খুলনা | রবিবার | ১২ এপ্রিল ২০২৬ | ২৮ চৈত্র ১৪৩২

সংসদে ঋণখেলাপির তালিকা প্রকাশ

সুশাসন প্রতিষ্ঠায় চাই আপসহীন পদক্ষেপ, নিতে হবে রাঘববোয়ালদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা

|
১২:৪১ এ.এম | ১২ এপ্রিল ২০২৬


জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপির তালিকা প্রকাশ করেছেন। তালিকায় এস আলম গ্র“প ও বেক্সিমকোর মতো বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর আধিপত্য দেখা গেছে। প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে খেলাপি ঋণের মোট পরিমাণ ৫ লাখ ৪৪ হাজার ৮৩১ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী ৩ হাজার ৩৩০ কোটি ৮ লাখ টাকা খেলাপি হিসাবে দেখানো হয়নি। এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে, আইনি ফাঁকফোকর ব্যবহার করে রাঘববোয়ালরা কতটা প্রভাবশালী হয়ে উঠেছেন। একদিকে সাধারণ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা ঋণের কিস্তি দিতে সামান্য বিলম্ব করলে আইনি জটিলতায় পড়েন, অন্যদিকে প্রভাবশালীরা হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট করেও ক্ষমতার ছত্রছায়ায় দিব্যি সুবিধাজনক অবস্থানে থাকছেন।
অর্থমন্ত্রী ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করার রূপরেখা তুলে ধরেছেন। এটি নিঃসন্দেহে একটি উচ্চাভিলাষী ও আশাব্যঞ্জক স্বপ্ন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যে অর্থনীতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে খেলাপি ঋণের ক্যানসার ছড়িয়ে পড়েছে, তাকে আমূল সংস্কার না করে কি এই স্বপ্ন বাস্তবায়ন সম্ভব? মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধির বিকল্প না থাকলেও ব্যাংকের অর্থ গুটিকয়েক প্রতিষ্ঠানের হাতে কুক্ষিগত থাকায় তা কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে বাজেট সাপোর্ট নিয়ে দেশ চালানো আর অভ্যন্তরীণ ঋণের টাকা আদায় না হওয়া-এই বৈপরীত্য শুভলক্ষণ নয়।
বিগত সময়ে ব্যাংক খাতে সৃষ্ট বিশৃঙ্খলা ও দুর্বলতাকে কাটিয়ে ওঠার প্রতিশ্র“তি নিয়ে বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে; কিন্তু মাঠপর্যায়ে এর প্রতিফলন এখনো দৃশ্যমান নয়। আমরা মনে করি, বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি বা ক্রেডিট রিস্ক ম্যানেজমেন্টের মতো তাত্তি¡ক সমাধান দিয়ে এই পর্বতসম সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। যথেষ্ট নয় খেলাপি ঋণ আদায়ে কেবল তালিকা প্রকাশও। বরং জরুরি বিষয় হলো, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে কঠোর আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা। বিশেষ করে যারা ইচ্ছাকৃত খেলাপি, তাদের জন্য কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া মানেই হলো পুরো ব্যাংক ব্যবস্থাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া।
কাজেই ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে প্রথমেই আর্থিক খাতে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের শনাক্ত করে তাদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা এবং সব ধরনের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত করাও এখন সময়ের দাবি। নীতিনির্ধারকদের মনে রাখতে হবে, ক্ষুদ্র ব্যক্তিস্বার্থ বা দলীয় স্বার্থের চেয়ে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অনেক বেশি মূল্যবান। সাধারণ আমানতকারীদের অর্থের নিরাপত্তা এবং ব্যাংক খাতের ওপর জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে না পারলে কোনো রূপরেখাই সফল হবে না। সরকার যদি সত্যিই ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে চায়, তাহলে এই রাঘববোয়ালদের বিরুদ্ধেই প্রথমে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিয়ে নিজেদের অঙ্গীকারের প্রমাণ দিতে হবে। অন্যথায়, খেলাপি ঋণের এই দুষ্টচক্র উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির সব অর্জনকে গিলে খাবে।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ