খুলনা | বুধবার | ২৮ জানুয়ারী ২০২৬ | ১৫ মাঘ ১৪৩২
মোংলা বন্দরের আধুনিক বর্জ্য ও নিঃসৃত তেল অপসারণ ব্যবস্থাপনা প্রকল্প উদ্বোধন
মোংলা বন্দরের আধুনিক বর্জ্য ও নিঃসৃত তেল অপসারণ ব্যবস্থাপনা প্রকল্প উদ্বোধন করলেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অবঃ) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন। মঙ্গলবার দুপুরে এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এর উদ্বোধন করা হয়। এ সময় বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল শাহীন রহমান, সদস্য (হারবার ও মেরিন) কমডোর মোঃ শফিকুল ইসলাম সরকার, সদস্য (অর্থ) ও পরিচালক (প্রশাসন অঃদাঃ) কাজী আবেদ হোসেন (যুগ্ম-সচিব), সদস্য (প্রকৌশল ও উন্নয়ন) ড. এ কে এম আনিসুর রহমান (যুগ্ম-সচিব), পরিচালক (বোর্ড) কালাচাঁদ সিংহ (যুগ্ম-সচিব), প্রকল্প পরিচালক ও হারবার মাষ্টার ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম সহ বন্দরের সকল বিভাগীয় প্রধান ও বন্দরের সকল কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং বন্দর ব্যবহারকারীগণ উপস্থিত ছিলেণ।
বাংলাদেশ MARPOL Convention এর স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে নিজস্ব সমুদ্রসীমার জলযান থেকে সৃষ্ট দূষণ হতে রক্ষার জন্য মোংরা বন্দর একটি প্রকল্প গ্রহন করে। এ প্রকল্পের আওতায় আন্তর্জাতিক বন্দরসমূহ কার্যকরী এবং আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত Port Reception Facility এর ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করা হবে। এই ব্যবস্থাপনা কার্যকর থাকলে সামুদ্রিক দূষণ পরিহার করে জলযানসমূহের বর্জ্য নিরাপদে নিষ্কাশন করা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। বন্দরে আগত বাণিজ্যিক জাহাজ থেকে নির্গত বর্জ্য ও দুর্ঘটনা কবলিত জাহাজ থেকেও নিঃসৃত তেল সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অপসারণ ও পরিশোধন করার সক্ষমতা অর্জন করা হবে। এ নিয়ম যে কোন আন্তর্জাতিক বন্দরের জন্য বাধ্যতামূলক মানদন্ড হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। মোংলা বন্দর নবনির্মিত Port Reception Facility প্রকল্প স্থাপনের মাধ্যমে সেই মানদন্ড নিশ্চিত করার জন্যই প্রকল্প গ্রহণ করা। আন্তর্জাতিক মারপোল কনভেনশন এর সকল শর্তাবলি নিশ্চিত করে নির্মিত এই প্লান্টটি বন্দরে আগত সকল বাণিজ্যিক জাহাজ থেকে দূষিত তরল ও অন্যান্য বর্জ্য নিরাপদে স্থানান্তর ও পরিশোধন করে পরিবেশ রক্ষায় বিশেষ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করছেন নৌপরিবহন মন্ত্রনালয়ের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অবঃ) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন।
মোংলা বন্দর সূত্রে জানায় প্রকল্পের প্রধান কম্পোনেন্ট হচ্ছে ২টি তেল অপসারণকারী জলযান, ২টি বর্জ্য সংগ্রহকারী জলযান, পিআরএফ প্লান্ট, ১টি ডাম্প বার্জ, ১টি সেল্ফ প্রপেল্ড বার্জ, ১টি সার্ভিস টাগ বোট, ১টি পন্টুন, জেটি ও ইয়ার্ড নির্মাণ করা হয়েছে। Port Reception Facility প্লান্ট এর কার্যক্রম শুরু হয় ২০২০ সালে। ২০২০ সালের ১ জানুয়ারি প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়েছিল। এ সময় প্রথম পর্যায় এর ব্যায় ধরা হয়েছিল একশ’ ১৪ কোটি টাকা। ধাপে ধারে এর ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৫১১ কোটি টাকায়। প্রকল্পটি শেষ হয়েছিল ২০২৫ সালের ৩০ জুন। বিভিন্ন সমস্যার কারণে দীর্ঘ ৭ মাস পর ২৭ জানুয়ারি মঙ্গলবার এ প্রকল্পের শুভ উদ্বোধন করা হয়েছে।
মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল শাহীন রহমান বলেন এ প্রকল্পটি বন্দরের বিশেষায়িত জাহাজসমূহের মাধ্যমে বন্দরের হারবাড়িয়া ও বহিনোঙরে থাকা বাণিজ্যিক জাহাজ থেকে যথাসময়ে দূষিত পানি মিশ্রিত তেল ও বর্জ্য সংগ্রহ করে প্লান্টের নিজস্ব জেটিতে নিয়ে আসা হবে। এরপর সংগ্রহকৃত সামগ্রীকে বিশেষায়িত ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষার মাধ্যমে পরিশোধনের ধরন নির্ধারণ করা হবে। পরে প্লান্টের পরিশোধনাগারে দক্ষ প্রকৌশলীর তত্ত¡াবধানে ধাপে ধাপে সংগ্রহকৃত বর্জ্য গুলো পরিবেশ বান্ধব করে তোলা হবে। নবনির্মিত এই প্লান্টের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এটি সংগৃহীত বর্জ্যসমূহ পরিশোধনের পাশাপাশি পুনরায় তা ব্যবহারযোগ্য তরল ও অন্যান্য উপাদানে রূপান্তর করে যা পরবর্তীতে বিভিন্ন কলকারখানার কাঁচামাল ও জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারযোগ্য করে তোলা হবে। এই প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত পরিমাণ তৈলাক্ত বর্জ্য পরিশোধন করে প্রায় ৮৫% পানি, ১২% ব্যবহারযোগ্য জ্বালানি ও ৩% ছাই উৎপাদিত হবে। এই সকল জ্বালানী সাশ্রয়ী মূল্যে দেশের বিভিন্ন কলকারখানায় ব্যবহারযোগ্য বিধায় উৎপাদন খরচ হ্রাসে বিশেষ ভূমিকা পালন করবে এ প্রকল্পের মাধ্যমে। যার ফলে জাহাজ থেকে উৎপাদিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য মোংলা বন্দর আন্তর্জাতিক মান পূরণ করা নিশ্চিত হবে। সমুদ্রে তেল, আবর্জনা এবং অন্যান্য ক্ষতিকারক বর্জ্য অবৈধভাবে নিষ্কাশন রোধ করা, মৎস্য, জলজ প্রাণীর আবাসস্থল এবং উপকূলীয় বাস্ততন্ত্রকে দূষণ থেকে রক্ষা করা, একটি সবুজ এবং পরিবেশবান্ধব বন্দর হিসেবে মোংলা বন্দরের ভাবমূর্তি উন্নত করা, জাহাজ থেকে উৎপাদিত বর্জ্য সংগ্রহ এবং শোধন ফি সংগ্রহের মাধ্যমে বন্দরের জন্য আয়ের একটি নতুন উৎস প্রদান প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা হলো। এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রতিশ্র“তিকে সমর্থন করা সম্ভব হলো। বিশেষ করে পরিবেশ সংরক্ষণ ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্রের ভারসাম্য রক্ষা পাবে এ প্রকল্পে।
তিনি আরো বলেন, মোংলা সমুদ্র বন্দর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রাণপ্রবাহ এ বন্দরটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি বর্তমানে খাদ্যশস্য, সিমেন্ট ক্লিংকার, সার, মোটর গাড়ি, মেশিনারিজ, চাল, গম, কয়লা, তেল, পাথর, ভুট্টা, তেলবীজ, এলপিজি গ্যাস আমদানি এবং গার্মেন্টস পন্য, সাদামাছ, চিংড়ি, পাট ও পাটজাত দ্রব্য, হিমায়িত খাদ্য, কাকড়া, ক্লে, টাইলস, রেশমী কাপড় ও জেনারেল কার্গো রপ্তানির মাধ্যমে দেশের চলমান অর্থনীতিতে বিশেষ ভূমিকা রেখে আসছে মোংলা সমুদ্র বন্দর বলে জানান বন্দর চেয়ারম্যান।