খুলনা | সোমবার | ১২ জানুয়ারী ২০২৬ | ২৮ পৌষ ১৪৩২

বাংলাদেশে ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক’ নির্বাচনের নতুন ব্যাখ্যা দিল ইউরোপীয় ইউনিয়ন

খবর প্রতিবেদন |
১০:৫৫ পি.এম | ১১ জানুয়ারী ২০২৬


‘অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক’ নির্বাচনের জন্য ‘সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণকে’ আর শর্ত হিসেবে দেখছে না ইউরোপ। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে জাতীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে বহুল প্রচলিত শব্দ দুটির নতুন ব্যাখ্যা দিয়েছেন ইউরোপীয় ইউনিয়ন নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের (ইইউ ইওএম) প্রধান ইভার্স ইয়াবস।

ইইউর প্রধান পর্যবেক্ষক ইয়াবস বলেছেন, নির্বাচনে সমাজের সব শ্রেণি ও গোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই এর মূল কথা। আজ রোববার দুপুরে ঢাকার একটি হোটেলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এই ব্যাখ্যা দেন তিনি। বার্তা সংস্থা ইউএনবির প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

ইভার্স ইয়াবস বলেন, ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের দৃষ্টিতে অন্তর্ভুক্তিমূলক বলতে প্রথমেই বোঝায়—বাংলাদেশের সব সামাজিক গোষ্ঠীর নাগরিকদের অংশগ্রহণ। যেমন নারী, জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু গোষ্ঠী, পাশাপাশি বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ যেন নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন।’

অতীতে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন বলতে বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণের ওপর জোর দিতেন ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর রাষ্ট্রদূতেরা। ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ ও ‘অংশগ্রহণমূলক’ শব্দ দুটির সংজ্ঞায় হঠাৎ পরিবর্তন কেন?

এই প্রশ্নের জবাবে ইইউর প্রধান পর্যবেক্ষক ইয়াবস জানান, তাঁরা ‘অংশগ্রহণ’ বলতে ‘বিশ্বাসযোগ্য ভোটার উপস্থিতি’ বোঝেন। তাঁর মতে, এমন অংশগ্রহণই প্রমাণ করবে যে, বাংলাদেশের নাগরিকেরা নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে যুক্ত হচ্ছেন।

‘অন্তর্ভুক্তির’ বিষয়ে ইয়াবস বলেন, এটি একটি বিস্তৃত ধারণা—এর মধ্যে যেমন নাগরিকদের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে, তেমনি রয়েছে তাঁদের ভোট সঠিক ও স্বচ্ছভাবে গণনার নিশ্চয়তাও।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। অন্তর্বর্তী সরকার দলটির ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ করেছে। আওয়ামী লীগের কার্যক্রমেও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে গত বছর। নির্বাচন কমিশন নিবন্ধন স্থগিত করায় দলটি এবার নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না।

সে প্রসঙ্গে ইঙ্গিত করে ইইউর প্রধান পর্যবেক্ষক বলেন, ‘আমরা সবাই জানি, রাজনৈতিক দল নিবন্ধনের বিষয়টি একটি ইস্যু। ঐতিহাসিকভাবে এটি এখানে জাতীয় ঐকমত্য ও অন্তর্বর্তীকালীন ন্যায়বিচারের প্রশ্নের সঙ্গে জড়িত এবং বিষয়টি বেশ জটিল। আমরা এসব বিষয়ে মন্তব্য করব না। তবে নির্বাচন ও ভোটার উপস্থিতিতে যদি এর প্রভাব পড়ে, তাহলে অবশ্যই আমরা সেটির দিকে নজর দেব।’

সংখ্যালঘুদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের বিষয়ে ইয়াবস বলেন, ‘এটি নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমরা দেশের সব ৬৪টি জেলায় পর্যবেক্ষক পাঠাব এবং তাদের এ ধরনের সম্ভাব্য ঘটনার প্রতি বিশেষ নজর দিতে বলা হবে।’

নির্বাচনের আগে বা পরে সহিংসতা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে ইইউর প্রধান পর্যবেক্ষক বলেন, ‘স্থানীয় অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনায় বিষয়টি উঠে এসেছে। এটি নানা দিক থেকেই একটি সমস্যা। তবে আমি আশা করি এবং প্রত্যাশা করি— বাংলাদেশিরা এই ইস্যুর গুরুত্ব অনুধাবন করবেন। কারণ, একটি জীবন হারানো মানে জীবনের চেয়ে আরও বেশি কিছু হারানো।’

ইইউ মিশনের একটি বিশেষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পর্যবেক্ষণ ইউনিট রয়েছে জানিয়ে প্রধান পর্যবেক্ষক বলেন, প্রাথমিক মূল্যায়নে দেখা যাচ্ছে, সংশ্লিষ্ট স্থানীয় অংশীজনেরা সহিংসতামুক্ত ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে আন্তরিক।

বাংলাদেশ সরকারের আমন্ত্রণে ইউরোপীয় ইউনিয়ন আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচন পর্যবেক্ষণে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশন পাঠিয়েছে। ২০০৮ সালের পর বাংলাদেশে এটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রথম পূর্ণাঙ্গ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশন। আওয়ামী লীগ সরকারের তিনটি নির্বাচনে পর্যবেক্ষণ মিশন পাঠায়নি ইউরোপ।

লাটভিয়ার ইউরোপীয় পার্লামেন্ট সদস্য ইভার্স ইয়াবসের নেতৃত্বে মিশনটি ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শেষ দিকে কাজ শুরু করে এবং ধাপে ধাপে বিস্তৃত হচ্ছে। ইতিমধ্যে ৫৬ জন দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষক বাংলাদেশে এসে পৌঁছেছেন, যাঁদের দেশের ৬৪টি জেলায় মোতায়েন করা হবে।

ইয়াবস বলেন, এই নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশন বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যকার পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা অংশীদারত্বের গুরুত্বকে পুনর্ব্যক্ত করে। প্রথম সফরে তিনি নির্বাচনসংশ্লিষ্ট নানা পক্ষের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে নির্বাচনী প্রক্রিয়া সম্পর্কে সরাসরি তথ্য নিয়েছেন।

ইইউর প্রধান পর্যবেক্ষক জানান, মিশনের কার্যক্রমের অংশ হিসেবে নির্বাচন প্রশাসন, রাজনৈতিক দল, বিচার বিভাগ, সুশীল সমাজ ও গণমাধ্যমের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হবে। একই সঙ্গে নির্বাচন প্রস্তুতি, আইনিকাঠামো ও তার বাস্তবায়ন, প্রচারণা এবং নির্বাচনী বিরোধ নিষ্পত্তি প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করা হবে।

এ ছাড়া নারী, তরুণ ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীর রাজনৈতিক, নাগরিক অংশগ্রহণের সুযোগসহ সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিবেশ মূল্যায়ন করা হবে।

ইইউ ইওএমের পৃথক গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পর্যবেক্ষণ ইউনিট রয়েছে, যা বিশ্লেষণ করবে—এই মাধ্যমগুলো ভোটারদের সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে কতটা সহায়তা করেছে।

ইয়াবস বলেন, ‘আমাদের কারিগরি মূল্যায়ন তিনটি মূলনীতির ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হচ্ছে—স্বাধীনতা, নিরপেক্ষতা ও বিনা হস্তক্ষেপ। আমরা দীর্ঘমেয়াদি ও দেশব্যাপী পর্যবেক্ষণের সুপ্রতিষ্ঠিত পদ্ধতি অনুসরণ করছি। আমরা নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করব, তবে ফলাফল অনুমোদন বা প্রত্যয়ন করব না। এই নির্বাচন একান্তই বাংলাদেশের জনগণের।’

পূর্ণাঙ্গ অবস্থায় এই মিশনে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি সদস্যরাষ্ট্র ছাড়াও কানাডা, নরওয়ে ও সুইজারল্যান্ডের প্রায় ২০০ পর্যবেক্ষক অংশ নেবেন। এর মধ্যে ঢাকাভিত্তিক ১১ সদস্যের একটি বিশ্লেষক দল, ৫৬ জন দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষক, নির্বাচনের আগে মোতায়েনযোগ্য ৯০ জন স্বল্পমেয়াদি পর্যবেক্ষক এবং ইইউ সদস্যরাষ্ট্র ও অংশীদার দেশের কূটনৈতিক মিশনের পর্যবেক্ষকেরা থাকবেন। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের একটি প্রতিনিধিদলও মিশনকে জোরদার করবে।

ইয়াবস বলেন, ‘এই ঐতিহাসিক নির্বাচন ব্যালটের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তাই নির্বাচন যেন শান্তিপূর্ণ, বিশ্বাসযোগ্য ও স্বচ্ছভাবে অনুষ্ঠিত হয়, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা আশা করি, আমাদের কাজ নির্বাচনী প্রক্রিয়ার প্রতি জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস বাড়াতে সহায়তা করবে।’

নির্বাচনের দুই দিন পর ১৪ ফেব্রুয়ারি ইইউ ইওএম একটি প্রাথমিক বিবৃতি প্রকাশ করবে এবং ঢাকায় সংবাদ সম্মেলন করবে। প্রায় দুই মাস পর চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করা হবে, যেখানে ভবিষ্যৎ নির্বাচনের জন্য সুপারিশও থাকবে।

সব ইইউ ইওএম পর্যবেক্ষক কঠোর আচরণবিধির অধীন কাজ করেন এবং ২০০৫ সালে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে অনুমোদিত আন্তর্জাতিক নির্বাচন পর্যবেক্ষণের ঘোষণাপত্র অনুসরণ করেন।

সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশে ইইউ রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলারসহ ঢাকায় নিযুক্ত ইউরোপীয় কূটনীতিকেরা উপস্থিত ছিলেন।

্রিন্ট

আরও সংবদ