খুলনা | সোমবার | ১২ জানুয়ারী ২০২৬ | ২৯ পৌষ ১৪৩২

ছোঁড়া গুলিতে আহত শিশু চট্টগ্রাম মেডিকেলের লাইফ সাপোর্টে, গুলিবিদ্ধ শিশুটি মারা যায়নি

টেকনাফ সীমান্তে ব্যাপক গোলাগুলি, ৫৩ বিদ্রোহী আটক

খবর প্রতিবেদন |
০১:৪৩ এ.এম | ১২ জানুয়ারী ২০২৬


মিয়ানমার সীমান্তের ওপার থেকে আসা গুলিতে আহত টেকনাফের শিশুটিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে (নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) ভর্তি করা হয়েছে। সেখানে তাকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছে। কক্সবাজারের টেকনাফের হোয়াইক্যং এলাকার জসিম উদ্দিনের মেয়ে হুজাইফা আফনান (১২) নামের ওই শিশুর অবস্থা গুরুতর বলে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অ্যানেসথেসিয়া ও আইসিইউ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক হারুন অর রশিদ রোববার সন্ধ্যায় বলেন, শিশুটির অবস্থা গুরুতর। তাকে আইসিইউতে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছে। গুলি তার মুখের এক পাশ দিয়ে ঢুকে মস্তিষ্কে প্রবেশ করেছে।
চমেক হাসপাতালে আনার পরপরই গুলিবিদ্ধ শিশুটিকে আইসিইউতে নেওয়া হয় বলে পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ উপ-পরিদর্শক নুরুল আলম জানান।
রোববার সকাল ৯টার দিকে মিয়ানমার থেকে আসা গুলিতে আহত হয় তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী হুজাইফা। কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) অলক বিশ্বাস গতকাল দুপুর আড়াইটার দিকে বলেন, শিশুটি গুলিবিদ্ধ হয়েছে। প্রথমে মারা যাওয়ার কথা শোনা গেলেও, তা সঠিক নয়। শিশুটিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। রোববার বিকেল সাড়ে চারটার দিকে হুজাইফাকে চট্টগ্রাম মেডিকেলে আনা হয়।
মেডিকেলের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দিন বলেন, ‘শিশুটির অবস্থা সংকটাপন্ন। তাকে আইসিইউতে ভর্তি করা হয়েছে।’
হুজাইফার সঙ্গে থাকা তার চাচা শওকত আলীর তথ্যমতে, কক্সবাজার জেলার টেকনাফ থানাধীন হোয়াইক্যাং তেচ্ছাব্রিজ এলাকায় মিয়ানমারের সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর ছোঁড়া গুলিতে হুজাইফা গুরুতর আহত হন। সেখান থেকে তাকে কক্সবাজার মেডিকেল নেওয়া হয়। পরে তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেলে রেফার করা হয়।
এর আগে খবর রটে যায়, ওপার থেকে আসা গুলিতে শিশুটির মৃত্যু হয়েছে। হোয়াইক্যং পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ উপ-পরিদর্শক (এসআই) খোকন চন্দ্র রুদ্রও এমন তথ্য দিয়েছিলেন। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় লোকজন ক্ষুব্ধ হয়ে সড়ক অবরোধ করেন।
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে বিমান হামলা, ড্রোন হামলা, মর্টার শেল ও বোমা বিস্ফোরণ থামছে না। তিন দিন ধরে রাখাইন রাজ্যের মংডু টাউনশিপের আশপাশের এলাকায় সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির (এএ) অবস্থানে বিমান হামলা জোরদার করেছে সরকারি জান্তা বাহিনী।
অন্যদিকে আরাকান আর্মির সঙ্গে স্থলভাগে সংঘর্ষে জড়িয়েছে রোহিঙ্গাদের সশস্ত্র তিনটি গোষ্ঠী। এ কারণে সীমান্ত পরিস্থিতি দিন দিন জটিল হচ্ছে। ওপারের বিকট শব্দের বিস্ফোরণে টেকনাফের বাংলাদেশ সীমান্তের গ্রামগুলো কেঁপে উঠছে। ওপার থেকে ছোঁড়া গুলি এসে পড়ছে এপারে লোকজনের ঘরবাড়ি-চিংড়িঘের ও নাফ নদীতে।
সর্বশেষ শনিবার সন্ধ্যা থেকে রোববার সকাল সাড়ে ৯টা পর্যন্ত টেকনাফের হোয়াইক্যং সীমান্তের বিপরীতে রাখাইন রাজ্যের বলিবাজার এলাকায় থেমে থেমে ব্যাপক গোলাগুলি, মর্টার শেলের বিস্ফোরণ ঘটেছে। বিকট শব্দের বিস্ফোরণে টেকনাফের হোয়াইক্যং ও উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের ১১টি গ্রাম কেঁপে ওঠে। লোকজন রাত জেগে সময় পার করেন। অনেকে ঘরবাড়ি ফেলে নিরাপদ স্থানে ছোটেন। নাফ নদী ও স্থলসীমান্তে নজরদারি ও টহল বাড়িয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও কোস্টগার্ড।
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য দখলে নেওয়া আরকান আর্মির (এএ) সঙ্গে টানা চার দিনের সংঘর্ষে বহু হতাহতের খবর পাওয়া গেছে। শনিবার দিবাগত রাত থেকে ভোর পর্যন্ত দু’পক্ষের ব্যাপক গুলিবিনিময়ে সীমান্ত এলাকা কেঁপে ওঠে। রোববার ভোর ৬টা পর্যন্ত গুলিবিনিময় চলছিল।
সকালে আরকান আর্মি রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের নিশানা করে কয়েকটি ড্রোন হামলা চালায়। এতে রোহিঙ্গা বিদ্রোহীরা পিছু হটলে আরকান আর্মি তাদের তাড়া করে বাংলাদেশ ভূখণ্ডের ভেতরে অনুপ্রবেশ করে এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। এতে হুজাইফা সুলতানা আফনান (৯) গুলিবিদ্ধ হয়। মুমূর্ষু অবস্থায় প্রথমে এমএসএফ হাসপাতাল, পরে আশঙ্কাজনক অবস্থায় চমেক হাসপাতালে পাঠানো হয়।
সর্বশেষ পাওয়া খবরে জানা যায়, গুলিবিদ্ধ হুজাইফা এখনো জীবিত আছে বলে জানিয়েছেন বাবা জসিম উদ্দিন। তিনি বলেন, আমার হুজাইফা সকালে স্কুলে যাওয়ার আগে বাড়ির সামনে খেলছিল। একপর্যায়ে আরকান আর্মি ভেড়িবাঁধের ওপরে এসে এলোমেলো গুলি ছোঁড়ে। এতে আমার মেয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে পড়ে যায়। পরে তাকে উদ্ধার করে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়।
জানা গেছে, মিয়ানমারের অভ্যন্তরে দেশটির দুই বিদ্রোহী গোষ্ঠীর মধ্যে চলা সংঘাতের জেরে ছোঁড়া গুলিতে টেকনাফের হোয়াইক্যংয়ে এক শিশু গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হয়েছে। রোববার সকাল ১০টার দিকে কক্সবাজার-টেকনাফ মহাসড়ক সংলগ্ন তেচ্ছিব্রিজ এলাকায় এই ঘটনা ঘটে।
গুরুতর আহত আফনান ওরফে পুতুনি ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডে মোহাম্মদ জসিমের মেয়ে। সে লম্বাবিল হাজি মোহাম্মদ হোসেন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী।
সর্বশেষ পাওয়া খবরে জানা যায়, মিয়ানমারের বিদ্রোহী গোষ্ঠীর ৫৩ জন সদস্য পালিয়ে আসার সময় আইহত হন।
হোয়াইক্যং ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য সিরাজুল মোস্তফা লালু বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, মিয়ানমারের রাখাইন সীমান্ত এলাকায় প্রায়ই গোলাগুলি ও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। আজ ভোরেও কয়েক রাউন্ড গুলি ও বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া গেছে।
আহত জেলের বড় ভাই সরওয়ার আলম জানান, বৃহস্পতিবার মাগরিবের পর মোঃ আলমগীর ও আরেক জেলে মোঃ আকবর নাফ নদীর হোয়াইক্যং এলাকার বিলাইচ্ছর দ্বীপ সংলগ্ন এলাকায় মাছ ধরছিলেন। এ সময় হঠাৎ কয়েক রাউন্ড গুলির শব্দ শোনা যায়। একপর্যায়ে আলমগীর নৌকার ভেতরে লুটিয়ে পড়েন। পরে দেখা যায়, তার বাম হাত ভেদ করে একটি গুলি বেরিয়ে গেছে। পরে স্থানীয় জেলেদের সহায়তায় আলমগীরকে উদ্ধার করে প্রথমে উখিয়ার কুতুপালং এমএমএস হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়।

্রিন্ট

আরও সংবদ