খুলনা | মঙ্গলবার | ০৭ এপ্রিল ২০২৬ | ২৪ চৈত্র ১৪৩২

হরমুজের টোলে কপাল ফিরতে পারে ইরানের, মাসে আয় ৪.৫ বিলিয়ন ডলার

খবর প্রতিবেদন |
০৩:১৪ পি.এম | ০৭ এপ্রিল ২০২৬

 

ইরানি গণমাধ্যম গতকাল সোমবার জানিয়েছে, তেহরান যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তাবিত শান্তি পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের অবস্থান হলো—গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই যুদ্ধের সমাপ্তি হতে হবে স্থায়ীভাবে, সাময়িকভাবে নয়। একই সঙ্গে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্রমবর্ধমান হতাশ প্রচেষ্টার বিরুদ্ধেও কঠোর অবস্থান নেয় ইরান। এর মধ্যে ছিল তাঁর বিতর্কিত ‘পাগল হারামির দল’ মন্তব্যও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে তিনি এই মন্তব্য করেছিলেন।

ওয়াশিংটন চেয়েছিল হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে। তারা প্রথমে গায়ের জোরে সেটা খোলার হুমকি দিলেও কূটনৈতিক পথও খোলা রেখেছিল। তবে ইরানের ওপর আরোপিত মার্কিন–ইসরায়েলি যুদ্ধের আলোকে ইরান বরাবরই নিজেদের স্বার্থ রক্ষার অবস্থান থেকে এই জলপথ খোলার ব্যাপারে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠার পথে হেঁটেছে। এই সামুদ্রিক পথ দিয়ে বৈশ্বিক জ্বালানির ২০ শতাংশ পরিবাহিত হয় এবং বর্তমানে এর নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে।

যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তাবিত ১৫ দফার পরিবর্তে, তেহরান ওয়াশিংটনকে ১০ দফার একটি নতুন প্রস্তাব দেয়। এতে হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের অধিকার আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি অন্তর্ভুক্ত ছিল। অন্য দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পারমাণবিক কর্মসূচি পরিচালনার অধিকার স্বীকার করা, সব অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, লেবাননে ইসরায়েলের হামলা বন্ধ এবং যুদ্ধকালীন ক্ষতিপূরণ প্রদান।

তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবি—হরমুজ প্রণালির ওপর অধিকার। ইরান কেন এই স্বীকৃতি চায়? কারণ, এর পেছনে রয়েছে সরল অর্থনৈতিক যুক্তি। হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ‘চোকপয়েন্ট’। যুদ্ধের আগে প্রতিদিন ১০০ থেকে ১৩৫টি জাহাজ এই পথে যাতায়াত করত। এতে ২ থেকে ২ কোটি ৫০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পরিবাহিত হতো। এর বেশিরভাগই যেত ভারত, চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং অন্যান্য এশীয় দেশে।

এই প্রণালির সবচেয়ে সরু অংশের প্রস্থ মাত্র ৩৩ কিলোমিটার। এর ভৌগোলিক নিয়ন্ত্রণ রয়েছে দুই দেশের হাতে—ইরান ও ওমান। সংঘাত শুরু হওয়ার পরপরই ইরান স্পষ্ট করে দেয়—কোনো জাহাজকে এই পথ দিয়ে যেতে দেওয়া হবে না। এরপর ট্যাংকার ও বাণিজ্যিক জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মাধ্যমে সেই হুমকি কার্যকর করা হয়। এই হামলার ফলে বিমা ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যায়, এবং জাহাজ চলাচল প্রায় থমকে দাঁড়ায়।

পরে গোপন আলোচনার পর সীমিত সংখ্যক জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়। এর বিনিময়ে দিতে হয়েছে ‘টোল’—প্রতি জাহাজে প্রায় ২০ লাখ মার্কিন ডলার, যা পরিশোধ করা হয়েছে চীনা ইউয়ানে। এই প্রণালির ওপর কর্তৃত্ব আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পেলে ইরানের জন্য তা হবে বিশাল আর্থিক লাভের উৎস। রক্ষণশীল হিসাবেও প্রতি জাহাজ থেকে ১০ থেকে ১৫ লাখ ডলার আয় ধরে নিলে, শুধু অপরিশোধিত তেলবাহী ট্যাংকার থেকেই মাসে প্রায় ৪৫০ কোটি ডলার আয় হতে পারে।

বর্তমানে কার্যত অবরোধ ও সংঘাত—বিশেষ করে ইরান ও উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর হামলা—বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম বাড়িয়ে ১১০ ডলারের ওপরে নিয়ে গেছে। ২৮ ফেব্রুয়ারির পর থেকে যা ৩৮ শতাংশ বৃদ্ধি। যুক্তরাষ্ট্রে গড়ে জ্বালানির দাম গ্যালন প্রতি ৪ ডলার ছাড়িয়েছে, যা ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার চাপ বাড়িয়েছে। বিশ্বজুড়েই জ্বালানির দাম বেড়েছে।

যুদ্ধ পরবর্তী পরিস্থিতিতে—সরবরাহ স্থিতিশীল হতে সময় লাগলেও—দাম কমার সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু হরমুজে ইরানের কর্তৃত্ব স্বীকৃতি পেলে উল্টো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। সম্ভাব্য টোল খরচ আমদানির পর্যায়ে যুক্ত হবে, ফলে বাড়বে পরিবহন ও বিমা ব্যয়। এর প্রভাব পড়বে জ্বালানির দামে। তবে কতটা বাড়বে, তা অনিশ্চিত—বিশেষ করে যদি ভারত কোনো ছাড় বা বিকল্প ব্যবস্থা নিতে পারে।

মার্চের শুরুতে আর্থিক প্রতিষ্ঠান গোল্ডম্যান স্যাচ অনুমান করেছিল, সরবরাহ ব্যাহত হলে প্রতি ব্যারেলে ৪ থেকে ১৫ ডলার পর্যন্ত বাড়তি ঝুঁকি প্রিমিয়াম যুক্ত হতে পারে। অন্যদিকে অক্সফোর্ড ইকোনমিকস বলছে, এই প্রিমিয়াম ২৫ ডলার পর্যন্ত হতে পারে।

একই ধরনের টোল গ্যাসবাহী জাহাজের ওপরও আরোপ করা হতে পারে। এতে ইরানের মাসিক আয় হতে পারে প্রায় ৮০ কোটি ডলার। এই পুরো ব্যবস্থাকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হিসেবে দেখা হয় না। কারণ, এতে এশিয়ার অর্থনীতিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং সেই অর্থ দিয়েই ইরান আবার সামরিক শক্তি পুনর্গঠন করতে পারবে। ইরানের ভেতরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই অর্থ ব্যবহার করা হবে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনর্নির্মাণে এবং ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন মজুত বাড়াতে।

হরমুজের ওপর কর্তৃত্ব থাকলে শান্তিকালেও ইরান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল-নিবন্ধিত জাহাজ চলাচল বন্ধ রাখতে পারবে। অবরোধের পর থেকে তেহরান নির্দিষ্ট কিছু দেশের—যেমন ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান—জাহাজকে চলাচলের অনুমতি দিয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জাহাজ সম্পূর্ণভাবে আটকে দেওয়া হয়েছে।

শান্তি প্রতিষ্ঠার পরও যদি এই নিষেধাজ্ঞা বজায় থাকে, তাহলে নতুন করে সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি হবে। তবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেলে ‘নিয়ন্ত্রিত করিডর’ হিসেবে হরমুজকে ব্যবহার করে ইরান এই সমস্যা এড়াতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের সম্ভাব্য আগ্রাসন ঠেকাতে পারে

শান্তিকালে হরমুজের নিয়ন্ত্রণ ইরানকে উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি প্রবাহের ‘প্রহরী’ বা গেটওয়ে হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। এই অঞ্চলের তেল পরিবহনের দুটি প্রধান পথ—হরমুজ প্রণালি এবং লোহিত সাগরের প্রবেশমুখ বাব এল–মান্দেব প্রণালি। ইরান ইতিমধ্যে হরমুজে সরাসরি প্রভাব বিস্তার করছে এবং ইয়েমেনভিত্তিক হুতি গোষ্ঠীর মাধ্যমে বাব আল-মান্দেব প্রণালিতেও প্রভাব ফেলছে।

হরমুজে আনুষ্ঠানিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করলে এই ‘গেটকিপার’ অবস্থান আরও দৃঢ় হবে এবং ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের হামলার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়বে। একই সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কেও বাড়তি প্রভাব বিস্তার করতে পারবে তেহরান। এর মধ্যে অনেক দেশই আগেই সতর্ক করেছে—যুদ্ধ যদি এইভাবে শেষ হয়, তবে তা হবে এক নতুন বাস্তবতার সূচনা। ‘গালফ গেটওয়ে’ হয়ে ওঠা ইরানের অর্থনীতির জন্য নতুন বিনিয়োগের সুযোগও তৈরি করবে—যে অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরে চাপের মুখে রয়েছে।
সূত্র: এনডিটিভি

প্রিন্ট

আরও সংবাদ