খুলনা | শুক্রবার | ১৬ জানুয়ারী ২০২৬ | ২ মাঘ ১৪৩২

আইসিটি খাতের শ্বেতপত্র : জড়িতদের শাস্তির আওতায় আনুন

|
১২:১৪ এ.এম | ১১ জানুয়ারী ২০২৬


দেশের তথ্য ও যোগাযোগ-প্রযুক্তি খাত গত দেড় দশকে যে বিপুল সম্ভাবনার আলো দেখাতে পারত, তার অনেকটাই হারিয়ে গেছে অনিয়ম, অপব্যবস্থাপনা এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সিদ্ধান্তের কারণে। গত এক দশকে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার যে স্বপ্ন সাধারণ মানুষকে দেখানো হয়েছিল, তার আড়ালে তথ্য ও যোগাযোগ-প্রযুক্তি (আইসিটি) খাতে কী ভয়ঙ্কর লুটপাট ও রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়িত হয়েছে, তা এখন দিবালোকের মতো স্পষ্ট। স¤প্রতি প্রকাশিত আইসিটি খাতের শ্বেতপত্র কমিটির ৪৭২ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনটি শুধু আর্থিক অনিয়মের চিত্র নয়, বরং একটি জাতির সম্ভাবনাময় একটি খাতকে দলীয় স্বার্থে ধ্বংস করার প্রামাণ্য দলিল।
শ্বেতপত্রের তথ্য অনুযায়ী, জনস্বার্থ বা প্রয়োজনের তোয়াক্কা না করে শুধু রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলে দেশের বিভিন্ন স্থানে হাই-টেক পার্ক ও আইটি ট্রেনিং সেন্টার নির্মাণ করা হয়েছে।
‘মুজিব ভাই’ বা ‘খোকা’র মতো চলচ্চিত্র নির্মাণে ১৬ কোটি টাকার মতো বিপুল অঙ্কের বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যার কোনো যৌক্তিকতা ছিল না। সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণের নামে ল্যাপটপ বিতরণের ক্ষেত্রেও দেখা হয়েছে দলীয় আনুগত্য। ল্যাপটপ পাওয়ার প্রাথমিক শর্তই ছিল ব্যক্তি রাজনৈতিকভাবে বিরোধী দলের সঙ্গে যুক্ত নন, তা নিশ্চিত হওয়া। এমনকি এলইডিপি (খঊউচ) প্রকল্পে জাল প্রশিক্ষক নিয়োগের মতো ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে দুর্নীতির শিকড় কতটা গভীরে ছিল।
সাবেক প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহেমদ পলক এবং তাঁর আশীর্বাদপুষ্ট কিছু কর্মকর্তার সিন্ডিকেট যেভাবে পুরো বিভাগটিকে একটি পৃষ্ঠপোষকতা নেটওয়ার্কে পরিণত করেছিল, তা নজিরবিহীন। ফোর টায়ার ডেটা সেন্টার, আইডিয়া প্রকল্প বা হাই-টেক পার্কের প্রকিউরমেন্ট পর্যায়ে পছন্দের ঠিকাদারকে সুবিধা দিতে চুক্তির শর্ত পরিবর্তন করা হয়েছে। এর ফলে একদিকে যেমন মেগা প্রকল্পগুলোর ব্যয় ও যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, অন্যদিকে প্রকৃত আইটি উদ্যোক্তারা প্রতিযোগিতামূলক বাজার থেকে ছিটকে পড়েছেন। এটি শুধু অর্থের অপচয় নয়, বরং দেশীয় আইটিশিল্পের বিকাশকে কয়েক দশক পিছিয়ে দেওয়ার নামান্তর।
শ্বেতপত্র কমিটির এই প্রতিবেদনটি আইসিটি খাতের অব্যবস্থাপনার একটি সামগ্রিক আয়না। এই প্রতিবেদন যেন শুধু একটি দলিলেই সীমাবদ্ধ না থাকে। প্রতিবেদনে যাদের নাম সরাসরি উঠে এসেছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনিব্যবস্থা গ্রহণ এবং লুটপাট হওয়া অর্থ পুনরুদ্ধারে জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে। শ্বেতপত্র শুধুই অতীতের ব্যর্থতার দলিল নয়, বরং সামনের পথ দেখানোর উপাদান। স্বচ্ছতা, স্বাধীন অডিট ব্যবস্থা, জবাবদিহি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এখন সময়ের দাবি।
ডিজিটাল রূপান্তরের নামে অতীতের ব্যর্থতাকে পেছনে ফেলে সত্যিকারের প্রযুক্তিনির্ভর বাংলাদেশ গড়তে হবে। তা না হলে ডিজিটাল স্বপ্ন শুধু কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে, বাস্তবতা হয়ে উঠবে আরেকটি দুঃস্বপ্ন। প্রযুক্তি হোক জনগণের সেবার মাধ্যম, কোনো নির্দিষ্ট দলের লুটপাটের হাতিয়ার নয়।

্রিন্ট

আরও সংবদ