খুলনা | মঙ্গলবার | ২৭ জানুয়ারী ২০২৬ | ১৩ মাঘ ১৪৩২
ব্যবহারকারীদের বড় একটি অংশ তরুণ
বাংলাদেশের ৮২ লাখ মানুষ এক বা একাধিক ধরনের মাদক ব্যবহার করছেন, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ। মাদক ব্যবহারকারীদের বড় একটি অংশ তরুণ। আর উলেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ ১৮ বছর বয়সের আগেই প্রথম মাদক গ্রহণ শুরু করে। দেশে মাদক ব্যবহারের এমনই এক ভয়াবহ চিত্র এবং এর ক্রমবর্ধমান জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি উঠে এসেছে সা¤প্রতিক এক গবেষণায়। রোববার বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের কনফারেন্স হলে ‘বাংলাদেশে মাদক অপব্যবহারকারী ব্যক্তিদের সংখ্যা, ধরন ও সংশ্লিষ্ট কারণসমূহ’ শীর্ষক গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা হয়। গবেষণাটি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অর্থায়নে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও রিসার্চ এ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট কনসালটেন্টস লিমিটেড (আরএমসিএল) যৌথভাবে ২০২৫ সালের ফেব্র“য়ারি থেকে জুন পর্যন্ত এ গবেষণা পরিচালনা করে।
গবেষণায় দেশের আট বিভাগের ১৩ জেলা ও ২৬ উপজেলা থেকে ৫ হাজার ২৮০ জনের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এতে পরিমাণগত (কোয়ান্টিটেটিভ) ও গুণগত (কোয়ালিটেটিভ) উভয় পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে।
গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, বিভাগভেদে মাদক ব্যবহারের হারে উলেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। ময়মনসিংহ (৬ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ), রংপুর (৬ শতাংশ) ও চট্টগ্রাম (৫ দশমিক ৫ শতাংশ) বিভাগে মাদক ব্যবহারের হার সবচেয়ে বেশি। অন্যদিকে রাজশাহী (২ দশমিক ৭২ শতাংশ) ও খুলনা (৪ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ) বিভাগে তুলনামূলকভাবে কম হার লক্ষ্য করা গেছে।
তবে সংখ্যার বিচারে সর্বাধিক মাদক ব্যবহারকারী বসবাস করছে ঢাকা বিভাগে (প্রায় ২২.৯ লাখ), এরপর রয়েছে চট্টগ্রামে (১৮.৮ লাখ) ও রংপুরে বিভাগ (প্রায় ১০.৮ লাখ)।
বিভাগভিত্তিক মাদক ব্যবহারকারীর আনুমানিক সংখ্যা বরিশালে ৪ লাখ চার হাজার ১১৮ জন, চট্টগ্রামে ১৮ লাখ ৭৯ হাজার ৫০৩ জন, ঢাকায় ২২ লাখ ৮৭ হাজার ৯৭০ জন, খুলনাতে ৭ লাখ ২৬ হাজার ২১০ জন, ময়মনসিংহে ৭ লাখ ৬০ হাজার ৮১২ জন, রাজশাহীতে ৫ লাখ ৬৬ হাজার ৫০৯ জন, রংপুরে ১০ লাখ ৮০ হাজার ৫৮৮ জন ও সিলেটে ৪ লাখ ৮৮ হাজার ১৪১ জন।
মাদক প্রকারভেদ বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রায় ৬১ লাখ মানুষ গাঁজা ব্যবহার করে। এরপর রয়েছে ইয়াবা বা মেথামফেটামিন (প্রায় ২৩ লাখ), এ্যালকোহল (২০ লাখ), কোডিনযুক্ত কাশির সিরাপ, ঘুমের ওষুধ ও হেরোইন।
গবেষণার প্রধান গবেষক বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) ডিন অধ্যাপক ডাঃ সাইফ উলাহ মুন্সী বলেন, ‘দেশে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মাদক হলো গাঁজা। এর পরের অবস্থানে রয়েছে ইয়াবা, হেরোইন, ফেন্সিডিল ও কোডিনজাত কাশি সিরাপ।’
গবেষণায় দেখা যায়, ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণকারীর সংখ্যা প্রায় ৩৯ হাজার। এ ধরনের মাদক ব্যবহারকারীরা এইচআইভি, হেপাটাইটিসসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হওয়ার উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছেন।
গবেষণার তথ্যে আরও উঠে এসেছে গ্রামাঞ্চলে মাদক গ্রহণকারী বাড়ার কথা। গবেষকেরা বলছেন, শহরাঞ্চলে মাদক ব্যবহারকারীর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি হলেও গ্রামাঞ্চলেও এর বিস্তার দ্রুত বাড়ছে। সবচেয়ে বেশি মাদক ব্যবহারকারী রয়েছে ঢাকা বিভাগে এবং সর্বনিম্ন বরিশাল বিভাগে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, মাদক ব্যবহারকারীদের অধিকাংশই তরুণ বয়সের। প্রায় ৩৩ শতাংশ ব্যবহারকারী ৮ থেকে ১৭ বছর বয়সে বা শিশু বয়সে প্রথম মাদক গ্রহণ শুরু করেছে। আর ৫৯ শতাংশ ব্যবহারকারী ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সে প্রথম মাদক গ্রহণ শুরু করে।
গবেষণা প্রতিবেদনে মাদক ব্যবহারের প্রধান ঝুঁকিপূর্ণ কারণ হিসেবে বেকারত্ব, বন্ধুমহলের প্রভাব, আর্থিক অনিশ্চয়তা, পারিবারিক অস্থিরতা, মানসিক চাপ এবং অনানুষ্ঠানিক পেশায় যুক্ত থাকাকে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রায় ৯০ শতাংশ ব্যবহারকারী জানিয়েছেন, মাদক তাঁদের জন্য সহজলভ্য।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাদক সমস্যা শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়, একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যাও। প্রতিরোধের পাশাপাশি চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং সামাজিক পুনঃঅন্তর্ভুক্তির ওপর জোর দিতে হবে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডাঃ মোঃ শাহিনুল আলম বলেন, মাদক প্রতিরোধে রাজনৈতিক দলগুলোর অঙ্গীকার জরুরি। তিনি বলেন, ‘এটা ভাবার কোনো কারণ নেই যে, কিছু খারাপ মানুষই শুধু মাদকাসক্ত এবং আমরা বা আমাদের সন্তানেরা মাদক থেকে দূরে আছি। বাস্তবে আমরা এবং আমাদের সন্তানেরা সবাই মাদকাসক্ত হওয়ার ঝুঁকির মধ্যেই আছি।’
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোঃ হাসান মারুফ বলেন, ‘বর্তমান সময়ের বাস্তবতা হলো, দেশের মানুষ মাদকাসক্ত হওয়ার ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। সামাজিক আন্দোলন ও একটি সামাজিক যুদ্ধের মাধ্যমে সম্মিলিতভাবে মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।’
অনুষ্ঠানে আরও ছিলেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মোহাম্মদ গোলাম আজম, কো-ইনভেস্টিগেটর অধ্যাপক ডাঃ মোঃ তাজুল ইসলাম, কো-ইনভেস্টিগেটর ফোরকান হোসেন, বিএমইউর পরিচালক (হাসপাতাল) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইরতেকা রহমান, অতিরিক্ত পরিচালক (সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল) ডাঃ মোঃ শাহিদুল হাসান বাবুল প্রমুখ।