খুলনা | সোমবার | ১২ জানুয়ারী ২০২৬ | ২৯ পৌষ ১৪৩২

২৪ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় হাইকোর্টের

দ্বিতীয় বিয়ে করতে লাগবে না স্ত্রীর অনুমতি লিখিত থাকতে হবে সালিশি কাউন্সিলের

খবর প্রতিবেদন |
০১:৩৪ এ.এম | ১২ জানুয়ারী ২০২৬


মুসলিম আইনানুযায়ী পুরুষের জন্য দ্বিতীয় বিয়ে জায়েজ থাকলেও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তা ছিল গুরুতর অপরাধ ও নৈতিকতার লঙ্ঘন। তবে এবার হাইকোর্ট রায় দিয়েছেন, বাংলাদেশের কোনো মুসলিম পুরুষের দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে স্ত্রীর পূর্বানুমতি বাধ্যতামূলক নয়।  তবে কোনো ব্যক্তির বিয়ে বহাল থাকা অবস্থায় সালিশি কাউন্সিলের লিখিত পূর্বানুমতি ব্যতীত কোনো বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবে না এমন বিধান বহাল রেখেছেন হাইকোর্ট। এ বিষয়ে জারি করা রুল খারিজ করে বিচারপতি ফাহমিদা কাদের ও বিচারপতি সৈয়দ জাহেদ মনসুরের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দিয়েছেন। শনিবার এ সংক্রান্ত ২৪ পৃষ্ঠার একটি পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত।
মুসলিম পারিবারিক আইন সংক্রান্ত একটি রিটের প্রকাশিত পূর্ণাঙ্গ রায়ে আদালত বলেছেন, ‘দ্বিতীয় বিয়ের অনুমতির বিষয়টি স্ত্রী নয়, বরং সংশ্লিষ্ট আরবিট্রেশন কাউন্সিলের এখতিয়ারভুক্ত। ফলে স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এমন কোনো বিধান প্রচলিত আইনে নেই।’
রায়ে বলা হয়, ‘মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ অনুযায়ী দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে পুরুষকে অবশ্যই আরবিট্রেশন কাউন্সিলের অনুমতি নিতে হবে। কিন্তু এই আইনে কোথাও প্রথম স্ত্রীর অনুমতি নেওয়াকে বাধ্যতামূলক শর্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক ও প্রশাসনিকভাবে যে ধারণা প্রচলিত ছিল স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে অবৈধ, তা আইনের সরাসরি ব্যাখ্যার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলেও রায়ে মন্তব্য করা হয়।
আদালত বলেন, ‘দ্বিতীয় বিয়ের অনুমতি দেওয়ার ক্ষমতা যেহেতু আরবিট্রেশন কাউন্সিলের হাতে ন্যস্ত, সেহেতু স্ত্রী অনুমতি না দিলেই বিয়ে অবৈধ হয়ে যাবে, এমন ব্যাখ্যা আইনি কাঠামোর বাইরে গিয়ে তৈরি হয়েছে। কাউন্সিল সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য, আর্থিক সক্ষমতা ও পারিবারিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেবে এটাই আইনের মূল উদ্দেশ্য।’
আইনগত প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আদালত উল্লেখ করেন, দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ৪৯৪ ধারায় দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে সাত বছরের কারাদণ্ডের বিধান থাকলেও, ১৯৬১ সালে মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ কার্যকর হওয়ার পর পুরুষের ক্ষেত্রে সেই কঠোরতা শিথিল করা হয়। নতুন আইনে দ্বিতীয় বিয়েকে পুরোপুরি নিষিদ্ধ না করে তা আরবিট্রেশন কাউন্সিলের অনুমতির ওপর নির্ভরশীল করা হয়। অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করলে এক বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড অথবা ১০ হাজার টাকা জরিমানা কিংবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের ঘোষণা দিয়েছেন রিটকারীরা। তাদের মতে, এ সিদ্ধান্তের ফলে বহুবিবাহের ক্ষেত্রে নীতিমালা ও নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হতে পারে। নারী ও পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রে সমান অধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতেই তাঁরা রিট করেছিলেন।
২০২১ সালের ১৩ ডিসেম্বর মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ এর বহুবিবাহ সংক্রান্ত ধারার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিট করা হয়। মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ এর বহু বিবাহ সংক্রান্ত ৬ ধারায় বলা হয়েছে, ১) কোনো ব্যক্তির বিবাহ বলবৎ থাকিতে সে সালিশি কাউন্সিলের লিখিত পূর্বানুমতি ব্যতীত কোনো বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারিবে না বা ঐরূপ অনুমতি ছাড়া অনুষ্ঠিত কোনো বিবাহ ১৯৭৪ সনের মুসলিম বিবাহ ও তালাক (রেজিস্ট্রেশন) আইনের অধীনে নিবন্ধিত হবে না।
২) ১ নম্বর উপধারা অনুযায়ী অনুমতির দরখাস্ত নির্ধারিত ফিসহ চেয়ারম্যানের নিকট নির্দিষ্ট দপ্তরে দাখিল করতে হবে এবং এতে প্রস্তাবিত বিবাহের কারণসমূহ এবং এই বিবাহের ব্যাপারে বর্তমান স্ত্রী অথবা স্ত্রীগণের সম্মতি নেওয়া হয়েছে কি না, উহার উল্লেখ থাকবে।
৩) ২ নম্বর উপধারা অনুযায়ী দরখাস্ত গ্রহণ করবার পর চেয়ারম্যান আবেদনকারীকে ও বর্তমান স্ত্রী অথবা স্ত্রীগণের প্রত্যেককে একজন করে প্রতিনিধি মনোনীত করতে বলবেন। উক্তরূপে গঠিত সালিশি কাউন্সিল প্রস্তাবিত বিবাহ প্রয়োজনীয় ও ন্যায়সংগত বলিয়া মনে করলে এবং যুক্তিসঙ্গত বলে মনে হতে পারে এমন সব শর্ত থাকলে তৎসাপেক্ষে প্রার্থীর আবেদন মঞ্জুর করতে পারেন।
৪) দরখাস্তের বিষয় নিষ্পত্তি করিবার নিমিত্ত সালিশি কাউন্সিল নিষ্পত্তির কারণটি লিপিবদ্ধ করবেন। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে যে কোনো পক্ষ নির্দিষ্ট ফিস প্রদানক্রমে নির্দিষ্ট দপ্তরে সংশ্লিষ্ট সহকারী জজের নিকট পুনর্বিবেচনার নিমিত্ত দরখাস্ত দাখিল করতে পারে; তার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হবে এবং কোনো আদালতে এই সম্বন্ধে প্রশ্ন উত্থাপন করা যাবে না।
৫) কোনো ব্যক্তি যদি সালিশি কাউন্সিলের অনুমতি ছাড়া অন্য বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়, তবে সে, ক) বর্তমান স্ত্রী অথবা স্ত্রীগণের তলবি ও স্থগিত দেনমোহরের সম্পূর্ণ টাকা তৎক্ষণাৎ পরিশোধ করিতে হইবে। উক্ত টাকা উক্তরূপে পরিশোধ না করা হইলে বকেয়া ভূমি রাজস্বরূপে আদায়যোগ্য হইবে; এবং খ) অভিযোগে অপরাধী সাব্যস্ত হইলে এক বৎসর পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড অথবা দশ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড বা উভয় প্রকার দণ্ডনীয় হইবে।
হাইকোর্ট ২০২২ সালের ৫ জানুয়ারি রুল জারি করেন। রুলে পারিবারিক জীবন রক্ষার বৃহৎ স্বার্থে বহুবিবাহ আইনের বিষয়ে নীতিমালা কেন করা হবে না, তা জানতে চান। একই সঙ্গে, স্ত্রীদের মধ্যে সমঅধিকার নিশ্চিত করা ছাড়া আইন অনুসারে বহু বিবাহের অনুমতির প্রক্রিয়া কেন অবৈধ হবে না তাও জানতে চান হাইকোর্ট। 
ওই রুলের শুনানি শেষে গত বছরের ২০ আগস্ট হাইকোর্ট রুল খারিজ করে দেন। ফলে মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১-এর বহুবিবাহ সংক্রান্ত ধারা বহাল থাকল বলে জানিয়েছেন আইনজীবী ইশরাত হাসান। তবে তিনি এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে যাওয়ার কথা বলেছেন।
আইনজীবী ইশরাত হাসান জানিয়েছিলেন, এখানে নারীর সাংবিধানিক অধিকার ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। যে ইসলামী আইন দেখিয়ে বলা হচ্ছে চারজন স্ত্রী রাখা যাবে, সেখানে ইসলামে বলা হয়েছে সবার প্রতি সমানভাবে সুবিচার করতে হবে। এখানে শুধুমাত্র ‘পিক অ্যান্ড চুজ’ করা যাবে না। শুধু বিয়ে করতে পারবে-ওই অংশটুকু গ্রহণ করলে হবে না; সবার প্রতি কীভাবে সুবিচার নিশ্চিত করতে হবে, তার বিধান (প্রভিশন) থাকতে হবে।
আবেদনকারী টাকা দিচ্ছেন কি না, আদৌ তার বিয়ে করার আর্থিক সংগতি আছে কি না, এগুলো দেখার সুযোগ চেয়ারম্যানের নেই। মালয়েশিয়ায় এই প্রক্রিয়া আদালতের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়, চেয়ারম্যানের মাধ্যমে নয়। আদালত সমন দেন, সাক্ষীদের ডাকেন এবং বিয়ের যে কারণটি উল্লেখ করা হয়, তা সত্য কি না তা যাচাই করেন। এ বিষয়ে চেয়ারম্যানের বিস্তারিত যাচাই করার সুযোগ নেই। এছাড়া কোনো চেয়ারম্যান যদি নিজে বিয়ে করতে চান, তবে তাকে নিজেকেই নিজের অনুমতি দিতে হয়।

্রিন্ট

আরও সংবদ