খুলনা | বুধবার | ১৫ এপ্রিল ২০২৬ | ২ বৈশাখ ১৪৩৩

এমপিদের ব্যাংক ঋণ ১১ হাজার কোটি টাকা : অর্থমন্ত্রী

শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের তালিকা প্রকাশ সংসদে, ১০টিই এস আলমের

খবর প্রতিবেদন |
০৪:৫৭ পি.এম | ০৬ এপ্রিল ২০২৬


২০২৫ সালের শেষ নাগাদ দেশে খেলাপি ঋণের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। জাতীয় সংসদে দেশের শীর্ষ ২০টি ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের তালিকা প্রকাশ করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এর মধ্যে ১০টি প্রতিষ্ঠানের মালিক বিতর্কিত ব্যবসায়ী এস আলম। 
সোমবার সংসদে শীর্ষ ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের নাম জানালেও ঋণের পরিমাণ জানানো হয়নি। শীর্ষ খেলাপিদের তালিকায় তিনটি রয়েছে সিকদার গ্র“পের এবং দু’টি সালমান এফ রহমানের বেক্সিমকো শিল্প গোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠান। বিএনপি’র সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এম মোরশেদ খানের মালিকানাধীন সিটিসেলের নামও উঠে এসেছে শীর্ষ খেলাপির তালিকায়।
জাতীয় সংসদে শীর্ষ ২০ ঋণ খেলাপির নাম ও তাদের ঋণের পরিমাণ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। অর্থমন্ত্রী সংসদে বলেন বতর্মান সংসদের এমপিদের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ঋণের পরিমাণ ১১ হাজার ১১৭ কোটি ৩১ লাখ টাকা। আদালতের নির্দেশনায় ৩ হাজার ৩৩০ কোটি ৮ লাখ টাকা খেলাপি হিসেবে দেখানো হয়নি।
এনসিপির হাসনাত আবদুল­াহর প্রশ্নে সোমবার সংসদে অর্থমন্ত্রী টেবিলে উত্থাপিত জবাবে এ তথ্য জানিয়েছেন। মন্ত্রী শীর্ষ ২০ জন ঋণখেলাপির তালিকাও সংসদে তুলে ধরেন। এর মধ্যে প্রথম চারটিসহ মোট পাঁচটি প্রতিষ্ঠান এস আলমের। ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে বৈঠকের শুরুতে প্রশ্নোত্তর টেবিলে উপস্থাপিত হয়।
হাসনাত আব্দুল­াহ তাঁর প্রশ্নে জানতে চান, দেশে এই মুহূর্তে প্রকৃত খেলাপি ব্যাংক ঋণের পরিমাণ কত, শীর্ষ ২০ খেলাপি কারা, খেলাপি ঋণ আদায়ে সরকার কী ব্যবস্থা নিয়েছে এবং সংসদ সদস্যদের ব্যাংক ঋণ ও খেলাপি ঋণের পরিমাণ কত।
অর্থমন্ত্রীর দেওয়া তথ্যমতে, গণ ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকিং খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে রেকর্ড ৫ লাখ ৪৪ হাজার ৮৩১ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। 
সংসদে প্রকাশিত শীর্ষ ২০ ঋণ খেলাপি প্রতিষ্ঠান হলো : শীর্ষ ঋণখেলাপির প্রথম ১০টির মধ্যে ৯টি এবং ১৭ নম্বর প্রতিষ্ঠানের মালিক বিতর্কিত ব্যবসায়ী এস আলম গ্র“প। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো এস আলম সুপার এডিবল অয়েল লিমিটেড, এস আলম ভেজিট্যাবল অয়েল লিমিটেড, এস আলম রিফাইন্ড সুগার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, এস আলম কোল্ড রোলড স্টিলস লিমিটেড, সোনালী ট্রেডার্স, গ্লোবাল ট্রেডিং করপোরেশন লিমিটেড, চেমন ইস্পাত লিমিটেড, এস আলম ট্রেডিং কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড, ইনফিনিট সিআর স্ট্রিপস ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড ও মুরাদ এন্টারপ্রাইজ।
বাকি ১০টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের মালিকানাধীন দু’টি এবং সিকদার গ্র“পের মালিকানাধীন তিন প্রতিষ্ঠান রয়েছে তালিকায়। বেক্সিমকোর দুই প্রতিষ্ঠান হলো তালিকার ৬ নম্বরে থাকা বাংলাদেশ এক্সপোর্ট ইমপোর্ট কোম্পানি এবং ১৯ নম্বরে থাকা বেক্সিমকো কমিউনিকেশন্স। 
সিকদার গ্র“পের মালিকানাধীন পাওয়ার প্যাক মুতিয়ারা কেরাণীগঞ্জ পাওয়ার প্ল্যান্ট লিমিটেড রয়েছে ১৩ নম্বরে, ১৪ নম্বরে থাকা পাওয়ার প্যাক মুতিয়ারা জামালপুর পাওয়ার প্ল্যান্ট লিমিটেড এবং ১৮ নম্বরে থাকা সিএলসি পাওয়ার কোম্পানিও এই গ্র“পের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান। তালিকার ১১ নম্বরে রয়েছে কেয়া কসমেটিকস লিমিটেড, দেশবন্ধু সুগার মিলস রয়েছে ১২ নম্বরে।
বিএনপি’র সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এম মোরশেদ খানের মালিকানাধীন দেশের প্রথম মোবাইল ফোন অপারেটর প্যাসিফিক বাংলাদেশ টেলিকম লিমিটেড, যা সিটিসেল নামে পরিচিত রয়েছে তালিকার ১৫ নম্বরে। কর্ণফুলি গ্র“পের মালিকানাধীন কর্ণফুলি ফুডস প্রাইভেট লিমিটেড রয়েছে তালিকার ১৬ নম্বরে। রফিকুল ইসলামের মালিকানাধীন রংধনু বিল্ডার্স প্রাইভেট লিমিটেড রয়েছে তালিকার ২০ নম্বরে।
খেলাপী ঋণ আদায়ে সরকার নানাবিধ কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী।
পদক্ষেপগুলোর মধ্যে রয়েছে : ১। ১০% এর অধিক শ্রেণিকৃত ঋণ রয়েছে এমন ব্যাংকসমূহের সিনিয়র ম্যানেজমেন্ট টিমের সঙ্গে ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে আলোচনা এবং শ্রেণিকৃত ঋণ আদায়ে প্রতিবন্ধকতা খুঁজে বের করে তা সমাধানের জন্য ব্যাংক থেকে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ।
২। বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক আয়োজিত প্রতিটি ব্যাংকার্স সভায় ব্যাংক ভিত্তিক শীর্ষ ২০ ঋণ খেলাপী/শ্রেণিকৃত ঋণ আদায়ের অগ্রগতি যাচাই।
৩। বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক শ্রেণিকৃত ঋণের হার অধিক এরূপ ব্যাংকসমূহের জন্য শ্রেণিকৃত ঋণ রেজল্যুশন স্ট্র্যাটেজি সংক্রান্ত গাইডলাইন প্রণয়ন।
৪। ব্যাংক-কোম্পানি (সংশোধিত) আইনে সংজ্ঞায়িত ইচ্ছাকৃত খেলাপীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যে বিআরপিডি সার্কুলার নং-০৬; তারিখ : ১২ মার্চ ২০২৪ এর মাধ্যমে ইচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপী শনাক্তকরণ এবং তাদের বিরুদ্ধে গৃহীতব্য ব্যবস্থাদি সংক্রান্ত নীতিমালা জারি করা হয়েছে।
৫। বিআরপিডি সাকুলার নং-১৪/২০২৪ এর মাধ্যমে ব্যাংকের বিদ্যমান লিগ্যাল টিম/আইন বিভাগ শক্তিশালীকরণের জন্য ব্যাংকসমূহকে নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে।
৬। বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি অনুসরণের মাধ্যমে আগামী ৩০ জুন ২০২৬ তারিখের মধ্যে প্রত্যেক ব্যাংকের খেলাপী ঋণস্থিতির ন্যূনুম ১% নগদ আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করার জন্য বিআরপিডি সাকুলার নং-১১/২০২৪ এর মাধ্যমে ব্যাংকসমূহকে নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। 
৭। ক্রেডিট রিস্ক ম্যানেজমেন্ট গাইডলাইন হালনাগাদকরণ।
৮। IFRS ৯ অনুযায়ী Expected Credit Loss ভিত্তিক ঋণ শ্রেণিকরণ ও প্রভিশনিং নীতিমালা বাস্তবায়নের মাধ্যমে ব্যাংকের ঋণ ব্যবস্থাপনার সুশাসন নিশ্চিতকরণ এবং ঋণ ঝুঁকি প্রশমন; বাণিজ্যিক ব্যাংকসমূহের নিজস্ব মূল্যায়নের পাশাপাশি তালিকাভুক্ত জামানত মূল্যায়নকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ঋণের বিপরীতে প্রদত্ত জামানত মূল্যায়ন করার জন্য উক্ত প্রতিষ্ঠানসমূহকে তালিকাভুক্তিকরণ।
অর্থমন্ত্রী জানান, এসব ছাড়াও খেলাপী ঋণ সমস্যা সমাধানে নিম্নোক্ত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে : 
১। বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক খেলাপী ঋণ সমস্যা সমাধানে এণদসংশ্লিষ্ট বিদ্যমান আইনসমূহ (ব্যাংক কোম্পানি আইন, Negotiable Instrument Act, অর্থ ঋণ আদালত আইন, Bankruptcz Act  সংশোধনের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। 
২। স্বল্প মেয়াদী কৃষি ঋণের পুনঃতফসিলিকরণ নীতিমালা পর্যালোচনা পূর্বক হালনাগাদকরণ। 
৩। খেলাপী ও ইচ্ছাকৃত খেলাপী ঋণগ্রহীতাদের তালিকা প্রকাশের উদ্যোগ গ্রহণ। 
৪। দেশে উন্নত ঋণ সংস্কৃতি গড়ে তোলার লক্ষ্যে যারা নিয়মিত ঋণ পরিশোধ করেন অর্থাৎ ভালো ঋণগ্রহীতাদেরকে চিহ্নিতকরত তাদেরকে প্রণোদনা প্রদান সংক্রান্ত বিদ্যমান নীতিমালা পর্যালোচনা পূর্বক হালনাগাদ করা। 
৫। একজন ঋণ গ্রহীতা কর্তৃক সমগ্র ব্যাংকিং খাত হতে ঋণ গ্রহণের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ। 
৬। ইচ্ছাকৃত খেলাপী ঋণ গ্রহীতাদের জন্য গৃহীতব্য ব্যবস্থাসমূহের কিছু কিছু খেলাপী ঋণ গ্রহীতাদের জন্যেও আরোপের বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনী সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ। 
৭। অর্থ ঋণ আদালতের বিচারক প্যানেল/জুরি বোর্ডে অভিজ্ঞ ব্যাংকার অন্তর্ভুক্তকরণ।  
৮। খেলাপী ঋণ গ্রহীতারা যাতে রিট করে ঋণ আদায় কার্যক্রম স্থবির করতে না পারে সে লক্ষ্যে এটর্নি জেনারেল মহোদয়ের সঙ্গে আলাপপ‚র্বক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ। 
৯। বেসরকারি খাতে Asset Management Companz (AMC) প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করা।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ