খুলনা | বৃহস্পতিবার | ২৬ মার্চ ২০২৬ | ১১ চৈত্র ১৪৩২

শুকরিয়া আদায় করে দোয়া ও মোনাজাত পরিচালনা করেন নিজেই

দেশের ১৮তম এ্যাটর্নি জেনারেল ঝিনাইদহের কৃতি সন্তান রুহুল কুদ্দুস কাজল

বিশেষ প্রতিবেদক ও ঝিনাইদহ প্রতিনিধি |
০১:৫২ এ.এম | ২৬ মার্চ ২০২৬


সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজলকে দেশের ১৮তম এ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। বুধবার এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে আইন মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগের সলিসিটর অনু বিভাগ।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, সংবিধানের ৬৪(১) অনুচ্ছেদের ক্ষমতাবলে রাষ্ট্রপতি সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার মোঃ রুহুল কুদ্দুস কাজলকে পুনরাদেশ না দেওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশের এ্যাটর্নি জেনারেল পদে নিয়োগ প্রদান করেছেন, তা অবিলম্বে কার্যকর হবে।
এর আগে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজলকে দেশের ১৮তম এ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে নিয়োগ দেয় সরকার। তার জন্ম ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলায়।
চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের পর ১৭তম এ্যাটর্নি জেনারেল হন বিএনপিপন্থী আইনজীবী মোঃ আসাদুজ্জামান। তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে তিনি পদত্যাগ করে বিএনপি থেকে নির্বাচন করেন। ঝিনাইদহের একটি আসন থেকে বিজয়ী হয়ে তিনি ইতোমধ্যে বিএনপি সরকারের আইনমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন। 
এদিকে নিয়োগ পাওয়ার পর বুধবার বিকেল ৫টা ১০ মিনিটে এ্যাটর্নি জেনারেল তার নিজ কার্যালয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এ সময় তিনি কিছু প্রয়োজনীয় নথিতে স্বাক্ষর করেন। শেষে তিনি শুকরিয়া আদায় করে নিজেই দোয়া ও মোনাজাত পরিচালনা করেন।
নিয়োগ পাওয়ার পর ব্যারিস্টার কাজল সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমার অন্যতম লক্ষ্য দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত করা। আমার এই সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে যখন দায়িত্ব পালন করবো তখন আমার কাছে এটাই মূল বিষয় থাকবে। এটা বাংলাদেশের মানুষেরও দীর্ঘদিনের প্রত্যশা।’ 
তিনি আরও বলেন, ‘বিচার বিভাগের প্রতি মানুষের আস্থা হীনতার একটা ব্যাপার আছে। আমার আরেকটি দায়িত্ব হবে আমার সহকর্মীদের নিয়ে মানুষের সেই আস্থা ফিরিয়ে আনা। মানুষ যাতে অযথা হয়রানির শিকার না হয়। রাষ্ট্রীয় ভাবে কোন অন্যায়ের সম্মুখীন না হয় সে দিকটাও লক্ষ্য রাখা। আমি মনে করি আমার এই দায়িত্বটা অনেক কঠিন তবে, রাষ্ট্রের কল্যাণের জন্য যা করণীয় তাই করতে পারবো।’ নবনিযুক্ত এ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘জুলাই বিপ্লব পরবর্তীতে অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার গঠিত হয়েছে, তারা অনেক সুন্দর দায়িত্ব পালন করছেন এবং মানুষের প্রত্যাশা পূরণে কাজ করে যাচ্ছেন। এই সরকারের সাথে আমিও সুন্দরভাবে কাজ করতে পারবো বলে আমি মনে করি।’
এর আগে গত ২৭ ডিসেম্বর এ্যাটর্নি জেনারেল মোঃ আসাদুজ্জামান ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন। পরে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে আইনমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ওই সময় থেকে এ্যাটর্নি জেনারেলের পদটি শূন্য ছিলো। গতকাল ব্যারিস্টার কাজলকে নিয়োগের মাধ্যমে শূন্য পদটি পূরণ করা হলো।
ব্যারিস্টার মোঃ রুহুল কুদ্দুস কাজল আইনজীবীদের মধ্যে একজন জনপ্রিয় নেতা। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীদের ভোটে পরপর তিনবার (২০২০-২১, ২০২১-২২, ২০২২-২৩) বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছেন। তিনিই এই সমিতির সর্বশেষ নির্বাচিত সম্পাদক। এ ছাড়া সারাদেশের আইনজীবীদের ভোটে তিনি বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন এবং বর্তমানে বার কাউন্সিলের এক্সিকিউটিভ কমিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি ১৯৯৫ সালে ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের আইনজীবী হিসেবে আইন পেশা শুরু করেন। ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হিসেবে প্রাকটিসের অনুমতি লাভ করেন। ২০০৮ সালে দেশের সর্বোচ্চ আদালত অর্থাৎ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। ২০২৩ সালে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ তাকে সিনিয়র এড. হিসেবে স্বীকৃতি দেন।
সাংবিধানিক আইনের বিভিন্ন জটিল ব্যাখ্যা-সংক্রান্ত বিষয়ে অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে আদালতে সর্বোচ্চ আদালতে বিশেষজ্ঞ মতামত প্রদান করেছেন। আইনের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ সংক্রান্ত তার মতামত বাংলাদেশের জাতীয় গণমাধ্যমে বিশেষজ্ঞ মতামত হিসেবে প্রকাশ করা হয়। জুলাই আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে উচ্চ আদালতের স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হলে বেশ কয়েকটি অতি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক মামলার শুনানিতে অংশগ্রহণ করেন। এর মধ্যে ষোড়শ সংশোধনী রিভিউ মামলা, পঞ্চদশ সংশোধনী মামলা, ডক্টর ইউনূস সরকারের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা রিটের বিপক্ষে শুনানিতে তার সাবমিশন আইনজীবী মহলে অত্যন্ত প্রশংসনীয় হয়েছে। 
এ ছাড়া তত্ত¡াবধায়ক সরকারের বৈধতা সংক্রান্ত ত্রয়োদশ সংশোধনী রিভিউ মামলায় তিনি বিচারপতি খায়রুল হকের রায়ের আইনগত ত্র“টিগুলো সূ² পর্যালোচনা আদালতে উপস্থাপন করেন, রিভিউয়ের স্কোপ এবং জাজমেন্টের সংজ্ঞা বিষয়ে তার সাবমিশন বিচারকগণ অতি গুরুত্বসহকারে গ্রহণ করেন। ওই মামলায় তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ডক্টর সৈয়দ রেফাত আহমেদের অনুরোধে তিনি সফররত নেপালের প্রধান বিচারপতির উপস্থিতিতে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন, যা আইনজীবীদের মধ্যে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছে।
এ ছাড়া বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের পক্ষে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলাসহ বিভিন্ন মামলার শুনানিতে তার দক্ষতা বিশেষভাবে আলোচিত হয়। ক‚টনীতিক হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা তার রয়েছে। তিনি বাংলাদেশ সরকারের ক‚টনৈতিক কর্মকর্তা হিসেবে যুক্তরাজ্য-এ বাংলাদেশ হাইকমিশনে ২০০৩-০৬ মেয়াদে কর্মরত ছিলেন। এছাড়া তিনি দৈনিক দিনকালে কিছুদিন সাংবাদিকতাও করেছেন।
পেশাগত জীবনের মতো শিক্ষাজীবনেও ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল প্রতিটি ধাপে মেধার স্বাক্ষর রেখে কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়েছেন।
তিনি ১৯৮৬ সালে যশোর বোর্ড থেকে প্রথম বিভাগে এসএসসি পাস করেন। ১৯৮৮ সালে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় যশোর বোর্ডের সম্মিলিত মেধা তালিকায় অষ্টম স্থান অর্জন করেন। ১৯৯৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি (অনার্স) এবং ১৯৯৪ সালে এলএলএম পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন। পুনরায় ২০০৫ সনে যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন থেকে এলএলবি (অনার্স) ডিগ্রি লাভ করেন। ২০০৬ সালে সিটি ইউনিভার্সিটি থেকে বার ভোকেশনাল কোর্স সম্পন্ন করেন। অতঃপর তিনি ২০০৬ সালে যুক্তরাজ্যের লিংকনস ইন থেকে ব্যারিস্টার-এট-ল’ সনদ অর্জন করেন। 
তিনি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ভারত, চীন, জাপানসহ বিভিন্ন দেশে আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার-সংক্রান্ত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে অংশগ্রহণ করেছেন। তিনি আন্তর্জাতিক বার এ্যাসোসিয়েশন, কমনওয়েলথ ল’ এ্যাসোসিয়েশন এবং ল এশিয়ার সদস্য। একজন বিশেষজ্ঞ আইনজীবী হওয়ার পাশাপাশি তিনি রাজনীতিতেও সক্রিয় ভ‚মিকা পালন করেছেন। ছাত্রজীবনে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় আইন বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে বিএনপি’র কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য এবং জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম কেন্দ্রীয় কমিটির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। 
তিনি বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া তিনি সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সম্পাদক ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সাবেক ছাত্র ব্যারিস্টার কাজল ১৯৯৬ সালে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সদস্য হন। 
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি কর্তৃক গঠিত আইন সহায়তা সেলের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ওই নির্বাচনে বিএনপি’র প্রায় অর্ধশতাধিক প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচন কমিশনে এবং সুপ্রিম কোর্টে আইনি লড়াইয়ে নেতৃত্ব দেন।
জুলাই আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে তিনি বিএনপি’র প্রতিনিধি দলের সদস্য হিসেবে অংশগ্রহণ করেন এবং সংবিধান ও বিচার বিভাগ-সংক্রান্ত সংস্কার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ মতামত প্রদান করেন। সাংবিধানিক ও ফৌজদারি আইনে বিশেষ দক্ষতার পাশাপাশি, পেশাজীবীদের নেতা হিসেবে ও জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা পালন করার কারণে একজন যোগ্য নেতা ও দক্ষ প্রশাসক হিসেবে তিনি সুপরিচিত এবং অত্যন্ত জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ