খুলনা | বুধবার | ১৫ এপ্রিল ২০২৬ | ২ বৈশাখ ১৪৩৩

পহেলা বৈশাখ আজ : বর্ষবরণের প্রাণের উৎসব

নিজস্ব প্রতিবেদক |
০১:০০ এ.এম | ১৪ এপ্রিল ২০২৬


নতুন বছরের আগমনীসুর যেন ইতোমধ্যেই ভেসে উঠেছে বাতাসে। পুরনো বছরের জীর্ণতা, গ্লানি ও শোককে বিদায় জানিয়ে আজ মঙ্গলবার শুরু হচ্ছে নতুন প্রাণের উৎসব-পহেলা বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ। ঋতুচক্রের নবায়নের মতোই এ উৎসব বয়ে আনে আশা, পুনর্জাগরণ ও ঐক্যের বার্তা। নববর্ষের এই প্রভাতে, ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় আবারও উচ্চারিত হবে বাঙালির চিরন্তন আহবান-নতুনের জয়, মানবতার জয়।
হাজার বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের মেলবন্ধনে গড়ে ওঠা এই দিনটি জাতি, ধর্ম ও বর্ণের ঊর্ধ্বে উঠে সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে। দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি বাংলাদেশি একযোগে মেতে উঠবে বাংলা বর্ষবরণের আনন্দে। অন্তরের গভীরে লালিত দেশপ্রেম, অসা¤প্রদায়িক চেতনা এবং সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের এক অনন্য প্রকাশ পায় এই দিনে। প্রত্যাশা-অশুভ ও অসুন্দর দূরীভূত হোক, সত্য ও সুন্দরের জয়গান প্রতিধ্বনিত হোক সর্বত্র; বিদায়ী বছরের সব দুঃখ-বেদনা মুছে যাক।
দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিন এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পৃথক বার্তায় বাংলা নববর্ষে দেশবাসীকে অভিনন্দন জানিয়েছেন।
ঐক্য, সম্প্রীতি ও নতুন প্রত্যয়ের আহবান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি। ‘বাংলা নববর্ষ আমাদের প্রাণের সর্বজনীন উৎসব। এটি আমাদের ঐক্য, সম্প্রীতি ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত-এ কথা উলে­খ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, জাতি, ধর্ম ও বর্ণেও ভেদাভেদ অতিক্রম করে পহেলা বৈশাখ আমাদের সবার জন্য হয়ে ওঠে এক আনন্দ ও মিলনের দিন। আমাদের গৌরবময় ঐতিহ্য, সমৃদ্ধ সংস্কৃতি এবং আত্মপরিচয়ের ধারক ও বাহক হিসেবে এ উৎসবের গুরুত্ব অপরিসীম। বৈশাখের আগমনে আমাদের জীবনে জাগে নতুন প্রত্যাশা, নব প্রতিশ্র“তি ও অসীম সম্ভাবনার স্বপ্ন। অতীতের গ্লানি, বেদনা ও ব্যর্থতাকে পেছনে ফেলে আমরা এগিয়ে চলি নব উদ্যমে ও নব প্রত্যয়ে।
শহরের পাশাপাশি গ্রামবাংলাও প্রস্তুত বর্ষবরণের উচ্ছ¡াসে। নানা বয়সী নারী, পুরুষ ও শিশুরা বর্ণিল পোশাকে উদ্যাপন করবে দিনটি। বসবে বৈশাখী মেলা; আয়োজন থাকবে বলিখেলা, লাঠিখেলা ও হা-ডু-ডু’র মতো ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলার। চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে অনুষ্ঠিত হবে ঐতিহ্যবাহী জব্বারের বলিখেলা, যা শতবর্ষের ঐতিহ্য বহন করে আসছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বরাবরের মতোই আয়োজিত হবে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা, যেখানে লোকঐতিহ্য ও স্বকীয়তাকে ধারণ করে বৃহৎ পরিসরে সর্বজনীন অংশগ্রহণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। শোভাযাত্রার থিম ও মোটিফে ফুটে উঠবে আবহমান বাংলার লোকজ সংস্কৃতি। বাঁশ, কাঠ ও রঙিন কাগজে নির্মিত বিশাল বাঘ, হাতি, ময়ূর এবং মা-শিশুর প্রতিকৃতি শোভাযাত্রাকে দেবে এক অনন্য মাত্রা। এই শোভাযাত্রার মূল বার্তা-অশুভ শক্তির বিনাশ এবং কল্যাণময় আগামীর পথে যাত্রা।
এবারের শোভাযাত্রায় ‘মোরগ, বেহালা, পায়রা, হাতি ও ঘোড়া’-এই পাঁচটি মোটিফ বিশেষভাবে স্থান পেয়েছে। লোকজ প্রতীকের ধারায় এগুলো যথাক্রমে শক্তি, সৃজন, শান্তি, গৌরব ও গতিময়তার প্রতীক হিসেবে বহুমাত্রিক তাৎপর্য বহন করে। প্রতিটি মোটিফেই প্রতিফলিত হবে বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গভীর অনুষঙ্গ। পাশাপাশি ৩৫ জন বাদ্যযন্ত্রশিল্পীর পরিবেশনায় জাতীয় সংগীত, ‘এসো হে বৈশাখ’ এবং দেশাত্মবোধক গান শোভাযাত্রার আবহকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলবে। এতে অংশ নেবে ২০০ জন শিক্ষার্থী, যারা বহন করবে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা।
‘শান্তি, মানবতা ও সম্প্রীতি’-এই প্রতিপাদ্য নিয়ে রমনার বটমূলে ছায়ানটের শিল্পীরা সম্মিলিত কণ্ঠে পরিবেশন করবেন বর্ষবরণের গান, যা দীর্ঘদিন ধরেই এ দিনের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। অন্যদিকে, উদীচী সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তোপখানা রোডে আড্ডা, গান, কবিতা ও নৃত্যের মাধ্যমে বর্ষবরণ করবে। বিকেল ৪টায় তাদের মূল আয়োজন অনুষ্ঠিত হবে। এবারের প্রতিপাদ্য-‘বৈশাখের রুদ্র-রোষে ধ্বংস হোক সামাজিক ফ্যাসিবাদ।’
পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে নিরাপত্তা নিশ্চিতে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ (কেএমপি), জেলা পুলিশ, র‌্যাব ও কোষ্ট গার্ড বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।
সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে শিল্পকলা একাডেমি, বাংলা একাডেমিসহ বিভিন্ন অঙ্গসংগঠন সারাদেশে নানা কর্মসূচির মাধ্যমে দিবসটি উদ্যাপন করবে। এদিকে জাতীয় প্রেসক্লাব ও ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিও পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে।
খুলনা :  নানা আয়োজন নিয়ে ঢালা সাজিয়েছে জেলা প্রশাসন, বিশ্ববিদ্যালয় সমূহ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিল্পকলা একাডেমী, শিশু একাডেমী, বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় : বর্ণাঢ্য আয়োজনে বাংলা নববর্ষ-১৪৩৩ উদ্যাপন উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মাঠে সকাল ৯টায় বৈশাখী মেলার উদ্বোধন করা হবে। সকাল ১০টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মাঠ থেকে বের হবে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা। এছাড়া বিকেল ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে। দিনব্যাপী মেলায় বিভিন্ন আয়োজন থাকবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় : উৎসবমুখর পরিবেশে বাংলা নববর্ষ-১৪৩৩ বরণ করে নিতে বর্ণাঢ্য সাজে সেজেছে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। ক্যাম্পাস জুড়ে এখন উৎসবের আমেজ, বর্ণিল আলপনা, প্যান্ডেল সাজানো, বৈশাখী শোভাযাত্রার জন্য বিভিন্ন প্রতীকী উপকরণ তৈরি, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মঞ্চ এবং বিভিন্ন স্টল প্রস্তুত। শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা সম্মিলিতভাবে এই আয়োজনকে সফল করতে কাজ করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টুডেন্ট ওয়েলফেয়ার সেন্টারের সামনে শিক্ষার্থীরা বিশেষ ‘ফ্ল্যাশ মব’-এ উৎসবমুখর পরিবেশে শেষ মুহূর্তের সময় পার করছে। এছাড়া বিকেল থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলের প্রবেশপথে এবং আঙিনায় শুরু হয়েছে বর্ণিল আল্পনা অঙ্কন, যা চলবে রাত ১০টা পর্যন্ত। পুরো ক্যাম্পাস এখন উৎসবের আমেজে মুখরিত। সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. মুহাম্মদ মাছুদ আয়োজনের বিষয়ে সার্বিক খোঁজখবর নেন এবং বিভিন্ন স্টল ও আলপনা ঘুরে দেখেন। সেই সাথে সকল অনুষ্ঠান সুষ্ঠুভাবে উৎসব মুখর পরিবেশে সম্পন্নের জন্য সবার সহযোগিতা কামনা করেন। 
সকাল ৮টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠে ঐতিহ্যবাহী ‘বৈশাখী মেলা’ উদ্বোধনের মাধ্যমে মূল অনুষ্ঠান শুরু হবে। মেলার পাশাপাশি থাকবে বাউল সঙ্গীত, সাপ খেলা, বানর খেলা, ম্যাজিক শো, ট্রেজার হান্ট, মোরগ লড়াই, কাবাডি খেলা, ঘুড়ি উৎসবসহ গ্রামবাংলার চিরচেনা সব আয়োজন। নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করে উৎসবের সকল প্রস্তুতি ইতিমধ্যে চ‚ড়ান্ত করা হয়েছে।
খুলনা খান বাহাদুর আহ্ছানউল্লা বিশ্ববিদ্যালয় : বাংলা নববর্ষ উৎসবমুখর পরিবেশে উদযাপনের লক্ষ্যে বিভিন্ন  কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে সকাল ৮টায় বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে গল্লামারী এবং গল্লামারী থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস রুট পর্যন্ত বৈশাখী শোভাযাত্রা, সকাল ৯টায় হাঁড়িভাঙ্গা, সকাল সাড়ে ৯টায় বালিশ বদল, সকাল পৌনে ১০টায় ঘুড়ি উড়ানো, সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। কর্মসূচিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপস্থিত থাকার জন্য আহবান জানানো হয়েছে।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ