খুলনা | শনিবার | ২৪ জানুয়ারী ২০২৬ | ১১ মাঘ ১৪৩২
পুলিশ প্রশাসনে পদোন্নতির গুরুত্বপূর্ণ সময় ঘনিয়ে আসতেই আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে একটি স্বার্থান্বেষী মহল। অভিযোগ উঠেছে, পতিত স্বৈরাচারী সরকারের দোসর হিসেবে পরিচিত পুলিশ প্রশাসনের ঘাপটি মেরে থাকা একটি চক্র এবার দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) ব্যবহার করে সৎ ও ‘বঞ্চিত’ কর্মকর্তাদের চরিত্রহণনে নেমেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশের উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) ড. মো. আশরাফুর রহমান এবং ময়মনসিংহ কোতোয়ালি থানার সাবেক ওসি মো. শফিকুল ইসলাম খানের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুদকের তথ্যানুসন্ধানের খবরটি এই ষড়যন্ত্রের সর্বশেষ নজির বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অভিযোগের আড়ালে ‘বেনামী’ ষড়যন্ত্র
দুদক সূত্রে জানা গেছে, গত ৪ নভেম্বর কমিশনের এক সভায় এই দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোনও অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় নাই। তবে দুদকের একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তার সাথে কথা বলে জানা গেছে, এই অভিযোগগুলো মূলত ‘বেনামী’ এবং সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণহীন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুদকের এক উপ-পরিচালক জানান, কমিশনে প্রতিদিন শত শত বেনামী অভিযোগ আসে। সাধারণত যাচাই-বাছাই ছাড়া এসব আমলে নেওয়া হয় না। প্রভাবশালী মহলের তদবিরে দুদক সিদ্ধান্ত না নিলেও প্রপাগান্ডা সংশ্লিষ্টদের সামাজিক মর্যাদা ক্ষুন্ন করাই উদ্দেশ্য।
টার্গেট ১৫তম বিসিএস: নেপথ্যে কারা?
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই ষড়যন্ত্রের মূল টার্গেট মূলত বিসিএস পুলিশ ক্যাডারের ১৫তম এবং ১৭তম ব্যাচের কর্মকর্তারা, যারা বিগত সরকারের আমলে চরম বৈষম্যের শিকার হয়েছিলেন। অভিযোগের তীর পুলিশ সদর দপ্তরের এক প্রভাবশালী অতিরিক্ত আইজিপির দিকে, যিনি অবস্থা বুঝে অসৎ উপায়ে সুবিধাজনক অবস্থানে যেতে চায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ১৫তম বিসিএস ব্যাচের কর্মকর্তা এবং গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের (জিএমপি) সাবেক কমিশনার ড. মো. নাজমুল করিম খানকে যেভাবে বিতর্কিত করে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, ঠিক একই ব্লু-প্রিন্ট এখন বাস্তবায়ন করা হচ্ছে ডিআইজি ড. আশরাফুর রহমানের ক্ষেত্রে।
উল্লেখ্য, ড. নাজমুল করিম খান ছাত্রদলের রাজনীতিতে যুক্ত থাকার ‘অপরাধে’ ২০২৩ সালে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছিল এবং ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পর তিনি চাকরিতে পুনর্বহাল হন। তাকে একটি পত্রিকা ফরমায়েসি প্রপাগান্ডার মাধ্যমে সরানোর গভীর ষড়যন্ত্র করা হয়। তাকে সরানোর পর এখন ষড়যন্ত্রকারীদের লক্ষ্য বাকি ‘বঞ্চিত’ কর্মকর্তাদের পদোন্নতি আটকানো।
কে এই ড. মো. আশরাফুর রহমান?
ডিআইজি ড. মো. আশরাফুর রহমান একজন পিএইচডি ডিগ্রিধারী পুলিশ কর্মকর্তা, যিনি তার কর্মজীবনে সততা ও পেশাদারিত্বের জন্য পরিচিত। বিগত সরকারের আমলে তিনি দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে বঞ্চিত ছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর তিনি ময়মনসিংহ রেঞ্জের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তিনি ময়মনসিংহ বিভাগে ভেঙে পড়া পুলিশি চেইন অব কমান্ড পুনরুদ্ধারে কঠোর পদক্ষেপ নেন। বিশেষ করে, নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী এবং পলাতক আওয়ামী লীগ নেতাদের বিরুদ্ধে তার কঠোর অবস্থান তাকে একটি নির্দিষ্ট মহলের চক্ষশূলে পরিণত করে।
* কর্মকান্ড: গত কয়েক মাসে তার নেতৃত্বে ময়মনসিংহ রেঞ্জে প্রায় ৮০০ জন চিহ্নিত অপরাধী ও নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়।
* আক্রোশ: ধারণা করা হচ্ছে, এই গ্রেপ্তার অভিযানের কারণেই স্থানীয় আওয়ামী লীগের একটি সিন্ডিকেট এবং পুলিশের ভেতরে লুকিয়ে থাকা তাদের দোসররা একজোট হয়ে তার বিরুদ্ধে মিথ্যা দুর্নীতির অভিযোগ সাজিয়েছে।
উদ্দেশ্য ও অপকৌশল :
পুলিশের আসন্ন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের পদোন্নতি প্রক্রিয়াকে সামনে রেখে এই মিথ্যাচার শুরু হয়েছে। ষড়যন্ত্রকারীদের মূল উদ্দেশ্য হলো:
১. দুদকের অনুসন্ধানের দোহাই দিয়ে মেধাবী ও বঞ্চিত কর্মকর্তাদের পদোন্নতি বোর্ড থেকে বাদ দেওয়া।
২. জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে প্রশাসনের সৎ কর্মকর্তাদের মনোবল ভেঙে দেওয়া।
৩. পুলিশের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিজেদের অনুগত লোকদের বসিয়ে পতিত স্বৈরাচারের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করা।
বিশ্লেষকদের মত:
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও সাবেক পুলিশ কর্মকর্তারা মনে করছেন, অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে যারা পুলিশকে পুনর্গঠন করছেন, তাদের বিরুদ্ধে এমন ঢালাও অভিযোগ পুলিশ বাহিনীর সংস্কার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করবে। এখনই যদি এই ‘ষড়যন্ত্রমূলক’ তৎপরতা থামানো না যায়, তবে প্রশাসনে আবারও দলীয়করণের ভূত চেপে বসবে।
জনমনে প্রশ্ন—যে কর্মকর্তারা বিগত ১৫ বছর ধরে নিগৃহীত ছিলেন এবং বর্তমানে স্বৈরাচার বিরোধী অবস্থানে অনড়, তাদের বিরুদ্ধে হঠাৎ করে দুর্নীতির অভিযোগ কেন? দুদককে ব্যবহার করে
বিশেষ মহলের এজেন্ডা বাস্তবায়নের হাতিয়ারে যেন পরিণত না হয় তার জন্য ওয়াকিবহালদের ভ্যানগার্ড হিশেবে কাজ করতে হবে।