সময়ের খবর

খুলনা | সোমবার | ২৬ জানুয়ারী ২০২৬ | ১২ মাঘ ১৪৩২

নির্বাচনে ডিজিটাল অপপ্রচার : সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে

|
১২:৪৪ এ.এম | ২৫ জানুয়ারী ২০২৬


আগামী ১২ ফেব্র“য়ারি দেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের এই সন্ধিক্ষণে দেশ যখন একটি সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ নির্বাচনের অপেক্ষায়, ঠিক তখনই ডিজিটাল পরিসরে ভয়াবহ অপতৎপরতা শুরু হয়েছে। কয়েক মাস ধরে দেশের শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমগুলোর নাম, লোগো এবং নকশা নকল করে একশ্রেণির অসাধু চক্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য, ভুয়া ফটোকার্ড ও এআইয়ের (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) তৈরি করা কনটেন্ট বা আধেয় ছড়িয়ে দিচ্ছে। এই ‘ডিজিটাল জালিয়াতি’ কেবল সংবাদমাধ্যমের ভাবমূর্তির ওপর আঘাত নয়, বরং এটি ভোটারের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সুষ্ঠু নির্বাচনী পরিবেশের জন্য এক অশনিসংকেত।
তথ্যপ্রযুক্তির অগ্রগতি যেখানে মানুষের জীবন সহজ করার কথা ছিল, সেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এখন অপপ্রচারের সবচেয়ে ধারালো অস্ত্র হয়ে উঠেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, গত বছরই গণমাধ্যমকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে গড়ে প্রতিদিন দু’টির বেশি ভুয়া তথ্য ছড়ানো হয়েছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক নেতাদের নামে মিথ্যা বক্তব্যসংবলিত ‘ফটোকার্ড’ বা ‘ডিপফেক’ ভিডিও তৈরির মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। স¤প্রতি বিএনপি’র মহাসচিব থেকে শুরু করে জামায়াতে ইসলামীর নেতা কিংবা নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের নিয়ে যে ধরনের রুচিহীন ও মিথ্যা তথ্য ছড়ানো হয়েছে, তা রাজনৈতিক শিষ্টাচারের চরম লঙ্ঘন।
এই অপপ্রচারের একটি সূ² কৌশল হলো মূলধারার গণমাধ্যমের অনুকরণ। মানুষ সাধারণত প্রথম আলো বা দেশের বড় টিভি চ্যানেলগুলোর তথ্যের ওপর আস্থা রাখে। সেই আস্থার সুযোগ নিয়ে যখন হুবহু লোগো ও ফন্ট ব্যবহার করে কোনো মিথ্যা সংবাদ কার্ড আকারে প্রকাশ করা হয়, তখন সাধারণ ভোটারের পক্ষে সত্য-মিথ্যা পার্থক্য করা কঠিন হয়ে পড়ে। এতে করে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়ায়, যা ভোটের ময়দানে সহিংসতা বা অস্থিতিশীলতা উস্কে দিতে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে, এমনকি পাশের দেশ ভারত কিংবা ইন্দোনেশিয়ায়ও নির্বাচনের আগে ডিপফেক প্রযুক্তির অপব্যবহার গণতন্ত্রকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এইঝুঁকি আরও বেশি, কারণ আমাদের বড় একটি অংশ এখনো ডিজিটাল সাক্ষরতায় পিছিয়ে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার ও গুজব ছড়িয়ে সহিংসতার ঘটনা নতুন নয়। এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিপফেক প্রযুক্তি যুক্ত হয়ে ডিজিটাল অপপ্রচারের ধরন এখন বদলে গেছে। নির্বাচনের সময় বিভিন্ন এলাকায় নিরাপত্তাহীনতা ও সহিংস পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা আছে। এ ক্ষেত্রে ডিজিটাল অপপ্রচার সহিংস পরিস্থিতি তৈরি করা ও উস্কে দেওয়ার হাতিয়ার হিসেবে কাজ করবে। 
নির্বাচন কমিশন, সরকার এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর জন্য এটি একটি বড় পরীক্ষা। কেবল ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বুলি আউড়ে এই সুনামি ঠেকানো সম্ভব নয়। প্রয়োজন বিশেষায়িত সাইবার ফরেনসিক ইউনিট এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার কার্যকর মেকানিজম। নির্বাচনী আচরণবিধিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহারকে কঠোর অপরাধ হিসেবে গণ্য করতে হবে এবং রাজনৈতিক দলগুলোকে ‘ডিজিটাল এথিকস’ বা ডিজিটাল নৈতিকতা মেনে চলার অঙ্গীকারে আবদ্ধ করতে হবে।
তবে সবচেয়ে বড় সুরক্ষা আসতে পারে সচেতন পাঠকদের কাছ থেকে। যেকোনো চটকদার শিরোনাম বা বিতর্কিত ফটোকার্ড দেখলেই তা শেয়ার না করে সত্যতা যাচাই করা এখন নাগরিক দায়িত্ব। সংবাদের উৎস কি কোনো ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ? ওয়েবসাইটের বানান কি ঠিক আছে? সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমে কি আসলেই এমন সংবাদ আছে? এই সামান্য প্রশ্নগুলোই পারে অপপ্রচারের শিকল ভাঙতে। প্রথম আলো তার পাঠকদের সচেতন করতে ইতিমধ্যে সতর্কবার্তা দিয়েছে। আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি গুজব যেমন সমাজকে বিষিয়ে দিতে পারে, তেমনি আমাদের সচেতনতা একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে পারে। প্রযুক্তির কাছে যেন গণতন্ত্র পরাজিত না হয়, সেটিই হোক আমাদের আজকের অঙ্গীকার।

্্ট

আরও সংবদ