খুলনা | মঙ্গলবার | ৩১ মার্চ ২০২৬ | ১৬ চৈত্র ১৪৩২

মধ্যপ্রাচ্য ভেঙে পুনর্গঠন করতে চায় ইসরায়েল, বাজেট অনুমোদন

খবর প্রতিবেদন |
০১:৪০ এ.এম | ৩১ মার্চ ২০২৬


ইসরায়েলের পার্লামেন্ট ‘নেসেট’ সোমবার দেশটির ইতিহাসের বৃহত্তম রাষ্ট্রীয় বাজেট অনুমোদন দিয়েছে। রেকর্ড পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে প্রতিরক্ষা খাতে। যেটিকে ‘মধ্যপ্রাচ্য ভেঙে নতুন করে পুনর্গঠনের’ সহায়ক হিসেবে উল্লেখ করেছেন অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ।
মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক এক বিশেষজ্ঞ ইসরায়েলের এই বাজেট অনুমোদনকে কয়েকটি দেশ লক্ষ্য করে সর্বাত্মক সামরিক আগ্রাসন দীর্ঘায়িত করার প্রস্তুতি হিসেবে দেখছেন। এটি বিভিন্ন ফ্রন্টে একাধিক যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যর প্রতিফলন বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।
টাইমস অব ইসরায়েল বলছে, সোমবার এই বাজেট অনুমোদনের মধ্য দিয়ে আগাম নির্বাচনের ঝুঁকি এড়াতে পেরেছেন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। কারণ আইনি বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী, মঙ্গলবারের মধ্যে বাজেট অনুমোদন না হলে সংসদ ভেঙে যেত। 
বিরোধী দলের ১৩ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলা দীর্ঘ বক্তব্য এবং ইরান থেকে ছোঁড়া ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সাইরেনের কারণে বাজেট অধিবেশনে একাধিকবার বিঘœ ঘটে। সাইরেনের কারণে সংসদ সদস্যরা একটি বিকল্প সুরক্ষিত মিলনায়তন থেকে তাঁদের ভোট প্রদান করেন। প্রায় ২৭১ বিলিয়ন ডলার (৮৫০.৬ বিলিয়ন শেকেল) অর্থবিলের পক্ষে ৬২ ও বিপক্ষে ৫৫টি ভোট পড়ে। 
অনুমোদিত বিলকে অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ ‘সবার দেখাশোনা করা এবং জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর বাজেট’ বলে অভিহিত করেছেন। অন্যদিকে, বিরোধীদলীয় নেতা এবং ইয়েশ আতিদ পার্টির প্রধান ইয়ার লাপিদ বলেছেন, এটি রাষ্ট্রের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় চুরি।
মধ্যপ্রাচ্য পুনর্গঠন : ২০২৬ অর্থবছরের জন্য শুধু প্রতিরক্ষা খাতে রেকর্ড ১৪৩ বিলিয়ন শেকেল (৪৫.৮ বিলিয়ন ডলার) বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। অধিবেশনে অর্থমন্ত্রী স্মোট্রিচ এই প্যাকেজকে যুদ্ধকালীন বাজেটের মূল অংশ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, এটি ইসরায়েলকে ভৌগোলিক ও কূটনৈতিক অবস্থানে উন্নতি করতে এবং ‘মধ্যপ্রাচ্যকে ভেঙে নতুন করে পুনর্গঠন’ করতে সহায়তা করবে। তিনি বলেন, এই বাজেট রাষ্ট্রকে বিজয়ী করবে।
পার্লামেন্টের এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, ‘নতুন প্রতিরক্ষা বাজেট আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার বেশি। ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এই অতিরিক্ত বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।’ ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইসরায়েল প্রতিরক্ষা ব্যয় ক্রমাগত বাড়াচ্ছে। বর্তমানে ইরানের পাশাপাশি হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে লেবাননে যুদ্ধের বিস্তার ঘটিয়েছে। আকাশপথে বৈরুতে হামলার পাশাপাশি স্থল অভিযান চালাচ্ছে সীমান্তবর্তী এলাকায়।
কাতারের দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের অধ্যাপক মোহাম্মদ এলমাসরি আলজাজিরাকে বলেছেন, সর্বোচ্চ বরাদ্দের এই বাজেট বিভিন্ন ফ্রন্টে ইসরায়েলের একাধিক যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যর প্রতিফলন।
এলমাসরি বলেন, ঐতিহাসিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র প্রতি বছর ইসরায়েলকে ৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের বড় সামরিক সহায়তা দেয়। যুদ্ধের সময় এই অংকটা আরও বাড়ানো হয়। সবশেষ বাজেট ইঙ্গিত দিচ্ছে, ইসরায়েল সম্ভবত যুদ্ধের মাঝামাঝি অথবা শুরুর কাছাকাছি অবস্থানে আছে।
‘অর্থাৎ, সিরিয়া, লেবানন থেকে শুরু করে ফিলিস্তিনি ভূখন্ড এবং ইরান পর্যন্ত একটি দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধ বা ধারাবাহিক কয়েকটি যুদ্ধের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে ইসরায়েল। যাতে তারা তাদের গ্রেটার ইসরায়েল বা বৃহত্তর ইসরায়েলের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে পারে।’- বলেন মোহাম্মদ এলমাসরি।
পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপন : ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু কট্টর রক্ষণশীল শরিক দলগুলোর ওপর নির্ভরশীল। বাজেটে তাদের জন্য নির্ধারিত তহবিলের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে। বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, কট্টর রক্ষণশীল দলগুলো তাদের নিয়ন্ত্রিত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য অতিরিক্ত ৭৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি তহবিল পাবে।
রক্ষণশীল শরিক দলগুলো অধিকৃত পশ্চিম তীরে বসতি স¤প্রসারণের অন্যতম বড় সমর্থক। বসতি স্থাপন বিরোধী গোষ্ঠী ‘পিস নাউ’ জানিয়েছে, সব বেসামরিক বাজেটে ব্যাপক কাটছাঁট করা হলেও বসতি স্থাপনের জন্য বরাদ্দের পরিমাণ অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।
পিস নাউয়ের প্রতিবেদনে এই পদক্ষেপকে সরকারের নিজস্ব বলয়ের একটি ছোট গোষ্ঠীর সুবিধার জন্য ‘প্রকাশ্য দিবালোকে সরকারি তহবিল চুরি’ বলে নিন্দা জানানো হয়েছে। এর আগে গত ৪ ডিসেম্বর সরকার অধিকৃত পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপন উন্নয়নের জন্য পাঁচ বছরে ৮৭৫ মিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয়ের অনুমোদন দেয়। যা আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী অবৈধ।
লুটপাটের অভিযোগ বিরোধীদের : প্রতিরক্ষা ব্যয়ের বিশাল উল্লম্ফনের ফলে অন্য সব মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ ৩ শতাংশ হারে হ্রাস করা হবে। এরপরও বাজেটের বড় একটি অংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছে কট্টরপন্থী প্রতিষ্ঠান, পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপন এবং জোটভুক্ত দলগুলোর অন্যান্য অগ্রাধিকার খাতে। বিরোধীরা এর তীব্র সমালোচনা করেছেন।
বিলের ওপর ভোটগ্রহণের আগে বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ বলেন, ‘এটি কোনো বাজেট নয়। এটি একটি ডাকাতি। ইসরায়েলি জনগণ বোকা নয়। তারা বোঝে যে, এই বাজেট দুর্নীতিবাজ ও নাগরিকদের খরচে উৎসব করা ব্যক্তিদের জন্য বড় সুযোগ।’ 
সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট বাজেটকে রাষ্ট্রের ইতিহাসের ‘সবচেয়ে বেপরোয়া এবং জায়নবাদ-বিরোধী’ বলে অভিহিত করেছেন। বেনেটকে আগামী নির্বাচনে নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্ব›দ্বী হিসেবে দেখা হচ্ছে। এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, ‘আমরা যুদ্ধের মধ্যে আছি। যখন কাটছাঁট প্রয়োজন হয়, তখন তা ইসরায়েলের মানুষ সহ্য করতে জানে। কিন্তু বর্তমান সরকার সম্পূর্ণ ভিন্ন কিছু করছে। তারা সরকারি কোষাগার লুট করছে।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ