খুলনা | বৃহস্পতিবার | ০৮ জানুয়ারী ২০২৬ | ২৪ পৌষ ১৪৩২

অপরাজনীতির অবসান হোক

|
১২:২৫ এ.এম | ০৭ জানুয়ারী ২০২৬


গুম, বাংলাদেশের সা¤প্রতিক ইতিহাসে বহুল আলোচিত একটি শব্দ। বিগত দেড় দশকে বাংলাদেশে গুমের যে অপসংস্কৃতি গড়ে তোলা হয়েছিল, গুমসংক্রান্ত ‘কমিশন অব ইনকোয়ারি’র চূড়ান্ত প্রতিবেদনে তার এক ভয়াবহ ও পৈশাচিক চিত্র ফুটে উঠেছে। গত রোববার প্রধান উপদেষ্টার কাছে জমা দেওয়া এই প্রতিবেদনটি কেবল একটি নথি নয়, বরং এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে কলঙ্কময় অধ্যায়ের প্রামাণ্য দলিল।
কমিশনের ভাষ্য মতে, ২০০৯ সাল থেকে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুমের প্রধান উদ্দেশ্যই ছিল মূলত রাজনৈতিক। কমিশনের কাছে জমা পড়া এক হাজার ৯১৩টি অভিযোগের মধ্যে এক হাজার ৫৬৯টিই গুম হিসেবে শনাক্ত হয়েছে। তবে প্রকৃত সংখ্যাটি যে চার থেকে ছয় হাজার পর্যন্ত হতে পারে। কমিশন সদস্যদের এমন আশঙ্কা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে গুমের শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে বড় একটি অংশই ছিল প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মী। এর চেয়েও বড় শঙ্কার বিষয় হলো, গুমের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বয়ং সরাসরি নির্দেশদাতা হিসেবে সম্পৃক্ত ছিলেন বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। তাঁর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ও তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নামও এই নৃশংসতায় সরাসরি যুক্ত।
প্রতিবেদনে বর্ণিত ‘আয়নাঘর’ এবং বলেশ্বর নদে লাশ গুম করার তথ্যগুলো গা শিউরে ওঠার মতো। কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, বরিশালের বলেশ্বর নদ ছিল লাশ গুমের প্রধান ক্ষেত্র। এছাড়া বুড়িগঙ্গা ও মুন্সীগঞ্জেও অসংখ্য লাশ ফেলে দেওয়ার প্রমাণ মিলেছে।
প্রধান উপদেষ্টা যথাযথভাবেই এই নৃশংসতাকে ‘পৈশাচিক’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। গণতন্ত্রের লেবাস পরে একটি শাসনামল কিভাবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়ে মানুষের মৌলিক অধিকার হরণ করেছে, তার বিচার হওয়া আজ সময়ের দাবি। এই প্রতিবেদনকে ভিত্তি করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে। কমিশন যেসব সুপারিশ প্রদান করবে, তার দ্রুত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে গুমের শিকার পরিবারগুলোর দীর্ঘদিনের যে যন্ত্রণা, তা উপশমে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন।
পরিশেষে জাতি হিসেবে আমাদের এমন এক ব্যবস্থার নিশ্চয়তা দিতে হবে, যেখানে ভবিষ্যতে আর কোনো নাগরিককে এভাবে নিখোঁজ হতে হবে না। এই বীভৎসতা থেকে চিরতরে মুক্তি পেতে হলে অপরাধীদের বিচার এবং শাসনকাঠামোর আমূল সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই। গুমের রাজনীতি এ দেশের সমাজকে ক্ষতবিক্ষত করেছে; এখন সময় এসেছে সত্য প্রকাশের, দায় নির্ধারণের এবং ন্যায়বিচারের পথ সুগম করার। রাষ্ট্রের মানবিকতা তখনই ফিরে আসবে, যখন অদৃশ্যকে দৃশ্যমান করা হবে এবং অপরাধকে অপরাধ বলেই বিচার করা হবে।
 

্রিন্ট

আরও সংবদ