খুলনা | বুধবার | ০৭ জানুয়ারী ২০২৬ | ২৪ পৌষ ১৪৩২

মোস্তাফিজ ইস্যুতে শশী থারুর

‘বাংলাদেশ পাকিস্তান নয়, এই পরিস্থিতি আমরাই ডেকে এনেছি’

খবর প্রতিবেদন |
০৫:১৮ পি.এম | ০৫ জানুয়ারী ২০২৬


ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (আইপিএল) থেকে বাংলাদেশের তারকা বাঁহাতি পেসার মোস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে নজিরবিহীন কূটনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতির জন্য ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই) ও উগ্রবাদী গোষ্ঠীর চাপের তীব্র সমালোচনা করেছেন ভারতের লোকসভার সদস্য ও কংগ্রেস নেতা শশী থারুর।

এদিকে, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ২০২৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে ভারতে দল না পাঠানোর চূড়ান্ত ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। এমনকি আজ তথ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বাংলাদেশে আইপিএল-এর ম্যাচ সম্প্রচার ও প্রদর্শন না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

মোস্তাফিজকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তকে ‘অপ্রয়োজনীয় ও অযৌক্তিক’ আখ্যা দিয়ে শশী থারুর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) লিখেছেন, ‘এতে আশ্চর্যের কিছু নেই। এই বিব্রতকর পরিস্থিতি আমরা নিজেরাই ডেকে এনেছি।’

সম্প্রতি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে থারুর ভারতের বর্তমান অবস্থানকে সরাসরি আক্রমণ করে বলেন, ‘বাংলাদেশ পাকিস্তান নয়। বাংলাদেশ সীমান্ত পেরিয়ে সন্ত্রাসী পাঠাচ্ছে না। পরিস্থিতি মোটেও তুলনাযোগ্য নয়।’ তিনি আরও যোগ করেন, ভারতের প্রতিবেশী নীতিতে বাংলাদেশ এবং পাকিস্তানকে এক করে দেখা একটি মস্ত বড় ভুল। থারুরের মতে, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের যে গভীরতা, তা পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের চেয়ে যোজন যোজন দূরে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, কেন দুই দেশের সম্পর্ককে একটি সরল সমীকরণে ফেলে জটিল করা হচ্ছে। তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের একটি ভিডিও শেয়ার করে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে লেখেন, ‘শি ইজ রাইট, অ্যালাস।’

ওই ভিডিওতে রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘আমাদের আবেগে আঘাত লেগেছে। আমরা অবশ্যই কড়া প্রতিক্রিয়া জানাব। যে যুক্তিতে মোস্তাফিজকে বাদ দেওয়া হয়েছে সেটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’ তিনি যুক্ত করেন, ‘যখন দুটি দেশের মধ্যে রাজনৈতিক উত্তেজনা থাকে, তখন সাংস্কৃতিক বিনিময় এবং ক্রীড়া সেটি প্রশমনে সহায়তা করে। কিন্তু সেটি হয়নি।’

২০২৬ আইপিএলের নিলামে রেকর্ড ৯ কোটি ২০ লাখ রুপিতে কলকাতা নাইট রাইডার্স (কেকেআর) মোস্তাফিজকে দলে নিয়েছিল, যা আইপিএল ইতিহাসে কোনো বাংলাদেশি ক্রিকেটারের সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক। কিন্তু ১৮ ডিসেম্বর ময়মনসিংহের ভালুকায় এক পোশাক শ্রমিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভারতের কিছু উগ্র ধর্মীয় সংগঠন মোস্তাফিজের অংশগ্রহণের বিরোধিতা শুরু করে। উগ্রবাদীদের হুমকির মুখে বিসিসিআই সেক্রেটারি দেবাজিৎ সাইকিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে কেকেআর-কে নির্দেশ দেন মোস্তাফিজকে বাদ দিতে। বিসিসিআই-এর এমন ‘রাজনৈতিক প্রভাবে নতি স্বীকার করা’ সিদ্ধান্ত ক্রীড়াঙ্গনে বড় বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

মোস্তাফিজকে বাদ দেওয়ার পর বাংলাদেশে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। গতকাল রোববার বিসিবির এক বিবৃতিতে জানানো হয়, বর্তমান পরিস্থিতিতে খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিয়ে ‘ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের’ কারণে বাংলাদেশ জাতীয় দল টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে ভারতে যাবে না। বিসিবি ইতিমধ্যে আইসিসি-কে চিঠি দিয়ে তাদের সব ম্যাচ শ্রীলঙ্কায় সরিয়ে নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে।

উল্লেখ্য, ২০২৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ যৌথভাবে ভারত ও শ্রীলঙ্কায় হওয়ার কথা এবং বাংলাদেশের গ্রুপ পর্বের অধিকাংশ ম্যাচ কলকাতার ইডেন গার্ডেন্সে নির্ধারিত ছিল।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে ফেসবুকে লিখেছেন, ‘উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর কাছে নতি স্বীকার করে বাংলাদেশের ক্রিকেটার মোস্তাফিজুর রহমানকে দল থেকে বাদ দেওয়ার জন্য কেকেআর-কে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আমি এর তীব্র নিন্দা জানাই। আমরা কোনো অবস্থাতেই বাংলাদেশের অবমাননা মেনে নিব না। গোলামির দিন শেষ!’ তিনি আরও জানান, চুক্তিবদ্ধ থাকা সত্ত্বেও যেখানে একজন ক্রিকেটার নিরাপদ নন, সেখানে পুরো দল ভারতে নিরাপদ বোধ করতে পারে না। প্রয়োজনে বাংলাদেশে আইপিএলের সম্প্রচার বন্ধ করে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়েও তিনি তথ্য উপদেষ্টাকে অনুরোধ জানিয়েছেন। আজ ইতিমধ্যে তথ্য মন্ত্রণালয় সেই নির্দেশ জারি করেছে।

এই স্নায়ুযুদ্ধের ফলে ২০২৬ বিশ্বকাপের আবেদন বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে। বিশেষ করে ৭ ফেব্রুয়ারি কলকাতার ইডেন গার্ডেন্সে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে বাংলাদেশের ম্যাচ দিয়ে বিশ্বকাপ শুরুর কথা থাকলেও বর্তমান প্রেক্ষাপটে তা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। আইসিসি এই দ্বিপক্ষীয় উত্তেজনা নিরসনে কী ভূমিকা নেয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।

্রিন্ট

আরও সংবদ