খুলনা | শনিবার | ০৩ জানুয়ারী ২০২৬ | ১৯ পৌষ ১৪৩২

খালেদা জিয়ার নামাজে জানাজা : এমন অভূতপূর্ব শোক-শ্রদ্ধা ইতিহাসে বিরল

|
১২:১৭ এ.এম | ০৩ জানুয়ারী ২০২৬


সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি’র চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জানাজা যেভাবে জনতার মহাসমুদ্র হয়ে উঠেছিল, এমন ঘটনা আমাদের ইতিহাসে বিরল। গত বুধবার ঢাকা পরিণত হয়েছিল সত্যিকারের শোকের রাজধানীতে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে আপসহীনতা, ত্যাগ, উদারতা ও ঐক্যের প্রতীক হয়ে ওঠা খালেদা জিয়ার প্রতি শেষশ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানাতে দলমত নির্বিশেষে স্বতঃস্ফূর্ত জনতার ঢল নেমেছিল। জানাজাস্থল মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ ও সংসদ ভবন এলাকা ছাপিয়ে রাজধানীর প্রায় সবকটি সড়কে সারি বেঁধে মানুষ জানাজায় অংশ নেন। এর বাইরে পুরো দেশেই তাঁর গায়েবানা জানাজায় অগণিত মানুষ শরিক হন। একজন রাজনৈতিক নেতার অন্তিম বিদায়ে এমন অভূতপূর্ব দৃশ্য বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের জন্য একটি মাইলফলক, এর রাজনৈতিক তাৎপর্যও বহুমুখী।
খালেদা জিয়াকে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়। প্রধান উপদেষ্টা ও অন্যান্য উপদেষ্টা, বিভিন্ন মত ও আদর্শের রাজনৈতিক দলের নেতা এবং ৩২টি দেশের কূটনীতিকেরা উপস্থিত হয়েছিলেন তাঁর শেষকৃত্যে। খালেদা জিয়াকে শেষশ্রদ্ধা জানাতে এসেছিলেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর, পাকিস্তানের পার্লামেন্টের স্পিকার সরদার আইয়াজ সাদিক, শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিজিতা হেরাথ, নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বালা নন্দা শর্মা, ভুটানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডি এন ধুংগিয়েল ও মালদ্বীপের প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত ও দেশটির উচ্চশিক্ষামন্ত্রী আলী হায়দার আহমেদ। এ উপস্থিতি প্রমাণ করে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে খালেদা জিয়া কতটা মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোতে গুরুত্বের সঙ্গে খালেদা জিয়ার প্রয়াণের খবর প্রকাশিত হয়েছে। এর পাশাপাশি ভারত ও পাকিস্তানের প্রভাবশালী সংবাদপত্রগুলো সম্পাদকীয় লিখেছে। রাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশ একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর দায়িত্ব নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকার জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছে। পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের সামনে দেশকে গণতান্ত্রিক পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি সামাজিক অস্থিরতা ও রাজনৈতিক বিভাজনের মতো বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। 
দলীয় গণ্ডি পেরিয়ে মানুষের কাছে খালেদা জিয়ার এ অসামান্য জনপ্রিয়তার উৎস তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে আপসহীনতার চর্চা। তিনবার প্রধানমন্ত্রী ও দু’বার বিরোধী দলের নেতা হিসেবে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রাকে অব্যাহত রাখতে তিনি অসামান্য ভূমিকা রেখেছেন। রাজনৈতিক কারণে তিনি শুধু অন্যায় জেল, জুলুম ও নির্যাতনের শিকার হননি; ব্যক্তিগতভাবে ট্র্যাজেডিরও মুখোমুখি হয়েছেন। তাঁর বড় ছেলে তারেক রহমানকে ১৭ বছর ধরে নির্বাসিত জীবন যাপন করতে হয়েছে। মালয়েশিয়ায় তাঁর ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যু হয়েছে। হাসিনা সরকারের আমলে তাঁকে নিজ বাসভবন থেকে উচ্ছেদ করা হয়, দুর্নীতির মিথ্যা মামলায় তাঁকে দীর্ঘদিন জেলের নিঃসঙ্গ সেলে আটক রাখা হয়, করোনা মহামারিকালে গৃহবন্দী অবস্থায় রাখা হয়। এমনকি কারাগারের অমানবিক পরিবেশে অসুস্থতা বাড়লেও তাঁকে বিদেশে চিকিৎসার অনুমতি দেওয়া হয়নি। এমন অমানবিক নির্যাতনের পরও তিনি প্রতিহিংসার রাজনীতি পরিহারের আহŸান জানিয়েছিলেন। এই সবকিছুই খালেদা জিয়ার প্রতি জনতার প্রশ্নহীন সমর্থন ও সহমর্মিতা তৈরি করেছে।
বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় খালেদা জিয়ার অভিভাবকত্ব সবচেয়ে বেশি জরুরি ছিল। আমরা মনে করি, খালেদা জিয়ার শারীরিক মৃত্যু হলেও রাজনীতিতে তিনি যে ভালোবাসা, ত্যাগ ও উদারতার উদাহরণ রেখে গেছেন, সেই উত্তরাধিকার শুধু বিএনপি নয়; অন্যান্য রাজনৈতিক দলের জন্যও বহন করা জরুরি কর্তব্য। বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে লিখেছেন, যেখানে তাঁর মায়ের পথচলা থেমেছে, সেখান থেকে তিনি চেষ্টা করবেন সেই পথযাত্রাকে এগিয়ে নিতে।
খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, সেটা পূরণ হওয়ার নয়। একজন রাজনৈতিক নেতার জানাজায় জনতার এমন ঢল প্রমাণ করে, গণতন্ত্র ও নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির প্রতি দেশের মানুষের সমর্থন কতটা অকুণ্ঠ। খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক আদর্শকে ধারণ করে দেশকে গণতান্ত্রিক পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াটাই তাঁর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের সবচেয়ে সেরা পথ।

্রিন্ট

আরও সংবদ