন করতে শুরু করেছে। ফেসবুকে নানান পোস্ট দেখে তাসনিয়াও ভাবে, যদি আমিও কিছু করতে পারতাম। বাইরে থেকে পণ্য আনা তো বেশ খরচের বিষয়। পুঁজি বলতে তেমন কিছুই নেই হাতে। মেয়ে বলেই গহনার প্রতি আকর্ষণ আজন্ম। মায়ের নকশী কাঁথা সেলাইয়ের শিল্পী সত্তা তাসনিয়ার ভিতরকে নাড়া দিলো। খুব কষ্টে জমানো মাটির ব্যাংকের ১০০০ টাকার নিয়ে যেদিন প্রথম তাসনিয়া গহনা তৈরির জন্য কাঁচামাল কিনতে মার্কেটে যায়, তখন ভয়ে তার বুক কাঁপছে। এতগুলো টাকা যদি নষ্ট হয়ে যায়? সেদিনের ভয়কে জয় করা সহজ ছিল না। তবে সেই ভয়কে জয় করতে পারাটাই জীবন বদলে দিলো তাসনিয়া তাসনিমের। খুলনা শহরের অনলাইন প্লাটফর্মে বেশ পরিচিত নাম বীরাঙ্গনা। নামের মধ্যেই যেন ঝলসে উঠছে নিজের অব্যক্ত কথামালা। ২০২০ সালের  ২০ ফেব্র“য়ারিতে বীরাঙ্গনা নামে এক অপরাজিতার পথ চলা শুরু। ১০০০ টাকার মূলধন থেকে ৭৩০ টাকার কাঁচামাল কিনে বাসায় ফিরে সারা রাত জেগে তৈরি হয় স্বপ্নেরা, গহনারা। নিজের হাতে তৈরি করে নানা ধরনের, নানা ডিজাইনের গহনা। প্রথম প্রথম কষ্ট হতো খুব, কোন প্রশিক্ষণ ছিল না। শুধু ছিল বুকভরা বিশ^াস। রাতের পর রাত জেগে গহনা তৈরির করে লাভ কি হবে, সেটা নিয়ে বাড়ির লোক চিন্তিত। আপত্তি আসলো ব্যবসা নয়, অন্য কিছু করো। তর্কে বা সম্মুখ যুদ্ধে না গিয়ে তাসনিয়া বেছে নিলো নিরবতা। প্রতিবাদ নয়, শুধু শান্ত থেকে বুঝালো আমি ব্যবসাই করতে চাই। ২০২০ সালের ২৮ ফেব্র“য়ারিতে একটি দুল বিক্রি হলো ১১০ টাকায়। প্রচন্ড খুশিতে যখন আনন্দ সবার সাথে ভাগ করে নিতে চাইলো তাসনিয়া, শুনলো প্রতিবেশীদের নেতিবাচক নানান কথা। ১১০ টাকাতেই এত খুশি? মেয়ে মানুষ কি ব্যবসা পারে? অনলাইন আজ আছে কাল নেই। ব্যবসায়ী মেয়েকে কে করবে বিয়ে? মেয়ে এখন লাগাম ছাড়া হয়ে যাবে ইত্যাদি। ডেলিভারি দিয়ে বাসায় ফিরতে দেরী হলে বাঁকা চাহনীসহ তিক্ত কথার ঝুড়িতো আছেই। সেই সময় সবচেয়ে বেশি পাশে ছিল পরিবার। বাবা-মা, মামাসহ পরিবারের সকলে ততদিনে বুঝে গেছে আমাদের মেয়ে সঠিক পথেই আছে। সুতরাং বাইরের চাপের মুখে পরিবার একটি তখন ঢাল। প্রথম ৭ মাস ব্যবসার একটা টাকাও নিজের ব্যক্তিগত কাজে খরচ করেনি তাসনিয়া। ততদিনে সে বুঝে গেছে, মূলধন যেহুতু কম তাই ব্যবসা দিয়েই মূলধন বাড়াতে হবে। আর সেটা করতে হবে নিজেকেই। ব্যক্তিগত খরচ শূন্যের কোঠায় আনতে হয়েছে, রাতভর পরিশ্রম তো আছেই। সাথে নিজের পড়াশোনা। থেমে যাওয়া যাবে না, এটাই ছিল তাসনিয়ার মূল মন্ত্র। গ্রাম থেকে আসা যে মেয়েটা শহরের কিছু চিনতো না, সেই মেয়েটার কাছে এখন শহরের অলিগলি মুখস্ত। অনলাইন প্লাটফর্মে বেশ পরিচিত মুখ। পণ্যের বিভিন্নতার পাশাপাশি ক্রেতার পছন্দ মতো গহনা তৈরি করে দেওয়া হয় বীরাঙ্গনা পেজ থেকে। দুল, নেকপিস, আংটি, নথ, টিকলি, ব্রেসলেট, চুড়ি, পায়েল, নুপূর, ব্রাইডাল এবং ননব্রাইডাল খোপা, হলুদের গহনা, ব্রাইডাল সেটসহ নানান গহনার সমাহার আছে বীরাঙ্গনার পেজে, আছে ভিন্ন ভিন্ন ডিজাইন। 
‘কেন গহনার ব্যবসা’ এমন প্রশ্নের উত্তরে তাসনিয়া বলেন, ‘নারীর সাজসজ্জায় গহনার কোন বিকল্প নেই। আমিও নারী বলেই বোধহয় আকর্ষণ বেশি কাজ করে। আমি সব সময় চাই সকলের জন্য গহনা তৈরি করতে। দামী গহনার পাশাপাশি হাতের নাগালে মধ্যে সাশ্রয়ী দামের অনেক গহনা আছে বীরাঙ্গনার কাছে। ইচ্ছেগুলো যেন টাকার কাছে হেরে না যায় এটাই ছিল আমার চাওয়া।’ করোনার মধ্যে ক্রমাগত লকডাউন, সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব তাসনিয়াকেও বাধাগ্রস্ত করছে কিন্তু থামিয়ে দিতে পারেনি। লকডাউনে গহনা তৈরি থাকলেও ডেলিভারি দিতে পারেননি সময়মতো, দোকান বন্ধ থাকায় অর্ডার পেয়েও বেশ কিছু অর্ডার ক্যানসেল করতে হয়েছে। তবে ক্রেতারা সব সময়ই বিষয়টি বুঝেছে। 
গত দেড় বছরের অর্জনের কথা বলতে গিয়ে অশ্র“সিক্ত বীরাঙ্গনার প্রতিষ্ঠাতা তাসনিয়া তাসনিম বলেন, ‘অর্থনৈতিক স্বাধীনতার পাশাপাশি পরিচিতি পেয়েছি, পেয়েছি অগণিত মানুষের ভালোবাসা। আমার ক্রেতারাই আমার শক্তি। আমি সবচেয়ে বেশি ভাগ্যবান কারণ আমার রিপিটেড কাস্টমার অনেক বেশি। ক্রেতা ধরে রাখতে সমর্থ হয়েছে বীরাঙ্গনা। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার প্রসঙ্গে বলেন, আমার জীবনসঙ্গীও আমার কাজকে ভীষণ ভালোবাসেন। তাকে নিয়েই এগিয়ে যেতে চাই। খুলনার বাইরেও অনেক প্রোডাক্ট বিক্রি করছি, তবে বীরাঙ্গনার আরো ব্যাপকতা তৈরি করতে চাই। বীরাঙ্গনা যেন আরো অনেক বীরাঙ্গনার স্বপ্ন পূরণে সঙ্গী হয়, এটাই প্রত্যাশা।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ