খুলনা | বৃহস্পতিবার | ২৩ এপ্রিল ২০২৬ | ১০ বৈশাখ ১৪৩৩

অবৈধ যানবাহনের বেপরোয়া চলাচলে আতঙ্কিত নগরবাসী কেসিসি হারাচ্ছে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব

শামিম আশরাফ শেলী |
০১:৫৯ এ.এম | ২৩ এপ্রিল ২০২৬


নগরীতে অন্যতম প্রধান গণপরিবহন ইজিবাইক এবং ইঞ্জিন রিকশা। যার আশি শতাংশের বেশী ইজিবাইক এবং কয়েকহাজার ইঞ্জিন রিকশা, যার সবই অবৈধ। অবৈধ এ সকল যানবাহনের বেপরওয়া চলাচলে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার শিকার হয়ে মৃত্যুর শিকার হচ্ছে পথচারীরা, বরণ করছেন পঙ্গুত্ব, ফলে নগরবাসী আতঙ্কিত। এছাড়া যানজটে নাকাল হচ্ছে জীবনযাত্রা, অন্যদিকে কেসিসি হারাচ্ছে বিপুল অঙ্কের রাজস্ব।
সূত্রমতে, খুলনা মহানগরীতে লাইসেন্সপ্রাপ্ত ইজিবাইকের সংখ্যা যাত্রীবাহী ৭ হাজার ৮৭৮টি এবং পণ্যবাহী ২০৯৬টি যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নবায়ন করা হয়েছে, যার মাধ্যমে দুই হাজার টাকা নবায়ন ফি হিসেবে কেসিসি রাজস্ব আদায় করেছে এক কোটি ৯৯ লাখ ৪৮ হাজার টাকা। 
অন্যদিকে চলাচলরত লাইসেন্স বিহীন ইজিবাইকের সংখ্যা প্রায় ৩০ হাজারের অধিক বলে জানিয়েছেন সাধারণ ইজিবাইক চালকগণ এবং নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কেসিসির একাধিক সূত্র। এই পরিমাণ ইজিবাইক থেকে প্রায় ৬ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করা সম্ভব যা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সিটি কর্পোরেশন। 
অন্যদিকে, রাস্তার ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত এই বিপুল পরিমাণ ইজিবাইক নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতার কারণে বেপরোয়া চলাচলে একদিকে যেমন নগরীতে যানজট সৃষ্টি করছে, অন্যদিকে যত্রতত্র দুর্ঘটনা ঘটছে যাতে ধ্বংসের সম্মুখিন হচ্ছে অনেক পরিবারের জীবন জীবীকা।
বেপরোয়া চলাচলের কারণ অনুসন্ধানে জানা যায় যে, অতিরিক্ত গাড়ির কারণে যাত্রী উঠাতে এরা মরিয়া হয়ে ওঠে ফলে কোন প্রকার নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করে যত্রতত্র গাড়ি থামায় এবং ওভারটেক করার ফলে গতির নিয়ন্ত্রণ না থাকায় অধিকাংশ দুর্ঘটনা ঘটে।
এদিকে মূর্তিমান এক আতঙ্কের নাম হলো ইঞ্জিন রিকশা, যা এক সময় নগর কর্তৃপক্ষ অবৈধ ঘোষণা করে নির্মূলের চেষ্টা করেছিলো, এখন সেগুলো আগের তুলনায় অধিক সংখ্যায় নির্বিঘেœ চলাচল করছে। এরা দিনে রাতে ঝড়ের বেগে চলে, যে গতি এই রিকশার ব্রেক ব্যবস্থার সাথে অকার্যকর, ফলে দুর্ঘটনা ঘটছে প্রতিনিয়ত, বিশেষ করে রিকশা দেখে পথচারিরা রাস্তা পারাপারকালে এদের গতির শিকার হচ্ছে। আরও বিস্ময়কর হলো ইঞ্জিন চালিত যান হলেও রাতের বেলা অধিকাংশ রিকশায় কোন আলো থাকে না ফলে পথচারি বা কোনো যানবাহনের ঘাড়ের উপর পড়ার আগে মানুষ এদের দেখতে পায় না। এই হাজার হাজার বাতি বিহীন রিকশা রাতের বেলার আতঙ্ক হয়ে নগরীতে চলাচল করছে অথচ ট্রাফিক পুলিশ নির্বিকার!
নগরের রাস্তা ব্যবহারে যে সকল যানবাহন চলাচল করে, নগর কর্তৃপক্ষকে তাদের ট্যাক্স প্রদান বাধ্যতামূলক। কিন্তু মহানগরীতে অধিকাংশ যানবাহন লাইসেন্স বিহীন হওয়ায় তাদের নিকট থেকে কর্তৃপক্ষ কোনো ট্যাক্স আদায় করতে পারছে না, ফলে পরিবহন মালিকরা একদিকে আইন অমান্য করে অবৈধ যানবাহন চালাচ্ছে আবার বিনা ট্যাক্সে ব্যবসাও করছে। নগরীতে চলাচলরত লাইসেন্স বিহীন ইজিবাক ও ইঞ্জিন রিকশার নবায়ন ফি আদায় না হওয়ায় প্রতিবছর কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে কেসিসি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কেসিসির লাইসেন্স অফিসার (যানবাহন) শেখ মোঃ দেলওয়ার হোসেন বলেন, “লাইসেন্স না থাকায় লাইসেন্স বিহীন ইজিবাইক থেকে পদ্ধতিগত ভাবেই কোনো টাকা আদায় করা সম্ভব নয়। তাছাড়া কত সংখ্যক ইজিবাইককে লাইসেন্স প্রদান করা হবে সিদ্ধান্ত আগে নিতে হবে। 
তিনি আরও বলেন, একসময় নগরীতে ১৭ হাজার রিকশা ছিলো যা বর্তমানে আরও বেড়েছে কিন্তু তারাও লাইসেন্স নবায়ন করছে না। নির্দেশনা না থাকা সত্তে¡ও রাজস্ব বৃদ্ধির সাথে যানবাহন শাখা স্ব-উদ্যোগে এ বছর প্রায় তিন হাজার রিকশার লাইসেন্স নবায়ন করেছে এবং তিনশ’ টাকা হারে প্রায় নয় লাখ টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন,“ নগরীতে চলাচলরত সকল অবৈধ যানবাহনকে লাইসেন্সের আওতায় আনা সম্ভব না হলে একদিকে যেমন কেসিসি বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে, অন্যদিকে নৈরাজ্যকর বেপরওয়া যানবাহন চলাচলে শৃঙ্খলা ফেরানোও সম্ভব হবে না।
ট্রাফিক পুলিশ সূত্রমতে, মহানগরীতে মোট ২৪টি ট্রাফিক পয়েন্টে দুই শিফট-এ প্রায় ৬০ জন সার্জেন্টসহ ২৮০ জন ট্রাফিক কর্মী কাজ করছেন। নগরীর অবৈধ যানবাহন নিয়ন্ত্রণে ট্রাফিক পুলিশের কোন ভূমিকা আছে কি-না জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মহানগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের পরিদর্শক পদমর্যাদার একজন অফিসার সময়ের খবরকে বলেন,“ অবৈধ যানবাহন নিয়ন্ত্রণে ট্রাফিক পুলিশ কাজ করছে। প্রতিদিনই অবৈধ যানবাহন আটক করা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়িত্ব সিটি কর্পোরেশনের।” 
রাতের বেলায় আলো ছাড়া হাজার হাজার ইঞ্জিন রিকশা কিভাবে চলাচল করে জানতে চাইলে তিনি বলেন,“ ট্রাফিক পুলিশ এটা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে।”
মহানগরীতে অবৈধ যানবাহন চলাচল বিষয়ে জানতে চাইলে খুলনা সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু দৈনিক সময়ের খবরকে বলেন,“বর্তমান সরকার খুলনা মহানগরীতে ইজিবাইকের নতুন লাইসেন্স প্রদান করবে কি-না এবং প্রদান করলে তার সংখ্যা কত হবে, অন্যদিকে ইঞ্জিন রিকশার বৈধতার বিষয়ে কি হবে, এ সকল বিষয়ে আলাপ-আলোচনা চলছে, সম্ভবত দ্রুতই একটা সিদ্ধান্ত গৃহিত হবে আর খুলনা সিটি কর্পোরেশনও সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।”

প্রিন্ট

আরও সংবাদ