খুলনা | রবিবার | ০৫ এপ্রিল ২০২৬ | ২২ চৈত্র ১৪৩২

খুলনা বিভাগে বেড়েছে হামের প্রাদুর্ভাব, সবচেয়ে  ঝুঁকিতে কুষ্টিয়া, ঝরে গেল দুই শিশুর প্রাণ 

নিজস্ব প্রতিবেদক |
০১:২২ এ.এম | ০৫ এপ্রিল ২০২৬


খুলনা বিভাগে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে হামের প্রাদুর্ভাব। এর মধ্যে কুষ্টিয়া, যশোর ও খুলনা হটস্পটে পরিণত হয়েছে। এখন পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে দুইজনের। যার মধ্যে ২ জনই কুষ্টিয়ার। শনিবার (বিকেল পর্যন্ত বিভাগের হাসপাতালগুলোতে ভর্তি রোগীর সংখ্যা তিনশ’ ছুঁই ছুঁই। আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন চিকিৎসকরা।   
শনিবার কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দুই শিশুর মৃত্যু হয়। একই দিনে বিভাগের ১০ জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে নতুন করে হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছে আরও ৫৬ শিশু। সব মিলিয়ে বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে ২৯৯ শিশু, যা নিয়ে উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে। 
খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের দপ্তর থেকে পাওয়া তথ্যমতে, প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়া থেকে শনিবার (৪ এপ্রিল) বিকেল পর্যন্ত বিভাগের ১০ জেলায় ২৯৯ শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা কুষ্টিয়া জেলার। কুষ্টিয়ায় হামের উপসর্গ নিয়ে সর্বোচ্চ ১০৩ শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে আর মারা গেছে দুইজন।  এছাড়া খুলনায় ৫৮ শিশু, যশোরে ৫৯, বাগেরহাটে ৬, চুয়াডাঙ্গায় ৬, ঝিনাইদহে ১৮, মাগুরায় ১৭, মেহেরপুরে ৪, নড়াইলে ১২ এবং সাতক্ষীরায় ১৬ জন চিকিৎসাধীন রয়েছে।  
এদিকে, শনিবার হামের উপসর্গ নিয়ে নতুন করে বিভাগের হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হয়েছে ৫৬ শিশু। এর মধ্যে সাতক্ষীরায় ১৩, কুষ্টিয়ায় ১২, খুলনায় ৬, যশোরে ৫, বাগেরহাটে ২, চুয়াডাঙ্গায় ৩, ঝিনাইদহে ৩, মাগুরায় ৫, মেহেরপুরে ২ ও নড়াইলে ৫ নতুন করে ভর্তি হয়েছে।
এদিকে নতুন করে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে সাতক্ষীরায়। মাত্র দুইদিন আগেও রোগী শূন্য থাকা এই জেলায় এখন হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছে ১৬ শিশু, যার মধ্যে ১৩ জনই শনিবার ভর্তি হয়েছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে কুষ্টিয়া জেলা। সেখানে মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও জেলা হাসপাতাল মিলিয়ে শনিবার নতুন করে ভর্তি হয়েছে ১২ শিশু। আগে থেকে ভর্তি থাকা ৯১ জনসহ বর্তমানে জেলায় মোট ১০৩ শিশু চিকিৎসাধীন।
কুষ্টিয়ার পরেই ঝুঁকিতে রয়েছে যশোর জেলা। সেখানে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি আছে ৫৯ শিশু, যার মধ্যে নতুন ভর্তি হয়েছে ৫ জন। খুলনাতেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক, এখানে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে ৫৮ শিশু।
কুষ্টিয়া : ১৮ ঘণ্টার ব্যবধানে কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে শুক্রবার (৩ এপ্রিল) রাত সাড়ে ৯টার দিকে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে আট মাস বয়সী ইব্রাহিম নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়। একই দিন দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে আইজা নামের পাঁচ মাস ২০ দিন বয়সী আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়। এ নিয়ে জেলায় চার শিশুর হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হলো।
ইব্রাহিম কুষ্টিয়া দৌলতপুর উপজেলার চঞ্চল হোসেনের ছেলে। সে শুক্রবার বিকেলে হাম উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছিল। এ ছাড়া, আইজা কুষ্টিয়া শহরের রেনউইক এলাকার মমিনুর রহমানের মেয়ে। সে গত চার দিন ধরে চিকিৎসাধীন ছিল।
কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) হোসেন ইমাম বলেন, শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৩টায় কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হয় ইব্রাহিম নামের শিশুটি। সে হাম ও নিউমোনিয়া রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়।
কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক ডাঃ এ এইচ এম আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, গত ৩০ মার্চ সোমবার আইজা নামের শিশুটি হাম ও নিউমোনিয়া রোগে আক্রান্ত হয়ে কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়। 
এর আগে, শুক্রবার ভোর সাড়ে ৫টায় হামে আক্রান্ত হয়ে কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আফরান নামে আট মাস বয়সী এক শিশু মারা যায়। 
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, হামের উপসর্গ হিসেবে শিশুদের প্রথমে জ্বর, সর্দি-কাশি দেখা দেয়, পরে শরীরে র্যাশ ওঠে। জটিলতা হিসেবে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া ও চোখে সংক্রমণও দেখা দিচ্ছে। আক্রান্তদের বেশির ভাগই এক বছরের কম বয়সি শিশু।
হামের এই প্রাদুর্ভাব মোকাবেলায় সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা। একই সঙ্গে হাসপাতালগুলোর প্রস্তুতি বাড়ানোর নির্দেশনা দিয়েছে স্বাস্থ্য প্রশাসন।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান সৈয়েদা রুখশানা পারভীন বলেন, হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি ভাইরাসজনিত রোগ। একজন আক্রান্ত শিশু হাঁচি-কাশির মাধ্যমে সহজেই অন্যদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে যেসব শিশু নিয়মিত টিকা পায়নি বা অপুষ্টিতে ভুগছে, তাদের ঝুঁকি বেশি।
তিনি বলেন, খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ অন্যান্য হাসপাতালে হামসহ সংক্রামক রোগে আক্রান্তদের ভর্তি করা হয় না। কিন্তু এই রোগের গুরুত্ব বিবেচনায় ও খুলনায় যে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালটি রয়েছে তার সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে আমাদের এখানে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় একটি আইসোলেশন সেন্টার তৈরি করে শিশুদের রাখা হয়েছে।
এই মুহূর্তে সরকারের ব্যাপকভাবে একটি ভ্যাক্সিনেশন ব্যবস্থা চালু করা দরকার উলে­খ করে তিনি আরও বলেন, খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পক্ষে এই মুহূর্তে ব্যাপকহারে হামের শিশু ভর্তি করে চিকিৎসা দেওয়া কঠিন কাজ। কারণ এমনিতে এই হাসপাতালে ৪৮ বেডের বিপরীতে ২ শতাধিক শিশু বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিসাধীন রয়েছে।
খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক ডাঃ মুজিবুর রহমান বলেন, প্রতিদিনই নতুন করে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় সব জেলা ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আলাদা আইসোলেশন ওয়ার্ড চালুর নির্দেশনা দেয়া হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি জোরদার করা হয়েছে।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ