খুলনা | শুক্রবার | ১০ এপ্রিল ২০২৬ | ২৬ চৈত্র ১৪৩২

বিরোধী দলের আপত্তির মুখেই সংসদে মানবাধিকার কমিশন ও সুপ্রীম কোর্ট সচিবালয় বিল পাস

খবর প্রতিবেদন |
০১:২৭ এ.এম | ১০ এপ্রিল ২০২৬


বিরোধী দলের আপত্তির মুখে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (রহিতকরণ ও পুনঃপ্রচলন) বিল-২০২৬ এবং সুপ্রীম কোর্ট সচিবালয় (রহিতকরণ) বিল, ২০২৬ জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদর সভাপতিত্বে বৃহস্পতিবারের বৈঠকে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (রহিতকরণ ও পুনঃপ্রচলন) বিল-২০২৬ উত্থাপন করলে তা পাস হয়।
এর আগে এনসিপির সংসদ সদস্য (কুমিল্লা-৪) সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহর আপত্তি কণ্ঠভোটে এটি নাকচ হয়। এই বিলটি পাসের ফলে অন্তর্বতী সরকারের সময়কালে জারিকৃত অধ্যাদেশ বাতিল হয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কালে প্রণীত ২০০৯ সালের জাতীয় মানবাধিকার আইন পুনঃপ্রচলন হচ্ছে।
বিলটি উত্থাপনের পর এতে আপত্তি তুলে এনসিপির সংসদ সদস্য (কুমিল্লা-৪) ক্ষোভ প্রকাশ করে হাসনাত আব্দুল্লাহ। তিনি বলেন, আজকে (বৃহস্পতিবার) যারা সরকারি বেঞ্চ রয়েছেন তারা চব্বিশের জুলাইয়ের আগে হলে এই বিল পাসের বিরোধিতা করতেন। এই অধ্যাদেশকে ল্যাপস করার মধ্য দিয়ে মানবাধিকার কমিশনকে রাজনৈতিক দমন-পীড়নের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, আমরা ইতিহাস থেকে কোনো শিক্ষা নিই না। এটা এই বছর পাস না করি, আগামী বছর পাস না করি, সংখ্যাগরিষ্ঠতার দোহাই দিয়ে হয়ত ল্যাপস করা যাবে। কিন্তু এই সংসদে জাতীয় মানবাধিকর কমিশন বিল অবশ্যই পাস হবেই হবে।
তিনি আরও বলেন, সংসদ নেতা, বিরোধীদলীয় নেতা, সরকারি বেঞ্চে যাঁরা উপস্থিত আছেন প্রত্যেকে এই সংসদে আসার পথে ক্রান্তিকালীন পর্যায় অতিক্রম করে এখানে এসেছেন। এই পুরো জার্নির পেছনে যে আইনটি জড়িত তা নিয়ে আপত্তি উত্থাপন করছি। এটার আলোচনার জন্য দুই মিনিট সময় অপ্রতুল। সংসদে বিভিন্ন বিষয়ে, প্রশংসা, অন্য বিষয়ে অনেক সময় অপচয় হয়। মাননীয় স্পিকারের কাছে অনুরোধ করব এই সময় সীমাবদ্ধতা না করে সময় যেন বাড়িয়ে দেওয়া হয়।
হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, আজকে (বৃহস্পতিবার) যে আইনটি পাস করার কথা বলা হচ্ছে তার মধ্য দিয়ে ২০০৯ সালের মানবাধিকার কমিশনকে রিস্টোর (পুনঃপ্রচলন) করবে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ২০০৯ সালের যে আইনটি রয়েছে, সেই আইনের প্রয়োগ দীর্ঘ ১৭ বছরে হয়েছে, আমরা তা দেখেছি। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে বিরোধী দল ও মতকে দমন কমিশন হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। বিএনপিকে দমন করার বৈধতা মানবাধিকার কমিশন উৎপাদন করেছে। আমরা জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে বলতে শুনেছি জামায়াতের নেতা-কর্মীদের গুলি করা বৈধ মানবাধিকার টিকিয়ে রাখার স্বার্থে। আমরা যদি জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ২০০৯-এ যদি চলে যাই, আজকে (বৃহস্পতিবার) যদি ২০২৫-এর অধ্যাদেশকে ল্যাপস করে দেওয়া হয়, তাহলে আমরা যে ফরওয়াডিং মুভে ছিলাম সেখান থেকে জাতি আবারো ব্যাকওয়ার্ডে যাবে। জাতি পিছিয়ে পড়ার একটি টেক্সটবুক এক্সজাম্পল (উদাহরণ) হিসেবে এই সংসদে এটি থাকবে।
তিনি বলেন, ২০০৯ সালের মানবাধিকার কমিশন আদতে কোনো আইন নয়, এটিতে সরকারি আরেকটি দপ্তর বানানো হয়েছিল। সেখানে স্পিকারের নেতৃত্বে যে সিলেকশন কমিটি করা হয়েছে সেখানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী, সরকার দলীয় এমপি ও একজন সচিব থাকেন। ৬ সদস্য বিশিষ্ট বোর্ডের ৫ জনই সরকার দলীয়।
হাসনাত বলেন, আমাদের এলজিআরডি মন্ত্রী (মির্জা ফখরুল ইসলাম) বলেছিলেন, এটা বিরোধী দল দমন কমিশন হিসেবে ফাংশন করে। মানবাধিকার কমিশন যখন বিরোধী দল ও মত দমন কমিশন হিসেবে ফাংশন করে। আমরা যদি দেখি আদতে মানবাধিকার যেসব ক্ষেত্রে ক্ষুণœ হয়েছে তা সরকারি সংশ্লিষ্ট সংস্থা করেছে। সেখানে বিডিআর, র্যাবসহ বিভিন্ন বাহিনীর সরাসরি সংযুক্ততা আমরা দেখেছি। মানবাধিকারকে তারা ক্ষুণœ করেছে। ২০০৯ সালের মানবাধিকার কমিশন আমরা দেখেছি, যদি বাহিনীর বিরুদ্ধে কোনো তদন্ত পরিচালনা করতে চাইলে সেই বাহিনীর পূর্বানুমতি লাগবে, সরকারের পূর্বানুমতি লাগবে। সরকারের পূর্বানুমতি নিয়ে সরকার যে মানবাধিকার ক্ষুণœ করবে-সেই মানবাধিকারের তদন্ত কতটা স্বচ্ছ হবে তা এই সংসদের প্রতিটি সদস্যরা তা জানেন।
হাসনাত আব্দুল্লাহকে দেওয়া ৪ মিনিট সময় শেষ হয়ে যাওয়ার পর বিরোধীদলীয় নেতা ডাঃ শফিকুর রহমান বলেন, এই বিষয়টি স্বচ্ছ রাজনীতি ও মানুষের জীবনের নিরাপত্তার সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। এ জন্য এ বিষয়ে আলোচনার জন্য আরও সময় দেয়া দরকার।
জবাবে স্পিকার বলেন, আমরা অতীতে ৬টি সংসদ দেখেছি। এই বিষয়ের ওপর দুই মিনিট করে সময় দেওয়া হতো। যা হোক আপনি (হাসনাত) আরও দুই মিনিট বলতে পারেন।
পরে হাসনাত বলেন, আজকে (বৃহস্পতিবার) যদি ২০২৪ সালের মে মাস হতো, আর এই বিলটি যদি উত্থাপন হতো; তাহলে এই সংসদে এমন কোনো সদস্য নেই যে এর বিরোধিতা করতেন। প্রত্যেকে এটাকে সাদরে গ্রহণ করতেন। আজকে সময় পাল্টিয়েছে। ২০০৮ সাল, ২০১৮ সালে আপনারা এই পাশে ছিলেন। আজকে (বৃহস্পতিবার) আপনারা ওই পাশে (সরকারি দলে) গিয়েছেন। সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়েছেন। আজকে এই বিলের বিরুদ্ধে আপনারা অবস্থান নিয়েছেন। চব্বিশ সালের জুলাইয়ের কোন মাসে এটা ফেব্র“য়ারি-জানুয়ারি-মার্চ; তৎকালীন ফ্যাসিবাদ সময়কালে যদি এই বিলটি ২০২৫ সালের অধ্যাদেশটি এই সংসদে তোলা হতো বাই চাইতেন বিলটি যেন পাস করা হয়। সময় পাল্টিয়েছে, ঋতু পরিবর্তন হয়েছে। চেয়ার পরিবর্তন হয়েছে। দিক পরিবর্তন হয়েছে। আজকে জাতীয় মানবাধিকর কমিশনের বিরুদ্ধে আমরা অবস্থান নিয়েছি। আমাদের এই অবস্থান নৈতিককতার দিক থেকে টেক্সবুক এক্সজাম্পল হিসেবে থাকবে।
হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, এই আইনটি শুধু মানবাধিকার কমিশনের সাথে সম্পৃক্ত নয়। আরো দু’টি অধ্যাদেশ এর সাথে সম্পর্কিত। এটা গুম অধ্যাদেশ ও জুলাই গণঅভ্যুত্থান দায়মুক্তির অধ্যাদেশের সাথে সম্পর্কিত। ২০২৫ সালের মানবাধিকার কমিশন ল্যাপস করার মধ্য দিয়ে আদতে বাকি দু’টি অধ্যাদেশকে অর্নামেন্টাল করে ফেলা হবে। সরকার পরবর্তীতে এই অধ্যাদেশকে রাজনৈতিক দমন-পীড়নের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করবে না-সেটার কোনো নিশ্চয়তা নেই। আমরা ইতিহাস থেকে কোনো শিক্ষা নিই না। এটা এই বছর পাস না করি, আগামী বছর পাস না করি, সংখ্যাগরিষ্ঠতার দোহাই দিয়ে হয়ত ল্যাপস করা যাবে। কিন্তু এই সংসদে জাতীয় মানবাধিকর কমিশন অবশ্যই পাস হবেই হবে।
এছাড়া বিরোধী দলের আপত্তির মুখে সুপ্রীম কোর্ট সচিবালয় (রহিতকরণ) বিল, ২০২৬ জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ