খুলনা | বুধবার | ১৫ এপ্রিল ২০২৬ | ২ বৈশাখ ১৪৩৩

বাংলাদেশি নারীরা কোন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি?

এলিন মাহবুব |
০১:৪৭ এ.এম | ৩১ মার্চ ২০২৬


বাংলাদেশকে প্রায়ই নারীর ক্ষমতায়নের একটি সফল উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়। শিক্ষা, শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ, ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম, এমনকি রাজনৈতিক নেতৃত্বেও নারীর উপস্থিতি এসব অর্জন নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। তবে এই অগ্রগতির আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে বাস্তবতা, যা আমাদের আরও গভীরভাবে ভাবতে বাধ্য করে। দেশের নারীরা এখনও সহিংসতা, শিশুবিবাহ, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং সামাজিক প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি। এই চ্যালেঞ্জগুলো শুধুমাত্র সংখ্যার বিষয় নয়; এগুলো দেশের টেকসই উন্নয়ন, সামাজিক ন্যায় এবং মানবাধিকার প্রতিরোধের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
নারীর অগ্রগতির পথে সবচেয়ে বড় বাঁধার মধ্যে একটি হলো সহিংসতা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউএনএফপি এর যৌথভাবে পরিচালিত ভায়োলেন্স এগেনস্ট উইমেন সার্ভে ২০২৪ অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৭৫-৭৬ শতাংশ বিবাহিত নারী জীবনের কোনো না কোনো সময় স্বামী বা ঘনিষ্ঠ সঙ্গীর সহিংসতার শিকার হয়েছেন। তবে আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অনেক নারী এই অভিজ্ঞতার কথা কাউকে জানায় না-ভয়, সামাজিক লজ্জা বা পারিবারিক চাপে অনেক ঘটনা নীরবতার আড়ালেই থাকে।
এটি শুধু ব্যক্তিগত নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়; এটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নেরও একটি বাধা। যখন নারীরা সহিংসতার ভয় নিয়ে জীবন কাটান, তখন তারা শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং নেতৃত্বের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন। এই বাস্তবতা প্রমাণ করে যে, আইনের পাশাপাশি মানসিক ও সামাজিক সচেতনতা তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি।
শিশুবিবাহ বাংলাদেশের নারীর অগ্রগতিতে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা। বি বি এস এবং ইউনিসেফ পরিচালিত মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে  ২০১৯ অনুযায়ী, দেশের ২০-২৪ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে প্রায় ৫১.৪% মেয়ে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই বিয়ে হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার ২০১৭ সালে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে আইন প্রণয়ন করলেও “বিশেষ পরিস্থিতি” ধারা ১৯-এর কারণে আইন প্রয়োগে দুর্বলতা রয়েছে।
আঞ্চলিকভাবে বাল্যবিবাহের হার সবচেয়ে বেশি রাজশাহী (৬৬.৭%) ও খুলনা (৬১.৮%) বিভাগে, এরপর রংপুর (৫৭.৯%), বরিশাল (৫৫.৬%), ময়মনসিংহ (৫২.২%), ঢাকা (৪৮.৬%), চট্টগ্রাম (৪৪.১%) এবং সিলেট (৩১%)। অর্থাৎ সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভিন্নতা কেবলমাত্র দেশের নির্দিষ্ট অঞ্চলে বাল্যবিবাহের হার বাড়াচ্ছে।
শিশুবিবাহের প্রভাব কেবল শিক্ষার পথ বন্ধ করার মধ্যেই সীমিত নয়। কিশোরী গর্ভধারণ এবং প্রসবকালীন জটিলতা ১৫-১৯ বছর বয়সী নারীর মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। বিশ্বব্যাপী প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ মেয়ে প্রতি বছর ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই বিয়ের শিকার হন। ৬৪ কোটি নারী ও মেয়ে বাল্যবিবাহের শিকার, যার মধ্যে প্রায় ২৫ কোটি মেয়ের বয়স ১৫ বছরের কম। এই পরিসংখ্যান আমাদের দেখায় যে, শিশুবিবাহ শুধুমাত্র বাংলাদেশ নয়, বৈশ্বিক একটি গুরুতর মানবাধিকার চ্যালেঞ্জ (সূত্র: ইউনিসেফ, ২০১৯)।
বাংলাদেশে শিশুবিবাহের মূল চালিকা হলো দারিদ্র্য, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা, যৌতুক নির্ভর প্রথা, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় ভুল ধারণা, আইনের দুর্বল প্রয়োগ, শিক্ষা থেকে ঝরে পড়া এবং স্থানীয় নেতৃত্বের সীমিত অংশগ্রহণ। কেবল আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়; শিক্ষা, ক্ষমতায়ন, সামাজিক সুরক্ষা এবং মানুষের মানসিকতার পরিবর্তনও অপরিহার্য।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য হলেও সমতার পর্যায়ে পৌঁছায়নি। তৈরি পোশাক শিল্পসহ বিভিন্ন খাতে নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন, তবে কম মজুরি, অনিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং সীমিত নেতৃত্বের সুযোগের সঙ্গে তারা প্রতিনিয়ত লড়াই করছেন। ওয়ার্ল্ড ব্যাংক জেন্ডার ডাটা, বাংলাদেশ অনুসারে, নারীদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ বাড়লেও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এবং উচ্চ আয়ের পেশায় তাদের উপস্থিতি এখনও তুলনামূলকভাবে কম।
নারীদের অর্থনৈতিক স্বায়ত্তশাসন এবং নেতৃত্বের অভাব কেবল তাদের জীবনের মানকে প্রভাবিত করছে না; এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকেও প্রভাবিত করছে। গবেষণায় দেখা যায়, যখন নারীরা অর্থনীতিতে পূর্ণভাবে অংশ নেন, তখন জাতীয় জিডিপি ও সামাজিক স্থিতিশীলতাও বৃদ্ধি পায়। তাই নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন কেবল নৈতিক নয়, এটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নেরও একটি মূল চালিকা।
শিক্ষাক্ষেত্রে বাংলাদেশ গত দুই দশকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে মেয়েদের ভর্তি অনেক বেড়েছে। কিন্তু সামাজিক বা পারিবারিক কারণে অনেক মেয়ে উচ্চশিক্ষায় পৌঁছানোর আগেই পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। শিশুবিবাহ, দারিদ্র্য এবং সামাজিক মানসিকতা এখনও শিক্ষার পথের বড় বাঁধা।
শিক্ষা এবং ক্ষমতায়নকে শক্তিশালী করতে হলে কেবল বিদ্যালয় খোলা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন পরিবেশগত ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তন। সমাজের পুরুষ সদস্যদের মানসিকতা পরিবর্তন, পরিবার ও স্থানীয় নেতাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং নারীর শিক্ষা ও স্বাস্থ্যকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া একান্ত প্রয়োজন।
তবে বাংলাদেশের নারীদের গল্প শুধুই সমস্যার নয়; সব বাঁধা জয় করে টিকে থাকার গল্প।  গ্রামীণ উদ্যোক্তা থেকে শুরু করে প্রযুক্তি খাতে নতুন উদ্যোগ-দেশজুড়ে নারীরা নতুন সম্ভাবনার পথ তৈরি করছেন। তারা কেবল অর্থনীতির অংশ নন, বরং সামাজিক পরিবর্তনেরও চালিকাশক্তি।
উদাহরণ হিসেবে, গ্রামীণ নারীরা ক্ষুদ্রঋণ, হস্তশিল্প, আইটি এবং উদ্যোক্তা উদ্যোগের মাধ্যমে নিজস্ব অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়ে তুলছেন। তাদের এই উদ্যোগ দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের একটি অনন্য দৃষ্টান্ত। এরা প্রমাণ করছেন যে, সঠিক সমর্থন ও সুযোগ থাকলে নারীরা শুধু পরিবারের নয়, সমগ্র দেশের উন্নয়নে নেতৃত্ব দিতে পারেন।
বাংলাদেশ যদি সত্যিকারের টেকসই উন্নয়নের পথে এগিয়ে যেতে চায়, তাহলে নারীদের বাস্তব চ্যালেঞ্জগুলোকে আরও গুরুত্ব দিয়ে মোকাবিলা করতে হবে। সহিংসতা প্রতিরোধ, শিশুবিবাহ বন্ধ, সমান অর্থনৈতিক সুযোগ নিশ্চিত করা এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। এসব ক্ষেত্রে সমন্বিত উদ্যোগ অপরিহার্য।
এটি কেবল আইন প্রণয়নের বিষয় নয়; শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন এবং মানুষের মানসিকতার পরিবর্তন একসাথে প্রয়োজন। রাষ্ট্র, সমাজ এবং স্থানীয় নেতৃত্বের সমন্বয় ছাড়া নারীর পূর্ণ ক্ষমতায়ন সম্ভব নয়।
অগ্রগতির গল্প অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেই অগ্রগতি তখনই অর্থবহ হবে, যখন বাংলাদেশের প্রতিটি নারী নিরাপদ, সম্মানজনক এবং সমান সুযোগের একটি সমাজে নিজের সম্ভাবনাকে পূর্ণভাবে বিকশিত করতে পারবেন। নারীর ক্ষমতায়ন শুধু তাদের অধিকার নয়; এটি দেশের টেকসই উন্নয়নের একটি মূল ভিত্তি।
বাংলাদেশকে নারীর ক্ষমতায়নের একটি আদর্শ দেশে পরিণত করতে হলে আমাদের দৃষ্টি রাখতে হবে কেবল শিক্ষার হার বা অর্থনীতিতে অংশগ্রহণের সংখ্যা নয়, বরং সামাজিক মানসিকতা, আইন প্রয়োগ এবং নারীর নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার বাস্তবতা।
প্রকৃত অগ্রগতি তখনই অর্জিত হবে, যখন দেশের প্রতিটি নারী তার জীবন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং অর্থনৈতিক স্বাধীনতার ক্ষেত্রে পূর্ণ সুযোগ পাবে এবং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাঁধা তাদের সম্ভাবনাকে সীমাবদ্ধ করতে পারবে না।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ