খুলনা | শুক্রবার | ০৩ এপ্রিল ২০২৬ | ১৯ চৈত্র ১৪৩২

তেল সংকটে বন্ধ হতে বসছে সুন্দরবনের পর্যটক শিল্প : কোটি টাকার বুকিং বাতিল

মোংলা প্রতিনিধি |
০২:০০ এ.এম | ০৩ এপ্রিল ২০২৬


সারাদেশে চলমান ডিজেল সংকটের প্রভাব পড়েছে বিশ্ব ঐতিহ্য ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের পর্যটন শিল্প খাতে। মোংলাসহ সুন্দরবন উপকূলীয় এলাকায় প্রায় বন্ধ হয়ে পড়েছে পর্যটকবাহী নৌযান চলাচল। হতাশাকে সঙ্গী করে বেকার দিন কাটাচ্ছেন পর্যটকবাহী নৌযান শ্রমিকরা। ধস নেমেছে স্থানীয় হোটেল-মোটেলসহ ছোট-বড় ব্যবসা খাতেও। পূর্ব নির্ধারিত প্রায় কোট টাকার বুকিং বাতিল করে টাকা ফেরত দিতে বাধ্য হচ্ছেন ট্যুর ব্যবসায়ীরা। এই নজিরবিহীন তেল সংকটে মোংলা ও সুন্দরবন উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় ১০ হাজারেও বেশী নৌযান শ্রমিক ও কর্মচারী কর্মহীন হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। ফলে সুন্দরবনে পর্যটক কম আসায় একদিকে রাজস্ব হারাচ্ছে বন বিভাগ, অন্যদিকে সংশ্লি¬ষ্ট প্রশাসন বলছে, মোংলা বন্দর ও সুন্দরবনসহ দেশের তেল সংকট নিরসনে কাজ করছে সরকার।  
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সারা দেশে তীব্র জ্বালানি তেল (ডিজেল) সংকটের কালো ছায়ার প্রভাব পড়েছে বিশ্বখ্যাত ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের পর্যটন খাতে। জ্বালানির অভাবে বনের গহীনে পর্যটকবাহী নৌযান চলাচল প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। ফলে পূর্ব নিধারিত বুকিং (অগ্রিম নেয়ার টাকা)’র কোটি টাকা পর্যটকদের ফেরত দিতে বাধ্য হচ্ছেন ট্যুর ব্যবসায়ীরা। 
প্রতি বছরের ন্যায় বর্তমান সুন্দরবনে এখন চলছে পর্যটক মৌসুম। সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের আওতায় থাকা করমজল, হারবাড়িয়া, কটকা, কচিখালী, দুবলা, আলোর কোল, নীল কমল এবং আন্দার মানিকের মতো জনপ্রিয় পর্যটন স্পটগুলো এখন পর্যটকশূন্য হওয়ার পথে। প্রতি বছর এই মৌসুমে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের পদচারণায় মুখর থাকার কথা থাকলেও, জ¦ালানী তেলের অভাবে সেখানে পর্যটন স্পটগুলোতে রয়েছে সুনসান নীরবতা। পূর্ব সুন্দরবনের অন্তত ৮-১০টি প্রধান স্পটে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি সংগ্রহ করতে না পারায় সেখানে পর্যটন স্পটগুলোতে রয়েছে সুনসান নীরবতা।
খুলনা ও ঢাকা ছাড়াও শুধু মোংলাতেই প্রায় শতাধিক পর্যটকবাহী বড় লঞ্চ ও আধুনিক ট্যুর জাহাজ রয়েছে। সুন্দরবনের গহীনে ৩-৪ দিনের ভ্রমণের জন্য পর্যটকরা অনেক আগে থেকেই অগ্রিম বুকিং দিয়ে রেখেছিলেন। কিন্তু বর্তমান তেল সংকটের কারণে ট্যুর অপারেটররা তাদের নির্ধারিত ট্রিপগুলো পরিচালনা করতে পারছেন না। ফলে গত কয়েক দিনে পর্যটকদের অগ্রিম নেওয়া প্রায় কোটি টাকা ফেরত দিতে হয়েছে ব্যবসায়ীদের। এতে ট্যুরিস্টদের পরিকল্পনা যেমন বিফল হয়েছে, তেমনি বড় ধরনের আর্থিক লোকসানের মুখে পড়েছেন বিনিয়োগকারীরা।
পর্যটন শিল্পের সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত মোংলার প্রায় ৪ থেকে ৫ হাজার নৌযান মালিক এবং অন্তত ১০ হাজার কর্মচারী বর্তমানে দিশেহারা। দীর্ঘ সময় জাহাজ বা লঞ্চ অলস পড়ে থাকায় কর্মচারীদের বেতন ও খোরাকি দিতে হিমশিম খাচ্ছেন মালিকপক্ষ। দিনের পর দিন বেকার বসে থাকায় পরিবার-পরিজন নিয়ে অমানবিক কষ্টে দিন কাটছে শ্রমিকদের। অনেকের চুলায় হাঁড়ি চড়াও দায় হয়ে পড়েছে বলে জানা গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন নৌযান চালক জানান, স্থানীয় বাজার থেকে চড়া দামে সামান্য কিছু ডিজেল সংগ্রহ করা গেলেও তা দিয়ে বনের দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া অসম্ভব। পর্যটক বোঝাই করার পর মাঝপথে যদি ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে গহীন বনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সাহায্য পাওয়া দুঃসাধ্য হবে। এই জীবনের ঝুঁকি ও যান্ত্রিক গোলযোগের ভয়েই তারা পর্যটক পরিবহনে সাহস পাচ্ছেন না।
সুন্দরবনের পর্যটন থেকে প্রতি বছর সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় করে। পর্যটক কমে যাওয়ায় প্রতিদিন বন বিভাগের আয় যেমন কমছে, তেমনি পর্যটন সংশ্লি¬ষ্ট হোটেল, মোটেল সহ সেখানে পর্যটন স্পটগুলোতে রয়েছে সুনসান নীরবতা, যাতে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন। মোংলা অঞ্চলের এই সংকট এখন কেবল ব্যবসায়িক ক্ষতি নয়, বরং একটি মানবিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ে রূপ নিচ্ছে। তবে পর্যটন সংশি¬ষ্টরা বলছেন, দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে ভরা মৌসুমে পর্যটন ব্যবসা পুরোপুরি লোকসানের মুখে পড়তে হবে ট্যুর ব্যবসায়ীদের। দ্রুত এই সংকট সমাধান না হলে সুন্দরবন কেন্দ্রিক এই বিশাল অর্থনৈতিক খাতটি বড় ধরনের ধসের সম্মুখীন হবে।
সুন্দরবন করমজল বন্যপ্রানী প্রজনন কেন্দ্র ও পর্যটক স্পট’র ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হাওলাদার আজাদ কবির বলেন, পর্যটক না আসায় প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে বন বিভাগ। করমজল-হারবাড়িয়া বা কটকা-কচিখালীর মতো স্পটগুলো এখন পর্যটকহীন। সরকারের রাজস্ব ঠিক রাখতে আর পর্যটক শিল্পের সাথে সংশ্লিষ্টদের বাঁচিয়ে রাখতে দ্রুত পদক্ষের নেয়ার দাবি বন বিভাগসহ এলাকাবাসীর। 
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শারমিন আক্তার সুমী জানান, তেল সংকট নিরসনে সরকারের সংশ্লিষ্ট উচ্চপর্যায়ে কার্যক্রম চলমান রয়েছে। সরকার এই সমস্যা সমাধানে নিরলসভাবে কাজ করছে এবং দ্রুতই জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।  
তেল সরবরাহ কেন্দ্রে অনিয়ম ও কৃত্রিম সংকটে অভিযানে ইতোমধ্যে মোংলা অয়েল ইনস্টলেশন কেন্দ্র থেকে তেল জব্দ সহ ব্যবস্থাপককে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। সুন্দরবনের এই বিশাল পর্যটন শিল্পকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করার দাবি মোংলার সর্বস্তরের মানুষের। 

প্রিন্ট

আরও সংবাদ