খুলনা | রবিবার | ২৪ অক্টোবর ২০২১ | ৮ কার্তিক ১৪২৮

সফলতা পেলেন ডুমুরিয়ার কৃষক মৃত্যুঞ্জয়

প্রথম বারের মতো খুলনায় তরমুজের নির্যাস দিয়ে গুড় উৎপাদন, নাম ‘তোগুড়’

মোহাম্মদ মিলন |
১২:৫৫ এ.এম | ১০ অক্টোবর ২০২১


তরমুজের গুড়। শুনলেই অবাক লাগবে। লাগারই কথা। কারণ এতোদিন খেজুর, আখ তালের গুড়ের নাম শুনেছি ও খেয়েছি। কিন্তু তরমুজের আবার গুড় কিভাবে হয়? এমন প্রশ্ন সকলের মনেই। হ্যাঁ-সত্যিই এবার প্রথম বারের মতো তরমুজের নির্যাস দিয়ে গুড় উৎপাদন করে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন ডুমুরিয়া উপজেলার ছোটবন্ড গ্রামের কৃষক মত্যুঞ্জয় মন্ডল। বিক্রয়যোগ্য নয়, এমন ছোট ও বাতিল সাইজের তরমুজ থেকে পরীক্ষামূলকভাবে গুড় তৈরি করে সফলতাও পেয়েছেন তিনি। সুঘ্রাণ ও মিষ্ট এই গুড়ের নাম দেওয়া হয়েছে ‘তোগুড়’। অর্থাৎ তরমুজ থেকে যে গুড় হয় সেটিই তোগুড়। 
তরমুজ থেকে গুড় তৈরির পরিকল্পনা আসলো কিভাবে? এমন প্রশ্নের জবাবে তরুণ কৃষক মৃত্যুঞ্জয় মন্ডল বলেন, দীর্ঘদিন ধরে তরমুজের চাষ করছি। তরমুজ চাষে সফলতাও পেয়েছি। চাষ করতে যেয়ে দেখি প্রতিবছরই মৌসুমের কিছু কিছু তরমুজ সাইজে ছোট হয়। ছোট আকৃতির এই তরমুজ ‘ক্যাট’ নামে পরিচিত। এই তরমুজ বিক্রি করা যায় না। এগুলো বিক্রি হয় না এবং অনেক সময় মাঠেই থেকে যায়। কোন কোন সময় বৃষ্টিতে পচে এগুলোর দুর্গন্ধ সৃষ্টি হয়। আবার কিছু কিছু ক্যাট মাছ ও গবাদী পশুর খাবার হিসেবে ব্যবহার করে থাকি। একদিন হঠাৎ মনে হলো-খেজুর ও তালের রস থেকে গুড় হয়, তাহলে তরমুজের রস থেকে কেন হবে না? এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি অফিসার মোসাদ্দেক হোসেনের পরামর্শ নিয়েছি। কিছুদিন আগে আমি ও আমার স্ত্রী বিক্রয়যোগ্য নয় এমন ছোট আকারের তরমুজ দিয়ে পরীক্ষামূলকভাবে গুড় উৎপাদনের চেষ্টা করি। ২০/২৫ কেজি তরমুজ থেকে ৫/৬ কেজি পরিমাণ নির্যাস (রস) হয়। সেই রস জ্বালিয়ে গুড় তৈরি করি। প্রথম দফায় সফলতা আসে। এই গুড় দেখতে খেজুরের গুড়ের মতোই। খুব মিষ্টি ও খেতে মধুর মতো। 
তিনি আরও বলেন, এই পর্যন্ত ১০/১২ কেজি গুড় তৈরি করেছি। কৃষি কর্মকর্তা ও স্থানীয় সংসদ সদস্যকে দিয়েছি। পাড়া-প্রতিবেশীদেরও দিয়েছি। আর কিছু গুড় ৩০০ টাকা কেজি দরে বিক্রিও করেছি। চাহিদা রয়েছে। অনেকেই গুড় কিনতে চেয়েছেন। 
মৃত্যুঞ্জয় ছোট আকারের তরমুজ (ক্যাট) নিয়ে কোন রকম মেশিন ছাড়া একেবারে দেশীয় প্রযুক্তি ব্যবহার করে তোগুড় উৎপাদন করছেন। মৃত্যুঞ্জয় বলেন, এ বছর তেমন ক্যাট নেই। ফলে গুড়ও বেশি হবে না। তবে ভবিষ্যতে এই ক্যাট দিয়ে প্রচুর পরিমানে গুড় উৎপাদনের ইচ্ছা রয়েছে। গুড়ের দামও ভালো পাবো বলে আশা করছি।  
কৃষক মৃত্যুঞ্জয়ের স্ত্রী মিতালী মন্ডল বলেন, তরমুজ কেটে মিষ্টি লাল অংশ বের করতে হয়। সেই লাল অংশটুকু থেকে রস বের করতে হয়। পরে নেট দিয়ে ছেকে জুস বের করে চুলায় জ্বালাতে হবে। জ্বালাতে জ্বালাতে এক সময় রস গাঢ় হয়ে আসবে। তখন উপরে এক ধরনের ফ্যানা তৈরি হয়। সেই ফ্যানা উপর থেকে উঠিয়ে ফেলে দিতে হবে। আরও কিছুক্ষণ জ্বালালে রস গুড়ের রং ধারণ করবে। তখন বোঝা যাবে গুড় তৈরি হয়েছে। 
ডুমুরিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মোঃ মোছাদ্দেক হোসেন বলেন, খুলনা যেহেতু উপকূলীয় লবণাক্ত এলাকা। এখানে তরমুজ চাষের অত্যন্ত উপযোগী। ডুমুরিয়ায় এই প্রথম তরমুজ দিয়ে গুড় তৈরি করে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন কৃষক মৃত্যুঞ্জয়। কৃষিক্ষেত্রে দারুণ এক অর্জন। দেশের গুড় শিল্প দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। একদিকে তাল, খেজুর গাছের সংখ্যা অপর দিকে গাছির সংখ্যা কমে যাচ্ছে। ফলে, অদূর ভবিষ্যতে গুড় শিল্প হুমকির দিকে চলে যাচ্ছে। ফলে তরমুজের গুড় দেশের গুড়ের চাহিদা মেটাতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে।  
তিনি বলেন, সিজনে কৃষক অনেক সময় ন্যায্যমূল্য পায় না এবং তরমুজের ক্যাটগুলো বিক্রি হয় না। বাণিজ্যিক ভাবে তরমুজ নিয়ে গুড় তৈরি করলে কৃষক একদিকে যেমন তার উৎপাদিত পণ্যের ন্যয্য মূল্য পাবে, অন্যদিকে ফসল অপচয় রোধ হবে।
সিনিয়র এই কৃষি কর্মকর্তা বলেন, তরমুজের গুড়ের গুণগতমান খুব ভালো। খেতেও খুব সুস্বাদু। বর্তমানে এই গুড় ৩০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করা হচ্ছে।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ