খুলনা | শুক্রবার | ০৯ জানুয়ারী ২০২৬ | ২৬ পৌষ ১৪৩২

গুমে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি কাম্য

|
১২:০৫ এ.এম | ০৯ জানুয়ারী ২০২৬


বাংলাদেশে গত দেড় দশকে গুমের যে ভয়াবহ সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, তা কোনো বিচ্ছিন্ন বা ‘বিপথগামী’ কয়েকজন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ড ছিল না। গুমসংক্রান্ত কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদন যে সত্যটি আমাদের সামনে এনেছে, তা শিউরে ওঠার মতো হলেও অনস্বীকার্য, গুম ছিল একটি সুপরিকল্পিত রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত। যখন রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বাহিনী নাগরিকের রক্ষক না হয়ে ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, তখন তা আর শুধু অপরাধ থাকে না, বরং তা মানবতাবিরোধী অপরাধে রূপ নেয়।
কমিশনের প্রতিবেদনটি দায় এড়ানোর প্রচলিত সব যুক্তিকে আইনি ও নৈতিকভাবে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে।বিশেষ করে ‘চলমান অপরাধ’-এর যে ব্যাখ্যা এখানে দেওয়া হয়েছে, তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। গুম শুধু অপহরণের মুহূর্তেই সীমাবদ্ধ নয়; যত দিন একজন ব্যক্তি নিখোঁজ থাকে এবং তাকে বেআইনিভাবে আটকে রাখা হয়, তত দিনই অপরাধটি সচল থাকে। ফলে একজন কর্মকর্তা গুম করেছেন, আর তাঁর পরবর্তী পদাধিকারী সেই অবৈধ আটক বজায় রেখেছেন, এ ক্ষেত্রে উভয়েই সমান অপরাধী। সেনাবাহিনীর নিজস্ব তদন্তে ব্রিগেডিয়ার আজমির ঘটনায় একাধিক সাবেক ডিজিএফআই প্রধানকে যেভাবে অভিযুক্ত করা হয়েছে, তা এই ‘চলমান দায়’-এরই অকাট্য প্রমাণ।
সবচেয়ে ভয়ানক বিষয় হলো ‘অজ্ঞতার অজুহাত’। হাজার হাজার গুম, বছরের পর বছর গোপন আটক এবং গণমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক স¤প্রদায়ের ক্রমাগত উদ্বেগের পরও রাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিরা ‘কিছু জানতেন না’-এমন দাবি হাস্যকর ও অবিশ্বাস্য। কমিশনের পর্যবেক্ষণে এটি স্পষ্ট যে অপহরণের ধরন, গোপন বন্দিশালার কাঠামো এবং এক সংস্থা থেকে অন্য সংস্থায় বন্দি হস্তান্তরের যে সুসমন্বিত ছক দেখা গেছে, তা কোনো কেন্দ্রীয় অনুমোদন ছাড়া সম্ভব নয়। অর্থাৎ এটি ছিল একটি সুশৃঙ্খল ‘সিস্টেম’, যেখানে নকশাকার থেকে শুরু করে নীরব দর্শক-প্রত্যেকেই অপরাধের অংশীদার।
জাতীয় নিরাপত্তা বা সন্ত্রাস দমনের দোহাই দিয়ে গুমকে বৈধতা দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী কোনো যুদ্ধাবস্থা বা জরুরি অবস্থাতেও গুম সমর্থনযোগ্য নয়। বরং এই চর্চা দেশের বিচারব্যবস্থাকে পঙ্গু করেছে এবং সাধারণ মানুষের মনে রাষ্ট্রের প্রতি চরম আস্থাহীনতা তৈরি করেছে।
এখন সময় হয়েছে এই অন্ধকার অধ্যায়ের বিচার নিশ্চিত করার। কমিশনের প্রতিবেদনে যে দায়বদ্ধতার কথা বলা হয়েছে, তার ভিত্তিতে দোষী ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা জরুরি।
যাঁরা এই ব্যবস্থার মাস্টারমাইন্ড ছিলেন এবং যাঁরা ক্ষমতার অপব্যবহার করে নাগরিকের জীবন কেড়ে নিয়েছেন, তাঁদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর দীর্ঘশ্বাসের অবসান হবে না। রাষ্ট্রকে প্রমাণ করতে হবে যে সে আর খুনিদের পাহারাদার নয়, বরং সব নাগরিকের ন্যায়বিচারের গ্যারান্টার।

্রিন্ট

আরও সংবদ