খুলনা | রবিবার | ১১ জানুয়ারী ২০২৬ | ২৮ পৌষ ১৪৩২

সিরিয়ার আলেপ্পো ছাড়ল এসডিএফ, ১৪ বছরের কুর্দি শাসনের অবসান

খবর প্রতিবেদন |
০১:৫৮ পি.এম | ১১ জানুয়ারী ২০২৬


সিরিয়ার আলেপ্পো শহর থেকে কুর্দি বিদ্রোহী গোষ্ঠী সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেসের (এসডিএফ) সর্বশেষ যোদ্ধাটিও আজ রোববার বিদায় নিয়েছে। দীর্ঘ কয়েক দিনের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তির অধীনে এই সরিয়ে নেওয়ার কাজ সম্পন্ন হয়েছে বলে দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন আখবারিয়া জানিয়েছে।

সৌদি আরবের সংবাদমাধ্যম আল–আরাবিয়ার খবরে বলা হয়েছে, ২০১১ সালে সিরিয়া যুদ্ধ শুরুর পর থেকে আলেপ্পোর যেসব পকেট এলাকা কুর্দি বাহিনীগুলোর দখলে ছিল, এই প্রস্থান মূলত সেখান থেকে তাদের অপসারণকেই চিহ্নিত করল। তবে উত্তর-পূর্ব সিরিয়ার এক বিশাল অংশে কুর্দিদের এই আধা–স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল পরিচালনা এখনো অব্যাহত রয়েছে।

এসডিএফ কমান্ডার মজলুম আবদি সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্সে এক পোস্টে জানান, আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায় তারা যুদ্ধবিরতি এবং আলেপ্পোর আশরাফিয়াহ ও শেখ মাকসুদ এলাকা থেকে বেসামরিক নাগরিক ও যোদ্ধাদের নিরাপদে উত্তর ও পূর্ব সিরিয়ায় সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছেছেন।

আলেপ্পোর এই সহিংসতা সিরিয়ার প্রধান দ্বন্দ্বগুলোকে আরও উসকে দিয়েছে। ১৪ বছরের যুদ্ধের পর দেশকে এক নেতৃত্বের অধীনে ঐক্যবদ্ধ করার যে প্রতিশ্রুতি প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা দিয়েছেন, তা কুর্দি বাহিনীর বাধার মুখে পড়েছে; কারণ তারা শারা সরকারের প্রতি আস্থাহীন।

যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বশক্তিগুলো চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানালেও কুর্দি বাহিনী শেখ মাকসুদের শেষ ঘাঁটি ছাড়তে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। সিরিয়ার সেনাবাহিনী তখন ঘোষণা দেয়, তারা এলাকাটি পরিষ্কার করতে স্থল অভিযান চালাবে এবং শনিবার পুরো এলাকা জুড়ে তল্লাশি চালায়।

রয়টার্সের সাংবাদিকেরা দেখেছেন, কয়েক ডজন পুরুষ, নারী ও শিশু পায়ে হেঁটে ওই এলাকা থেকে বেরিয়ে আসছেন। সিরিয়ার সৈন্যরা তাদের বাসে তুলে দিচ্ছে এবং জানাচ্ছে যে, তাদের বাস্তুচ্যুতদের আশ্রয়শিবিরে নিয়ে যাওয়া হবে। এ সপ্তাহের লড়াইয়ে ইতিমধ্যে ১ লাখ ৪০ হাজারের বেশি মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়েছেন।

পরবর্তীতে রয়টার্সের সাংবাদিকেরা দেখেন, নিরাপত্তা বাহিনী বাসে করে আরও শতাধিক বেসামরিক পোশাকধারী পুরুষকে নিয়ে যাচ্ছে। সিরিয়ার নিরাপত্তা কর্মকর্তারা তাদের কুর্দি অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বাহিনী বা আসাওয়িশে সদস্য হিসেবে শনাক্ত করে দাবি করেন যে, তারা আত্মসমর্পণ করেছে। তবে আসাওয়িশ এই দাবি অস্বীকার করে জানায়, শহর ছেড়ে যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে কোনো যোদ্ধা নেই; তারা সবাই জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত হওয়া সাধারণ মানুষ।

শনিবার দামেস্কে আল-শারার সঙ্গে বৈঠকের পর মার্কিন দূত টম বারাক সব পক্ষকে ‘সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শন, অবিলম্বে শত্রুতা বন্ধ এবং আলোচনায় ফেরার’ আহ্বান জানান। তিনি বলেন, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর দল মধ্যস্থতার জন্য প্রস্তুত। বারাক এর আগে বলেছিলেন, একটি সুসংহত যুদ্ধবিরতির আওতায় আলেপ্পো থেকে সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেসের (এসডিএফ) ‘শান্তিপূর্ণ প্রত্যাহার’ দেখা যাবে।

সিরিয়ার তিনটি নিরাপত্তা সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, শুক্রবার রাত থেকে শনিবারের মধ্যে বেশ কয়েকজন কমান্ডার ও তাদের পরিবারসহ কুর্দি যোদ্ধাদের একটি দলকে গোপনে আলেপ্পো থেকে দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। কুর্দি প্রশাসনের পররাষ্ট্র সম্পর্ক বিভাগের প্রধান ইলহাম আহমদ শুক্রবার রাতে শেখ মাকসুদ থেকে যোদ্ধাদের নিরাপদে পূর্ব সিরিয়ায় ‘পুনরায় মোতায়েন’ করার চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছিলেন।

তুরস্কের নিরাপত্তা সূত্রগুলো কুর্দি গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে বিভক্তির ইঙ্গিত দিয়েছে। আঙ্কারার দাবি, তারা বেশ কয়েকজন সিনিয়র কুর্দি কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে এবং সমঝোতার ইচ্ছা লক্ষ্য করেছে—যেখানে তারা নির্দিষ্ট করে ইলহাম আহমদ ও মজলুম আবদির নাম উল্লেখ করেছে। তবে তুর্কি সূত্রগুলো বলছে, অন্যান্য যোদ্ধারা থেকে গিয়ে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার পথ বেছে নিয়েছে।

আখবারিয়া টিভির খবর অনুযায়ী, আলেপ্পোর শেখ মাকসুদ জেলার একটি হাসপাতালে অবস্থান নেওয়া কুর্দি যোদ্ধারা রোববার উচ্ছেদ চুক্তির আওতায় অস্ত্র ফেলে রেখে চলে গেছে। এসডিএফ এর আগে দাবি করেছিল, তারা সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে তুমুল লড়াই করছে। তারা অভিযোগ তোলে, সরকারি বাহিনী হাসপাতালসহ বেসামরিক অবকাঠামোতে নির্বিচারে বোমা হামলা চালাচ্ছে যেখানে সাধারণ মানুষ আশ্রয় নিয়েছিল।

তারা আরও জানায়, এই হামলায় তুর্কি ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে। তবে তুর্কি নিরাপত্তা সূত্র এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, অভিযান ‘মূলত শেষ হয়ে গেছে, তাই তুর্কি সহায়তার কোনো প্রয়োজন ছিল না।’ সিরিয়ার সেনাবাহিনী নির্বিচারে হামলার অভিযোগ অস্বীকার করেছে এবং উল্টো এসডিএফের বিরুদ্ধে ড্রোন দিয়ে আলেপ্পোর টাউন হলে হামলার অভিযোগ এনেছে। এসডিএফ এই দাবি নাকচ করে দিয়েছে।

২০২৪ সালের ডিসেম্বরে দীর্ঘদিনের শাসক বাশার আল-আসাদকে ক্ষমতাচ্যুত করা সাবেক বিদ্রোহী যোদ্ধাদের নিয়ে গঠিত সিরিয়ার নতুন সরকারে অন্তর্ভুক্ত হতে এসডিএফ বরাবরই অনীহা দেখিয়ে আসছিল। তাদের একীভূত করার আলোচনা থমকে যাওয়ায় গত মঙ্গলবার আলেপ্পোতে লড়াই শুরু হয়, যাতে অন্তত নয়জন বেসামরিক নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে। এই সংঘর্ষ সিরিয়ায় চলমান সাম্প্রদায়িক সহিংসতার সর্বশেষ রূপ। ২০২৫ সালে সরকারি মদদপুষ্ট বাহিনীর হাতে সংখ্যালঘু আলভি সম্প্রদায়ের ১ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হন এবং দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রদেশ সুয়াইদা দ্রুজ সম্প্রদায়ের শত শত মানুষ প্রাণ হারান।

আলেপ্পোর এই লড়াইয়ের ফলে তুরস্কের সঙ্গে সংযোগকারী একটি প্রধান মহাসড়ক এবং শিল্পাঞ্চলের কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। সিরিয়ার বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ শনিবার জানিয়েছে, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত আলেপ্পো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরও বন্ধ থাকবে।

্রিন্ট

আরও সংবদ