খুলনা | রবিবার | ২৯ মার্চ ২০২৬ | ১৪ চৈত্র ১৪৩২

চিতলমারীতে শেখ পরিবার ও বিশ্বাস পরিবারের সংঘর্ষ # এলাকা জুড়ে আতঙ্ক # পুরুষ শূন্য দুই বংশের বেশির ভাগ পরিবার

খোলা আকাশের নিচে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরে ক্ষতিগ্রস্ত ৪০ পরিবার, মানবেতর জীবন যাপন

নিজস্ব প্রতিবেদক, বাগেরহাট ও চিতলমারী প্রতিনিধি |
০১:৫৮ এ.এম | ২৯ মার্চ ২০২৬


বাগেরহাটের চিতলমারী উপজেলার চিংগড়ী ও মচন্দপুর গ্রামের দুই বংশের সংঘর্ষ, ভাঙচুর, বসতবাড়ি লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের দুই দিন পার হলেও এলাকাজুড়ে আতঙ্ক বিরাজ করছে। পুরুষ শূন্য দুই বংশের বেশির ভাগ পরিবার। খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবন যাপন করছেন ভাঙচুর ও আগুনে ক্ষতিগ্রহমশ ৪০ পরিবারের নারী-শিশুসহ অন্যান্য সদস্যরা। খাদ্যসামগ্রী ও রান্নার স্থান নষ্ট হওয়ায় শুক্রবার (২৮ মার্চ) দুপুরে সবার জন্য এক স্থানে বড় পাত্রে খাবার রান্না হয়েছে। গোসল, পয়নিস্কান ও দৈনন্দিন কাজের জন্য প্রচন্ড বিড়ম্বনায় পরতে হচ্ছে নারী ও শিশুদের।
প্রতিহিংসার আগুনে বসতঘর ক্ষতিগ্রহমশ  মৃত আবু তৈয়বের স্ত্রী রহিমা বেগম বলেন, আমি ভিক্ষা করে খেতাম। সব শেষ হয়ে গেছে। ঘটনার দিন রাতে ও গতকাল তো আমরা কেউ ঘুমাতে পারিনি। ঘর, খাবার স্থান সবইতো আমাদের ধ্বংস হয়ে গেছে। শুধু আমার না সবারই এরকম অবস্থা। যার দুইতলা ভবন আছে, তারাও দুপুরে আমাদের সাথে খেয়েছে।
বাবলু শেখ নামের এক ব্যক্তি বলেন, যে ধ্বংসযজ্ঞ ও লুটপাট চালিয়েছে এটা বর্ননা করা খুবই কঠিন। মনে হয়েছে আমরা একটি যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে গেছি। আমাদের বাড়িঘর ধ্বংসহমশূপে পরিণত হয়েছে। আমাদের রাজিব মারা গেছে, আমাদের স্বর্নালঙ্কার ও মূল্যবান মালামাল যেমন লুট করেছে, তেমনি ঘরে আগুন দিয়ে সব শেষ করে দিয়েছে। আমরা এর বিচার চাই। প্রশাসনের সবাই তো এসেছিল কই কিছুতো হয়নি বলে আক্ষেপ করেন বাবলু।
এদিকে ঘটনার দুইদিন পরেও আতঙ্কে রয়েছেন চিংগড়ী ও মচন্দপুর দুই এলাকার মানুষই। গ্রেফতার আতঙ্কে বাড়ি ছাড়া বিশ্বাস ও শেখ পরিবারের বেশির ভাগ পুরুষ সদস্য। আর বিশ্বাস পরিবারের নারীরা রয়েছেন শেখ পরিবারের হামলার শঙ্কায়। গতকাল থেকে সংসারের মূল্যবান মালামাল সরিয়ে নিচ্ছেন এলাকার বাইরে।
ফারুক বিশ্বাসের স্ত্রী রহিমা খানম বলেন, এর আগে যখন আলম শেখ হত্যা হয়েছিল তখনও শেখ পরিবারের লোকজন আমাদের বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালিয়েছিল। সেই ভয়ে আমরা যতটুকু পারছি সবকিছু বাইরে সরিয়ে নিচ্ছি। আর পুরুষরাতো ভয়ে এলাকা ছাড়া। কখন যে কি হয় জানিনা। তবে পুলিশ ও প্রশাসনের প্রতি আমাদের একটিই দাবি তদন্তপূর্বক এই সমস্যার সমাধান করা।
নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, বুধবার যে ঘটনা ঘটেছে এতে কয়েকজন মারা গেলেও অস্বাভাবিক কিছু হত না। শত শত মানুষ একবারে আক্রমণ করেছে। তার আগে দফায় দফায় ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া ও ইট মারামারি হয়েছে। আমরা এলাকাবাসীও আতঙ্কে রয়েছি, কখন কি হয়।
জানাযায়, মধুমতির মধুমতি নদীর চরের জমি ও আধিপত্য বিহমশারকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন চিংগড়ী ও মচন্দপুর গ্রামের বিশ্বাস ও শেখ বংশের মধ্যে বিরোধ চলে আসছে। এর জেরে বৃহস্পতিবার বিকেলে আরিফ শেখ নামের এক যুবককে ফুলকুচি (লোহার সিকের  তৈরি এক ধরনের মাছধরা অস্ত্র) দিয়ে আঘাত করে বিশ্বাস বংশের লোকেরা। পরে শেখ পরিবার ও বিশ্বাস পরিবারের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষ শুরু হয়। পরে বিশ্বাস বংশের লোকেরা শেখ পরিবারের বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ওও অগ্নিসংযোগ করে। এতে অন্তত ৪০টি বাড়িঘর ধ্বংসহমশূপে পরিণত হয়। আর শেখ বংশের সদস্য রাজিব শেখ নিহত হয়।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে পারিবারিক কবরস্থানে রাজিবের দাফন সম্পন্ন হয়েছে। এদিকে ঘটনার দুইদনি পার হলেও, ক্ষতিগ্রহমশ শেখ পরিবারের পক্ষ থেকে কোন মামলা করা হয়নি। চিতলমারী থানা পুলিশ বাদী হয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, দেশী অস্ত্র নিয়ে মহড়াসহ বিভিন্ন বিষয়ে দ্রুত বিচার আইনে একটি মামলা করেছেন। মামলায় বিশ্বাস বংশের দুইজনকে গ্রেফতার ও রাম দা, টেটা, কাহেমশসহ বেশকিছু দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করেছে পুলিশ। গ্রেফতারকৃতরা হলেন, বিশ্বাস বংশের সদস্য আবুল খায়ের বাবুল (৫০) এবং মোঃ হোসেন উকিল (৩৫)। 
এদিকে ঘটনার দু’দিন পার হয়ে গেলেও, ক্ষতিগ্রহমশ পরিবারগুলো এখনও কোন খাদ্য সহায়তা পায়নি। চিতলমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ক্ষতিগ্রহমশদের জন্য শুকনো খাবার দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। আর যাদের বাড়ি-ঘর ক্ষতিগ্রহমশ হয়েছে তারা আবেদন করলে টিনসহ অন্যান্য সহায়তা প্রদান করা হবে বলে জানান এই কর্মকর্তা।
চিতলমারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোঃ নজরুল ইসলাম বলেন, ঘটনাস্থলে এখনও পুলিশ রয়েছে। পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে। বিশৃঙ্খলার ঘটনায় দ্রুত বিচার আইনে পুলিশ বাদী হয়ে একটি মামলা করা হয়েছে। দুইজনকে গ্রেফতার ও কিছু দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। হত্যা, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও ভরুঙচুরের ঘটনায় ক্ষতিগ্রহমশদের পক্ষ থেকে এজাহার প্রাপ্তি সাপেক্ষে মামলা গ্রহণ করা হবে। 

প্রিন্ট

আরও সংবাদ