খুলনা | শনিবার | ২৫ এপ্রিল ২০২৬ | ১২ বৈশাখ ১৪৩৩

আত্মহত্যা!

প্রফেসর প্রকাশ চন্দ্র অধিকারী, মনোবিজ্ঞানী |
০১:৪৮ এ.এম | ২৫ এপ্রিল ২০২৬


নিজের ইচ্ছায় নিজের জীবন হরণ করার কাজটি অত্যন্ত জটিল। তারপর ও সমাজে আত্মহত্যা থেমে নেই। সাধারণত: দেখা যায় আত্মহত্যার সাথে কোন না কোন মানসিক ব্যাধি জড়িত। ব্যক্তির অন্তর্নিহিত মানসিক ব্যাধির সাথে আত্মহত্যা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আবার অনেকে মনে করেন যে, মানসিক ব্যাধি কোন সমস্যা নয় বরং ব্যক্তির ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য সমূহই আত্মহত্যার অন্যতম কারণ। আসলে ব্যক্তির কিছু ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য সমূহ যা মানসিক ব্যাধির তুলনায় বেশি মৌলিক এবং মানসিক ব্যাধিকেও অতিক্রম করে, সেই সব বৈশিষ্ট্য ব্যক্তিকে আত্মহত্যা প্রবন করে তুলতে বেশি সচেষ্ট ভূমিকা পালন করে।
আত্মহত্যার বৈশিষ্ট্য সমূহ: আত্মহত্যার (১) সাধারণ উদ্দ্যেশ্য হলো একটি সমস্যার সমাধান খোঁজা, (২) সাধারণ উদ্দীপক হলো অসহ্য মানসিক যন্ত্রণা (৩) সাধারণ আবেগ হলো আশাহীনতা (৪) সাধারণ প্রত্যক্ষণমূলক দৃষ্টিভঙ্গি হলো সংকোচন;  (৫) সাধারণ পারস্পরিক ক্রিয়া হলো আত্মহত্যার ইচ্ছাকে জানানো (৫) সাধারণ লক্ষ্য হলো চেতনার অবসান ঘটানো।
আত্মহত্যা ও ভবিষ্যৎদ্বাণী: আত্মহত্যার ইচ্ছার সাথে আশাহীনতার গভীর সম্পর্ক বিদ্যমান। যাদের মধ্যে আশাহীনতা শক্তিশালী নির্দেশক হিসেবে বর্তমান, তাদের সেই নির্দেশক আত্মহত্যার সম্ভাবনাকে গভীর ভবিষ্যৎদ্বাণী করণে শক্তিশালী আশঙ্কা হিসেবে কাজ করে। পরিবারের প্রতি দায়িত্বহীনতা, বন্ধু-বান্ধব বা পরিবার পরিজন হতে হঠাৎ সরে যাওয়া, ব্যক্তির অতিরিক্ত পীড়ন, প্রিয়জনের মৃত্যু, মৃত ব্যক্তিকে আত্মিকরণের প্রচেষ্টা ব্যক্তিকে আত্মহত্যা প্রবণ করে তোলে।
গবেষণা হতে দেখা যায় যে, কোন সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে যে সব ব্যক্তি অপেক্ষাকৃত অন্যান্য ব্যক্তির তুলনায় বেশি জড়তাগ্রস্ত, চিন্তা ধারার অপেক্ষাকৃত
কম নমনীয় বা কম পরিবর্তনশীল, তারা সমস্যা সমাধানে বিকল্প চিন্তা করতে ব্যর্থ হওয়ার দরুন বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আত্মহত্যা প্রবণ হয়ে উঠে। গবেষণায় আরো দেখা গেছে, যারা আত্মহত্যা করতে চেষ্টা করে, তারা অপেক্ষাকৃত কম দূরদর্শী এবং জীবন সম্পর্কে অনেকটাই উদাসীন ভাবাপন্নতা নিয়ে জীবনযাপন করতে অভ্যন্ত।
আত্মহত্যার কারণ: (১) ব্যক্তির ক্রোধ বর্হিমুখী না হয়ে অন্তমুর্খী হলে আত্মহত্যা প্রবণতা বেড়ে যায়। (২) অতীতের অন্যায়ের প্রায়শ্চিত করতে ব্যক্তি আত্মহত্যায় উদ্বুদ্ধ হয়ে থাকে। (৩) মৃত প্রিয়জনের সাথে মিলিত হওয়ার ইচ্ছা ব্যক্তিকে আত্মহত্যায় উদ্বুদ্ধ করতে পারে। (৪) পুনর্জন্ম লাভের চেষ্টা ব্যক্তিকে আত্মহত্যায় প্রলুব্দ করতে পারে। (৫) কোন পীড়ন থেকে মুক্তি পাওয়ার ইচ্ছা বা পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টার মানসিকতা ব্যক্তিকে আত্মহত্যায় উদ্বুদ্ধ করতে পারে। (৬) কোন বিষয়ের বিষময়তার কারণে অন্যের মধ্যে অপরাধবোধ সঞ্চালিত করে প্রতিশোধ নেওয়া চেষ্টা ব্যক্তিকে আত্মহত্যায় উদ্বুদ্ব করতে পারে। (৭) ব্যক্তি আবেগ শূন্য হলে অথবা ব্যক্তির প্রত্যক্ষণমূলক অবস্থা সংকোচিত হলে অনেক সময় আত্মহত্যা সমীচীন মনে করতে পারে। (৯) ব্যক্তি অসহায়ত্ববোধ করলে আত্মহত্যাপ্রবণ হয়ে উঠতে পারে। 
আত্মহত্যা প্রতিরোধ করণ: (১) সমস্যা সমাধোনের মাধ্যমে ব্যক্তির ভিতর অন্তর্নিহীত তীব্র মানসিক বেদনা ও কষ্টের অবসান ঘটানো। (২) ব্যক্তির চোখের সম্মুখ হতে বিলিন্ডার বা কল্পনার জগত হতে কালো চশমা সরিয়ে ফেলা যাতে সে অনস্তিত্ব ও অনন্ত দুঃখ কষ্ট ভোগ করা ছাড়া অন্য বিকল্প সম্পর্কে ভাবতে পারে- তার জন্য তাকে সাহায্য করা। (৩) ব্যক্তিকে আত্মহত্যার ধর্মীয় পরিণতি সম্পর্কে অবহীতি পূর্বক আত্ম বিধ্বংসী কাজ হতে সামান্য পরিমাণ হলেও পিছু হটতে বা বিরত থাকতে উৎসাহিত করা (৪)ব্যক্তিকে সংকটপূর্ণ চেতনা মোকাবেলার জন্য আগে থেকে বিকল্প পরিকল্পনা গ্রহণ করতে উদ্বুদ্ধ করা (৫) রোগীর প্রতি মনোযোগ বৃদ্ধি করা (৬) আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিরাজমান সমস্যা সমূহ সমাধানের পথ খোঁজা (৭) বিপদ মোকাবেলায় ধর্মীয় নির্দেশনা প্রতিপালনে তাগিদ দেওয়া;
পরিশেষে বলা যায়, আত্মহত্যা ব্যক্তি -পরিবার -দেশ-জাতী সবার জন্য দুঃখদায়ক যা কখনো কাম্য নয়। আত্মহত্যা মহাপাপ। একটি আত্মহত্যা একটি পরিবার, একটি সমাজ,একটি জাতীর বিষাদের ছায়া। তাই কারোর মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা দেখা গেলে, দেরি না করে একজন দক্ষ মনোবিজ্ঞানীর সহায়তা গ্রহণ করা যেতে পারে। সবাই সমস্বরে বলতে পরি-আত্মহত্যাকে ঘৃণা করি, নিজের জীবনকে সুন্দর করি। 
লেখক : অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, মনোবিজ্ঞান বিভাগ, সরকারি সুন্দরবন আদর্শ কলেজ, খুলনা। 

প্রিন্ট

আরও সংবাদ

অন্যান্য

প্রায় ১৭ ঘণ্টা আগে