খুলনা | বুধবার | ১৫ এপ্রিল ২০২৬ | ২ বৈশাখ ১৪৩৩

নগরীর হেরাজ মার্কেটে নিষিদ্ধ ও চোরাই ওষুধের রমরমা ব্যবসা

মাদকাসক্তি-অপরাধে ব্যবহৃত ট্যাবলেট ও অকার্যকর ইনজেকশনে ঝুঁকিতে জনস্বাস্থ্য

এস এম জাহিদ |
০১:৫৩ এ.এম | ১৪ এপ্রিল ২০২৬


দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম পাইকারি ওষুধের বাজার হিসেবে পরিচিত খুলনা মহানগরীর হেরাজ মার্কেট-সেখানে দীর্ঘদিন ধরেই অবৈধ, নিষিদ্ধ ও চোরাই পথে আসা ওষুধের একটি বড় নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। বাজারটির বিভিন্ন দোকান ও গুদামে ভারত থেকে পাচার হয়ে আসা ওষুধ, মাদকাসক্তি সৃষ্টিকারী ট্যাবলেট, অজ্ঞান পার্টির কাজে ব্যবহৃত ওষুধ এবং বিক্রি নিষিদ্ধ স্যাম্পল ওষুধ অবাধে কেনাবেচা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র ও ওষুধ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত একাধিক ব্যক্তি জানান, নিষিদ্ধ টাপেনটাডল ট্যাবলেট বর্তমানে মাদকাসক্তদের মধ্যে নতুন নেশা হিসেবে ছড়িয়ে পড়ছে। একই ভাবে এটিভেন-২ নামের ট্যাবলেট অপরাধচক্রের সদস্যরা ব্যবহার করছে, যা সেবনের মাধ্যমে মানুষকে অচেতন করে সর্বস্ব লুটে নেওয়া হচ্ছে। এসব ওষুধ কয়েক গুণ বেশি দামে বিক্রি করা হচ্ছে। 
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, টাপেনটাডল একটি শক্তিশালী পেইন কিলার, যা অপব্যবহারের কারণে সরকার কয়েক বছর আগে এর উৎপাদন, বিপণন ও বাজারজাতকরণ নিষিদ্ধ করে। এরপরও চোরাকারবারিরা ভারত থেকে অবৈধভাবে এসব ওষুধ এনে স্থানীয় অসাধু ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে বাজারজাত করছে। 
সূত্র বলছে, ইয়াবার বিকল্প হিসেবে টাপেনটাডল সেবনকারীর সংখ্যা বাড়ছে। ব্যবসায়ীরা প্রতিটি ট্যাবলেট ১০০-১৫০ টাকায় কিনে ৬০০-৭০০ টাকায় বিক্রি করছেন, যা একটি সংগঠিত মাদক চক্রের ইঙ্গিত দেয়। 
অন্যদিকে, একইভাবে পাচার হয়ে আসা ইনজেকশন দীর্ঘ সময় ফ্রিজের বাইরে থাকায় কার্যকারিতা হারাচ্ছে। সংরক্ষণ ব্যবস্থার ঘাটতির কারণে এসব ইনজেকশন ব্যবহার করে রোগীরা প্রতারিত হচ্ছেন এবং স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন। এছাড়া চিকিৎসকদের জন্য কোম্পানি থেকে দেওয়া বিনামূল্যের স্যাম্পল ওষুধ-যেগুলো বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ-সেগুলোও হেরাজ মার্কেটে কেনাবেচা হচ্ছে। অসাধু ব্যবসায়ীরা এসব স্যাম্পল ওষুধ কম দামে সংগ্রহ করে শহর ও গ্রামের খুচরা দোকানে সরবরাহ করছে, যেখানে তা অধিক দামে বিক্রি হচ্ছে। 
বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, মার্কেটের দোতলা ও তৃতীয় তলায় গড়ে উঠেছে একাধিক গোপন গুদাম, যেখানে এসব চোরাই ও নিষিদ্ধ ওষুধ মজুত রাখা হয়। দোকানে অল্প পরিমাণে প্রদর্শন করা হলেও মূল মজুদ থাকে গুদামে। চোরাকারবারিরা ভোরবেলা বা গভীর রাতে সুবিধাজনক সময়ে এসব ওষুধ সরবরাহ করে থাকে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকেও বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালানো হয়েছে। গত বছর ২১ মে খুলনা সদর থানা পুলিশ হেরাজ মার্কেটে অভিযান চালিয়ে ৩১০ পিস টাপেনটাডল ট্যাবলেটসহ এক মাদক কারবারিকে গ্রেফতার করে। এছাড়া মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের একাধিক অভিযানে আরও কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে। 
ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের খুলনা জেলা ড্রাগ সুপার মোঃ সাদ্দাম হোসেন বলেন, “নিষিদ্ধ ও অবৈধ ওষুধ বিক্রির বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। স¤প্রতি হেরাজ মার্কেটে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে একজন ব্যবসায়ীকে জরিমানা করা হয়েছে। এ ধরনের কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।” তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মাঝে মাঝে অভিযান চালিয়ে এ ধরনের সংঘবদ্ধ চক্র বন্ধ করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন নিয়মিত নজরদারি, কঠোর শাস্তি এবং সমন্বিত পদক্ষেপ। অন্যথায় জনস্বাস্থ্য ও আইনশৃঙ্খলার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে এই অবৈধ ওষুধের বাণিজ্য।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ