খুলনা | শনিবার | ০৪ এপ্রিল ২০২৬ | ২০ চৈত্র ১৪৩২

বাঁধা কাটিয়ে জীবন সংগ্রামে সাফল্য অর্জনকারী দেবহাটার ৫ নারী

দেবহাটা প্রতিনিধি |
১১:৩৯ পি.এম | ০৩ এপ্রিল ২০২৬


সমাজ ও পরিবারের নানা বাঁধা কাটিয়ে জীবন সংগ্রামে সাফল্য অর্জন করেছেন সাতক্ষীরা জেলার দেবহাটা উপজেলার ৫ নারী। নানা বাঁধা বিপত্তিকে পায়ে মাড়িয়ে তৃণমূল থেকে উঠে আসা এসব নারীদের খুঁজে বের করে ৫টি ক্যাটাগরীতে সম্মাননা দিয়েছে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর। এ সকল নারীদের প্রত্যেকের জীবনে রয়েছে অসীম আত্মশক্তি ও সংগ্রামের আলাদা আলাদা জীবন কাহিনী। তাদের সেই সংগ্রামী জীবনের কিছু তথ্য তুলে ধরা হলো।
সমাজ উন্নয়নে অসামান্য অবদান রেখেছেন মাঝ পারুলিয়ার জগবন্ধু দাশের স্ত্রী উত্তরা দাশ। তিনি জানান, নি¤œবিত্ত পরিবারের গৃহিণী হওয়া সত্তে¡ও সমাজ সেবামূলক বিভিন্ন কর্মকান্ডে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছি। আমি নিজের উদ্যোগে আমার এলাকায় কয়েকটি বাল্যবিবাহ বন্ধ করেছি, শিশু শ্রম ও ইভটিজিং প্রতিরোধেও ভূমিকা রাখছি। সমাজের পিছিয়ে পড়া শ্রেণি বিশেষ করে দলিত স¤প্রদায়ের মানুষের কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছি। এছাড়া বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করে দরিদ্র অসহায় মানুষদের বিভিন্ন ভাতা ও শিক্ষাবৃত্তি প্রাপ্তিতে সহযোগিতা করে থাকি। অনগ্রসর জনগোষ্ঠির মানুষদের আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিশুদের স্কুলগামী করার লক্ষে অভিভাবকদের উৎসাহিত করা, এলাকায় কিশোরীদের বয়ঃসন্ধিকালিন স্বাস্থ্যসেবা পরিচর্যার প্রাকৃতিক সময়ে করণীয়, মায়ের গর্ভকালীন পরিচর্যা, শিশুর পুষ্টি নিশ্চিতকরণ ও বিভিন্ন সামাজিক কর্মকান্ডে নারীর অংশগ্রহণ ত্বরান্বিত করার লক্ষে উঠান বৈঠকের মাধ্যমে জনসাধারণের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখছি। 
শিক্ষা ও চাকুরী ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী মাঘরী গ্রামের এনতাজ আলীর মেয়ে হেলেনা পারভীন। তিনি জানান, আমরা মোট ছয় বোন। আমি সবার ছোট। আমার বাড়িতে দুইটা বোন স্বামী পরিত্যাক্তা। মা-বাবা দু’ জনেই কৃষিকাজে নিয়োজিত ছিলো। আমার অন্যান্য বোনেরা কেউই লেখাপড়া শেখেনি। আমার ছোটবেলা থেকেই লেখপড়ার প্রতি অগাধ আগ্রহ ছিলো। কারণ অন্যান্য বোনদের ছোটবেলায় বিয়ে হয়েছিল এবং তাদের সংসারে সারাক্ষণ অশান্তি লেগেই থাকতো। এসবের কারণে আমি ছোটবেলা থেকে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ ছিলাম যে লেখাপড়া শিখে একটা চাকরি করবো এবং নিজের পায়ে দাঁড়ানোর পাশাপাশি পরিবারের অভাব অনটন দূর করবো। এভাবে অনেক কষ্ট করে এসএসসি পাশ করার পরপরই আমার পিতা স্ট্রোকে আক্রান্ত হন। এমতাবস্থায় আমার পড়াশুনা প্রায় বন্ধের উপক্রম হয়। তখনই আমি আমার এক প্রাইমারী স্কুল শিক্ষকের সহায়তায় একটি স্কুলে প্যারা শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হলাম এবং নিজের পড়াশুনার পাশাপাশি পিতার চিকিৎসা ও পরিবারের আর্থিক উন্নয়নের জন্য টিউশনি শুরু করেছিলাম। এভাবে একের পর এক জীবনে নানা অভাব অনটন লাগতেই থাকলো। এক পর্যায়ে পরিবারের থেকে পড়াশুনা বন্ধ করে বিয়ে দেওয়ার জন্য চাপ দিতে থাকলো। তবুও আমি আমার জীবন সংগ্রামে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ থেকে পরিবারের বিরুদ্ধে লড়াই করে সাতক্ষীরা সরকারি কলেজে দর্শন সাবজেক্ট নিয়ে অনার্স ভর্তি হলাম। টিউশনির টাকা দিয়ে নিজের পড়াশুনা ও পিতার চিকিৎসা খরচ চালানোর পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি চাকুরীর জন্য আবেদন করতে থাকলাম। বিভিন্ন সরকারি চাকুরীতে রিটেন ভাইভা ফেস করেও কোথাও কোন চাকরি পেলাম না। নানা হতাশায় নিজেকে অনার্স পাশ করার পর পার্ট টাইম জবের পাশাপাশি টিউশনি গুলো চলমান রেখে জীবন সংগ্রামে পিছিয়ে না পড়ে অবশেষে সখিপুর ইউনিয়ন পরিষদের ৯নম্বর ওয়ার্ডের সামান্য একজন গ্রাম পুলিশে ২০২৩ সালের জানুয়ারি মাসে নিযুক্ত হলাম। এরই মধ্যে আমার ৭০ বছর বয়সী মাও শারিরীকভাবে অসুস্থ্য হয়ে পড়ল। এখন আমি সোনালী ব্যাংক দেবহাটা শাখা হতে কিছু ঋণ ও বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে দুই রুমের ৪ শতক জায়গার উপর একটি ঘর করেছি এবং বাবা মায়ের চিকিৎসার পাশাপাশি পুরো পরিবারের খরচ আমার নিজেরই বহন করতে হচ্ছে। মা বাবা ছাড়াও আমার পরিবারে একটা স্বামী পরিত্যাক্ত বোন ও ১১ বছর বয়সী একটি ৪র্থ শ্রেণিতে পড়া ভাগ্নেসহ ৫ সদস্য বিশিষ্ট পরিবার নিয়ে আল­াহর অশেষ মেহেরবানীতে পূর্বের তুলনায় আলহামদুলিল­াহ ভালো আছি।
সফল জননী চন্দনা রানী রায় বহেরা গ্রামের তপন কুমার মলি­কের স্ত্রী। চন্দনা রানী রায় ছিলেন সমাজ সচেতন , শিক্ষানুরাগী এবং আত্মপ্রত্যায়ী। অল্প শিক্ষিত হয়েও ছোট বেলা থেকেই শিক্ষার প্রতি ছিল অদম্য অনুরাগী। হার মানেনি সে দারিদ্র সংকুলতার কাছে। তার ছিল একটি মেয়ে। স্বামীর অভাবের সংসারে বিভিন্ন নির্যাতন সহ্য করতে হতো। তবু সে থেমে থাকেনি গৃহে হাঁস-মুরগী পালন করে মেয়েকে স্বল্প আয়ের মাধ্যমে বই খাতা কলম ও পড়া লেখার খরচ যোগাতেন। চন্দনার মেয়েটি ছিল মেধাবী ও পরিশ্রমী। সে একের পর এক  ৫ম, ৮ম এবং এসএসসি পরীক্ষায় মেধা তালিকায় স্থান করে নেয়। বর্তমানে সে স্কুল ও কলেজের গন্ডি পেরিয়ে খুলনা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত। 
নির্যাতনের দুঃস্বপ্ন মুছে জীবন সংগ্রামে জয়ী নারী হামিদা খাতুন সেকেন্দ্রা গ্রামের তাজিম উদ্দীন গাজীর মেয়ে। বাল্যকাল থেকেই হামিদা স্পষ্টবাদী স্বভাবের। ২০০৭ সালে তাঁর বিয়ে হয়। শশুরবাড়ীতে স্বামী ও শশুরবাড়ীর লোকদের বিভিন্ন অন্যায় আচরণের প্রতিবাদ করায় তার উপর নেমে আসে অত্যাচারের স্টীমরোলার। কিন্তু তার স্পষ্টবাদী স্বভাবের কারনে তিনি তাদের অন্যায়ের প্রতিবাদ করা তাদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়, উক্ত বিরোধের জেরে স্বামীর সাথে বিচ্ছেদ হয়ে যায়। পুনরায় পিত্রালয়ে ফিরে এসে তাঁর নতুন জীবন শুরু হয়। সমাজের বিভিন্ন জনের বিভিন্ন কটুক্তিকে অগ্রাহ্য করে তিনি নতুন উদ্যোমে যাত্রা শুরু করেন। ইতিমধ্যে তিনি পল­ী দারিদ্র বিমোচন ফাউন্ডেশনে ফিল্ড অফিসার হিসেবে চাকুরী লাভ করেন এবং বর্তমানে সাতক্ষীরা সদর উপজেলায় কর্মরত আছেন। তিনি ৫ বোনের মধ্যে বড় হওয়ায় নিজেই সংসারের হাল ধরেন। তার পিতার কোন পুত্র সন্তান না থাকার দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তাঁদের শরীকের লোকজন কর্তৃক জবর-দখল করে রাখা তাঁর পিতার জমি জমা তিনি নিজের চেষ্টায় পুনরুদ্ধার করেন। ছোট বোনদের সুশিক্ষায় শিক্ষিত করেছেনে এবং তাদের উপযুক্ত পাত্রস্থ করেছেন। সংসারের অভিভাবক হিসেবে চাকুরী করা, জমি-জমা দেখাশুনা করা, বৃদ্ধ পিতা-মাতার দেখাশুনা করা এমনকি ছোট ভগ্নী-ভগ্নীপতিদের সুবিধা-অসুবিধাও তিনি দেখা-শুনা করেন। এছাড়া একজন সামাজিক মানুষ হিসেবে প্রতিবেশীদের সুবিধা-অসুবিধায়ও তিনি সমানভাবে এগিয়ে আসেন। তার কর্মকান্ড অনুকরণযোগ্য।
অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জনকারী নারী রোকেয়া খাতুন। তিনি পাারুলিয়ার গড়িয়াডাঙ্গা গ্রামের মোক্তার আলী গাজীর মেয়ে। তার স্বামীর অনিয়মিত দিনমজুরীর সামান্য আয় দিয়ে সংসার নির্বাহ দুর্বিসহ হয়ে পড়ে, তিনবেলা ঠিকমত খাওয়া হতো না, থাকার মত ঘর ছিল না, বাচ্চাদের পড়ালেখার খরচ যোগানো যেত না। নিরুপায় ও দিশাহারা হয়ে উপার্জনের প্রত্যয়ে বাড়ী থেকে বাহির হন। চলার পথে পরিচয় ঘটে বেসরকারি সংস্থা ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের রাইট টু গ্রো প্রজেক্টের সাথে। উক্ত প্রজেক্টের মাধ্যমে উদ্যোক্তা হিসাবে হাইজিন সামগ্রীর ব্যবসা শুরু করে উপার্জন শুরু করেন। পর্যায়ক্রমে অপর একটি এনজিও’এর সাথে পরিচয় হয় এবং উক্ত এনজিওতে একটি খন্ডকালীন চাকুরী নেন। ব্যবসার পাশাপাশি এনজিওতে একটি খন্ডকালীন চাকুরী করে মাসিক ৮ থেকে ১০ টাকা আয় শুরু হয়। পাশাপাশি বাড়ীতে হাঁস, মুরগী, ছাগল, গরু লালন-পালন করেও বেশ অর্থ উপার্জন হতে থাকে। স্বামীর দিনমজুরীর আয় ও নিজের আয় মিলিয়ে সংসারের অভাবকে বিদায় হয়। বর্তমানে পাকা ঘর নির্মাণ, বাচ্চাদের ভালো স্কুলে পড়াশুনা করাচ্ছেন তিনি। ব্যাংকে হিসাব খুলে অর্থ সঞ্চয় করছেন। নিজের প্রচেষ্টায় অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জনকারী নারী হিসাবে তিনি এলাকায় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। 

প্রিন্ট

আরও সংবাদ