খুলনা | বৃহস্পতিবার | ২৯ জানুয়ারী ২০২৬ | ১৬ মাঘ ১৪৩২
সা¤প্রতিক এক জাতীয় গবেষণায় দেশে মাদকাসক্তির যে ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে, তা শুধু উদ্বেগজনক নয়; বরং এক অশনিসংকেত। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অর্থায়নে পরিচালিত এই গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে বর্তমানে মাদকসেবীর সংখ্যা প্রায় ৮২ লাখ, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪.৮৮ শতাংশ। এর মধ্যে সবচেয়ে শিউরে ওঠার মতো তথ্য হলো, মাদক ব্যবহারকারীদের ৬০ শতাংশেরই হাতেখড়ি হয় ১৮ বছর বয়স পূর্ণ হওয়ার আগে। অর্থাৎ আমাদের কিশোররাও ক্রমে অন্ধকারের পথে পা বাড়াচ্ছে। গবেষণা অনুযায়ী, মাদকাসক্তিতে ঢাকা বিভাগ শীর্ষে এবং বরিশাল সর্বনিম্ন অবস্থানে রয়েছে। ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক কারণে বড় শহর এবং সীমান্তবর্তী এলাকাগুলো মাদকের সহজলভ্যতার শিকার হচ্ছে। তবে মাদকের বিস্তার এখন আর শুধু শহরে সীমাবদ্ধ নেই, তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে গ্রামাঞ্চলেও। মাদক গ্রহণের পেছনে বন্ধুদের প্রভাব, কৌতূহল এবং পারিবারিক অশান্তির মতো বিষয়গুলো প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
এটি স্পষ্ট যে মাদক সমস্যাকে শুধু আইন-শৃঙ্খলার চশমায় দেখলে ভুল হবে। এটি একটি গভীরতর সামাজিক ও জনস্বাস্থ্য সমস্যা। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো মাদক সরবরাহ বন্ধে কাজ করলেও চাহিদা কমানোর জন্য মনস্তাত্তি¡ক ও সামাজিক উদ্যোগের ঘাটতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
দেশে মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সেবার ব্যাপক ঘাটতি বহু বছরের সমস্যা। ফলে সরকার ঢাকার বাইরে সাতটি বিভাগে ২০০ শয্যার পুনর্বাসন কেন্দ্র স্থাপনের যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু অভিযান পরিচালনা বা অপরাধীকে আটক করা দিয়ে মাদক সমস্যা সমাধান হবে না। প্রয়োজন প্রতিরোধ, চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং সমাজে পুনঃঅন্তর্ভুক্তিকে একটি সমন্বিত জাতীয় কৌশলের অংশ হিসেবে দেখা। আমাদের মনে রাখতে হবে, একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তি অপরাধী নন, বরং তিনি একজন অসুস্থ মানুষ যার সঠিক চিকিৎসা ও সহমর্মিতা প্রয়োজন।
গবেষণাটি আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে মাদক সমস্যা কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিগত বিপর্যয় নয়; এটি আমাদের সমাজ, পরিবার এবং রাষ্ট্রের ওপর সমানভাবে আঘাত হানছে।
মাদকমুক্ত সমাজ গড়তে হলে পরিবার থেকেই প্রতিরোধের দেয়াল তুলতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় উপাসনালয়গুলোকে মাদকের বিরুদ্ধে নৈতিক প্রচারণায় শামিল হতে হবে। মাদকাসক্তিকে একটি ‘সামাজিক যুদ্ধ’ হিসেবে ঘোষণা করে রাষ্ট্র, সমাজ এবং পরিবার-এই ত্রিভুজ শক্তির সমন্বিত লড়াই নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে নীতি গ্রহণ এবং সর্বস্তরের মানুষের সমন্বিত সামাজিক আন্দোলন। মাদকবিরোধী লড়াইকে জাতীয় অগ্রাধিকারে পরিণত করতে হবে-যত দ্রুত, তত ভালো।
সম্পাদকীয়
প্রায় ৭ দিন আগে