খুলনা | মঙ্গলবার | ১৪ এপ্রিল ২০২৬ | ৩০ চৈত্র ১৪৩২

নতুন মোড়কে বৈশাখী সংস্কৃতি

অ্যাড.এম.মাফতুন আহমেদ |
১২:৩২ এ.এম | ১৪ এপ্রিল ২০২৬


পৃথিবীর দেশে-দেশে নিজস্ব সনের প্রচলন আছে। সে কারণেই প্রত্যেক দেশে বিভিন্ন সাল বা অব্দের প্রচলন লক্ষ্য করা যায়। আল কুরআনের ঘোষণাঃ “আকাশ এবং পৃথিবী সৃষ্টির প্রথম দিন থেকেই বছর গণনার মাস বারটি”। কিতাবের এ ঘোষণার প্রতিফলন পৃথিবীর দেশে-দেশে সন এবং বছর গণনার নানা পন্থার মধ্যে দেখা যায়। আর পৃথিবীর বিভিন্ন রাষ্ট্রে, বিভিন্ন জাতি ও স¤প্রদায় যত সন ব্যবহার করছে সবগুলোই ১২ মাসের। 
আরব দেশগুলোতে হিজরী সনের প্রচলন আছে। অন্যান্য মুসলিম প্রধান দেশগুলোতে হিজরী সনের তেমন একটা প্রচলন নেই। তবুও তারা ধর্মীয় উৎসবকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকে। নিজস্ব সমাজ-সংস্কৃতি-লোকজীবনাচারকে সামনে রেখে তারা নববর্ষ উদযাপন করে। বাংলা সন-মাস এর বাইরে নয়।
দিবসটি সৃষ্টি হয়েছিল মোগল শাসনামলে কর-খাজনা আদায়ের জন্যে। ব্যবসায়িক স্বার্থে নয়। আর একটু আগ বাড়িয়ে বলতে পারি এই সনের প্রচলন হয়নি তথাকথিত বাঙালি সংস্কৃতির নামে পূজা-পর্বন, হোলি খেলা, ইলিশ-পান্তা ভাতের নামে ধণিক-বণিক বৈষম্য সৃষ্টির জন্যে। এই বাংলা সন কালের গর্ভে মিশে গেল ভিন্ন মোড়কে বাবু কেন্দ্রিক কালচারে? 
ধীরে ধীরে আবহমান বাঙালির গ্রামীন ঐতিহ্য এতসব উঠে গেল। বাংলা নববর্ষের মূল চেতনা থেকে দূরে সরে গেল। হাইজ্যাক হয়ে গেল নববর্ষের প্রকৃত সংস্কৃতি। চালু হলো বৈশাখী মেলায় পান্তা-ইলিশ খাবার অপসংস্কৃতি। অনেকে অনেকভাবে আবহমান বাংলার সংস্কৃতিকে বিকৃত করার চেষ্টা করলেন। সুযোগে সদ্ব্যব্যবহার করতে অনেকে মাঠে নামলেন। এ যেন ঝড়ে আম পড়ে। ফকিরের কেরামতি বাড়ে।  সেরকম একটি অবস্থা। 
এই সুযোগে সুকৌশলে একশ্রেণির মুসলিম নামধারী ইসলাম বিদ্বেষী, দেশদ্রোহিরা নানা ষড়যন্ত্রে মেতে উঠে। তারা নববর্ষের মূল সংস্কৃতিকে হাইজ্যাক করে নেয়। মিশে যায় বাবু কেন্দ্রিক কালচারে। তারা শুরু করে মঙ্গল শোভাযাত্রা, কপালে তিলক দেয়া, সর্বাঙ্গে বাঘ, ভল­ুক, পেঁচা, ময়ুর, টিয়া, কুমিরের প্রতিকৃতি বহনের সংস্কৃতি। এসব প্রতিকৃতি বহনের সংস্কৃতির সাথে বৈদান্তিক চিন্তা-চেতনা জড়িয়ে আছে।  
এখন হাটে-বাজারে হালখাতার দৃশ্য তেমন একটা চোখে পড়ে না। পহেলা বৈশাখ যে চেহারায় বর্তমানে রাজধানী ঢাকা ও কিছু শহারাঞ্চলে উদযাপিত হয় তার সঙ্গে আমাদের গ্রাম-গঞ্জের চাষা-ভূষা, শ্রমিক-মজুর প্রমুখের সাথে স্বাধীন বাংলাদেশের মানুষের কোন সংযোগ নেই। এই বিলাসের মধ্য দিয়ে বরং প্রতিবছর আমাদের প্রকৃত জীবনাচরণের প্রতি একটা বিদ্রুপই ছুঁড়ে দেয়া হয়। এই জাতীয় কৃত্রিম একটি উৎসবের জন্ম কলকাতা কেন্দ্রিক বাবু কালচার থেকে। আর তার পৃষ্ঠপোষক ছিলেন গ্রাম ছেড়ে শহুরে ভোগবিলাসের লোভে কলকাতায় পাড়ি জমানো গ্রাম্য রাজা-জমিদাররা। 
বাঙালির চিরায়িত সংস্কৃতি নববর্ষ এখন দেখে মনে হয় বাঙালি সংস্কৃতি নয়। বাঙালিত্বের কোন উৎসব নেই। চলে গেছে ভিন্ন আঙ্গিকে। একাকার হয়ে গেছে ভিন্ন ধর্মালম্বীদের মঙ্গল শোভাযাত্রা, কপালে তিলক দেয়া, সর্বাঙ্গে বাঘ, ভল­ুক, পেঁচা, ময়ুর, টিয়া, কুমিরের প্রতিকৃতি বহন করা এক কৃষ্টি সভ্যতার সাথে। অথচ ইসলামি দৃষ্টিতে পশু পূজনের কোন অনুমোদন নেই। 
কারণ এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ মনে করে পশুর মুখোশ, জন্তু শোভাযাত্রা হিন্দুত্ববাদের ধারণা থেকে উদ্ভুত। হিন্দুত্ববাদের অনুকরণে এই ধর্মীয় সংস্কৃতির সঙ্গে স্বাধীন বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের কী সম্পর্ক? যদিও হিন্দুত্ববাদে বিশ্বাসীদের ধারণা তারাই একমাত্র ‘বাঙালি’। খাঁটি বাঙালি। বাকি সবাই বহিরাগত। খেজুরতলা থেকে আগত। তবে ইতিহাস কখনই সে কথা বলে না। ইতিহাস বলে বাংলা সাহিত্য বা বাঙালিত্ব বলতে যা কিছু বোঝায় এককভাবে এই তল­াটের মুসলমানদের অবদান। 
বাংলা নববর্ষের উদ্ভাবক মোগল সম্রাট আকবর। তাঁর ‘তারিক-ই-ইলাহী’ বা ফসলি সনের কথা এখন আর কারো মনে আছে বলে মনে হয় না। ব্যবসায়িদের নতুন হালখাতার কথাও স্মরণ নেই। টাকা আদায়ের লালপেড়ে মোটা বাইন্ডিং খাতাও দৃশ্যত তেমন একটা নজরে আসে না। অতি প্রগতি সাজতে যেয়ে সবই চলছে নতুন ভড়ংএ। বিদেশী সংস্কৃতিতে গা ভাসিয়ে। 
বাঙালিদের শত শত বছরের দেশজ কৃষ্টি সভ্যতা তমদ্দুন রয়েছে। স্বাতন্ত্র্য মন্ডিত জীবনধারা রয়েছে। তাদের বেঁচে থাকতে হবে কাউকে অনুকরণ করে নয়। কারো দয়াপরবেশে নয়। নিজস্ব চেতনায় আগামীর প্রত্যাশার এগিয়ে যেতে হবে। একেবারেই নিজস্ব জীবনাচরণ থেকে এসব উৎসবের আয়োজন করতে হবে। যে উৎসবের আয়নায় লাল সবুজের পতাকায় আচ্ছাদিত ৬৮ হাজার গ্রাম বাংলার অবয়ব ফুটে ওঠে। বাঙালিত্ব, ইতিহাস-ঐতিহ্য, কৃষ্টি সভ্যতা ফুটে উঠবে। 
কার্যত ১লা বৈশাখে ইলিশ-পান্তা, শঙ্খ ধ্বনির উচ্ছাস একটি অপসংস্কৃতি। নববর্ষের নামে শুরু হয়েছে ভিন্ন মোড়কে ঠান্ডা মাথায় নতুন করে এক রাজনীতি। হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতির বিরুদ্ধে অপরাজনীতি। জোর করে চেপে দেয়া এক আত্মঘাতি সংস্কৃতি। ধরে নিতে পারেন এসব চক্রান্ত আগামীর জন্য দেশ-জাতির বিরুদ্ধে এক অশনি সংকেত। নববর্ষের নামে শুরু হয়েছে ভিন্ন মোড়কে ঠান্ডা মাথায় নতুন করে আর এক রাজনীতি। হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতির বিরুদ্ধে অপরাজনীতি। 
লেখক : আজাদবার্তা সম্পাদক, কলামিষ্ট ও আইনজীবী।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ