খুলনা | শুক্রবার | ২৪ এপ্রিল ২০২৬ | ১১ বৈশাখ ১৪৩৩

বিপাকে পড়েছে শিক্ষার্থী-পরীক্ষার্থীরা

প্রচন্ড গরম আর লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ দক্ষিণাঞ্চলের ২১ জেলার জনজীবন

নিজস্ব প্রতিবেদক |
০২:৩৭ এ.এম | ২৪ এপ্রিল ২০২৬


প্রচন্ড গরমের সঙ্গে পাল­া দিয়ে বাড়ছে বিদ্যুতের লোডশেডিং। চাহিদার তুলনায় বিদ্যুতের উৎপাদন কম হচ্ছে অন্তত ২ হাজার মেগাওয়াট। শহরাঞ্চলে কিছুটা সহনীয় হলেও গ্রামে গড়ে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। এতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। কৃষি, শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে শিক্ষাক্ষেত্র সবখানেই এর নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত এই তিন মাস দেশে গরম যেমন বাড়ে, তেমনি বিদ্যুতের চাহিদাও বাড়ে। তবে এবার জ্বালানি সংকটসহ নানা কারণে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে। তাপমাত্রা না কমলে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার তেমন কোনো আশা নেই।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে জ্বালানির সংকট তৈরি হওয়ার পর বিদ্যুৎ ও জ্বালানির সাশ্রয় রোধে অফিসের সময় কমানো, শপিং মল দ্রুত বন্ধ করাসহ নানা প্রচেষ্টা শুরু করেছে সরকার। কিন্তু লোডশেডিং পরিস্থিতির কারণে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, সেসব ব্যবস্থা কতটা কাজে লাগছে।
যদিও এই সংকট কাটাতে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড। সংস্থাটি বলছে, জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি যান্ত্রিক ত্র“টি ও রক্ষণাবেক্ষণের কারণে কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন কমেছে। কয়লার সরবরাহ বাড়িয়ে এবং কেন্দ্রগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ শেষে দ্রুতই পুরোদমে উৎপাদন শুরুর চেষ্টা করছে সরকার।
এদিকে ফ্যাসিষ্ট সরকারের সময়ের বকেয়া আদায়ে সরকারকে চাপ দিচ্ছে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিকরা। একই সঙ্গে ভারতীয় প্রতিষ্ঠান আদানিও তাদের পুরনো পাওয়া পরিশোধে তাগিদ দিয়ে পিডিবিকে চিঠি দিয়েছে। সময়মতো বকেয়া পরিশোধ করা না হলে বিদ্যুৎ সরবরাহ বিঘœ হতে পারে বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছে তারা।
অন্যদিকে ভয়াবহ লোডশেডিংয়ের কবলে পড়েছে খুলনাসহ দক্ষিণাঞ্চলের ২১ জেলার জনজীবন। গত তিনদিন ধরে লোডশেডিং বেড়েছে। সেই সঙ্গে বেড়েছে তাপদাহ। ফলে বিপাকে পড়েছেন শিক্ষার্থী-পরীক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষ। প্রচণ্ড গরম আর লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ মানুষ। দিনে-রাতে ঘণ্টায় ঘণ্টায় বিদ্যুৎ যাচ্ছে আর আসছে বলে অভিযোগ গ্রাহকদের। সকালে এমনকি মধ্যরাতেও বিদ্যুতের সরবরাহ বন্ধ থাকছে।
নগরীর শিববাড়ি মোড়ে বেসরকারি একটি ব্যাংকে কর্মরত মোঃ মাহাফুজ বলেন, সকালে যথারীতি অফিসে এসেছি। তবে দুপুর পর্যন্ত এরই মধ্যে তিনবার বিদ্যুৎ চলে গেছে। প্রতিবারই কাজের মধ্যে বিঘ্ন ঘটছে। যখন বিদ্যুৎ থাকে তখন এসি চালু থাকে, ফলে কিছুটা স্বস্তিতে কাজ করা যায়। কিন্তু বিদ্যুৎ চলে গেলে অফিসের ভেতরটা প্রচণ্ড গরম হয়ে ওঠে, বসে কাজ করাটা কষ্টকর হয়ে পড়ে। এভাবে বারবার ঠান্ডা ও গরমের মধ্যে কাজ করতে গিয়ে শরীরের ওপর প্রভাব পড়ছে।
নগরীর খালিশপুর এলাকার এইচএসসি পরীক্ষার্থী শানু বলেন, তিন মাস পর এইচএসসি পরীক্ষা। বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের কারণে দিনে ও রাতে লেখাপড়ায় সমস্যা হচ্ছে। একে গরম তার ওপর বিদ্যুৎ যাচ্ছে আর আসছে। রাতেও প্রচন্ড গরম থাকে। পড়তে বসা যায় না। অবশ্য এটি বৈশ্বিক সমস্যা। তবে এটি তদারকি করা প্রয়োজন।
খুলনার ডুমুরিয়ার আরশনগর গ্রামের নূরজাহান খাতুন বলেন, প্রচণ্ড রোদ। অসহ্য গরম। সেই সঙ্গে দিনের বেলায় বিদ্যুৎ না থাকলে ঘরে থাকা কষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সকাল থেকে গভীর রাত অবধি বিদ্যুৎ যাওয়া আসা করে। বিদ্যুৎ যাওয়ার পরে এক বা দেড় ঘণ্টা আসে। ঘণ্টাখানেক থাকে, আবার চলে যায়। দিনে-রাতে ৮ থেকে ১০বার বিদ্যুৎ থাকে না। এভাবে বিদ্যুৎ যাওয়ার জন্য গরমে অসুস্থ হয়ে যাচ্ছি। এছাড়াও ইলেক্ট্রনিকস পণ্য নষ্ট হচ্ছে। ফ্রিজে থাকা খাবারও নষ্ট হচ্ছে।
আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা যায়, খুলনায় বৃহস্পতিবার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৭ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বুধবার খুলনায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তবে চলমান তাপদাহের কারণে বেশি গরম অনুভূত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন খুলনা আবহাওয়া অফিসের ইনচার্জ মোঃ মিজানুর রহমান। তাপদাহ চলছে। যে কারণে গরম বেশি। শুক্রবারও তাপদাহ থাকবে। তবে আগামী ২৫ বা ২৬ এপ্রিল খুলনায় বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।
ওজোপাডিকোর প্রধান প্রকৌশলী (এনার্জি, সিস্টেম কন্ট্রোল এ্যান্ড সার্ভিসেস) মোঃ আব্দুল মজিদ বলেন, গত মঙ্গলবার বিকেল থেকে লোডশেডিং বেড়েছে। বিদ্যুতের সরবরাহ কম পাচ্ছি, তাই কম দিচ্ছি। বৈশ্বিক অবস্থার কারণে জ্বালানি সংকটে এই সমস্যা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ২০২৪ সালের জুন মাসে ৮০৯ মেগাওয়াট চাহিদা ছিল। আর বুধবার দুপুর ১টায় বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল ৮১০ মেগাওয়াট। বৃহস্পতিবার ১৮২ মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি ছিল। আরও বাড়তে পারে।
বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টায় বিদ্যুতের ঘাটতি ছিল ১৮২ মেগাওয়াট আর দুপুর ১টায় ছিল ১৫৮ মেগাওয়াট। এর আগে বুধবার (২২) দুপুরে চাহিদার বিপরীতে বিদ্যুতের ঘাটতি ছিল ২০৩ মেগাওয়াট।
বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ কম থাকায় এই ঘাটতি দেখা দিয়েছে। ফলে ফিডার ভিত্তিক লোডশেডিং দিতে হচ্ছে।
ওয়েস্টজোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি সূত্রে জানা যায়, খুলনা বিভাগের ১০ জেলা, বরিশাল বিভাগের ছয় জেলা ও বৃহত্তর ফরিদপুরের পাঁচ জেলাসহ মোট ২১ জেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহের দায়িত্বে রয়েছে ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ওজোপাডিকো)। এই ২১ জেলায় বিদ্যুতের গ্রাহক রয়েছে ১৭ লাখ ২৮ হাজার ৩১৬ জন।
২১ জেলায় ওজোপাডিকোর আওতাধীন এলাকায় বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) বিকেল ৩টায় ৭৫৬ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল ৬১৯ মেগাওয়াট। এ সময় ঘাটতি ছিল ১৮২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। এদিন দুপুর ১টায় ৮০১ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল ৬৪৩ মেগাওয়াট। আর ঘাটতি ছিল ১৫৮ মেগাওয়াট।
এর আগে বুধবার (২২ এপ্রিল) দুপুর ১টায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ৮১০ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে সরবরাহ ছিল ৬০৭ মেগাওয়াট, অর্থ্যাৎ লোডশেডিং ছিল ২১০ মেগাওয়াট। এর মধ্যে শুধুমাত্র খুলনা জোনে লোডশেডিং ছিল ১৫৫ মেগাওয়াট। এদিন খুলনায় ৬২৩ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল ৪৬৮ মেগাওয়াট। আর বরিশাল জোনে লোডশেডিং ছিল ৪৮ মেগাওয়াট। এর আগে মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৭টায় খুলনাসহ ২১ জেলায় লোডশেডিং ছিল ১২৫ মেগাওয়াট।
 

প্রিন্ট

আরও সংবাদ