খুলনা | শনিবার | ২৫ এপ্রিল ২০২৬ | ১২ বৈশাখ ১৪৩৩

“খুলনা জেলা সৃষ্টি এবং অতঃপর”

অ্যাড .এম. মাফতুন আহমেদ |
০১:৫০ এ.এম | ২৫ এপ্রিল ২০২৬


ভাঁটি বাংলার ভৈরব-কপোতাক্ষ-রূপসা নদ বিধৌত সবুজঘেরা বনাঞ্চলে জন্ম  নিয়েছেন জগৎখ্যাত অনেক কিংবদন্তী ব্যক্তিরা। ইতিহাসে অকাট্য প্রমাণ রয়েছে যে, রেণীর অত্যাচারে আজকের খুলনা জেলা সৃষ্টি হয়েছে। 
রেণীর অত্যাচারে যখন এ অঞ্চলের গোটা জনপদ বিপন্ন এবং আতঙ্কিত; তখন ১৮৭১ খ্রীস্টাব্দে দু’পক্ষের বাসগৃহের মধ্যবর্তী তালিমপুর ও শ্রীরামপুর গ্রামদ্বয়ের মধ্যে অবস্থিত একটি থানা সৃষ্টি হয়। 
পূর্বতন কিসমৎ খুলনা নতুন করে নয়াবাদ বা খুলনা থানা রূপে পরিচিত লাভ করে। পরে যথাক্রমে ১৮৪২ খ্রীস্টাব্দে খুলনা মহকুমা, ১৮৮২ খ্রীস্টাব্দে জেলা, ১৯৬৫ খ্রীস্টাব্দে বিভাগ সৃষ্টি হয়। মহকুমা অফিস স্থাপিত হওয়ায় উভয়ের পক্ষে স্বাধীনভাবে চলাফেরা মুশকিল হয়ে পড়ে। 
শিবনাথ ঘোষ এবং রেনীর মধ্যে পূর্বকার দ্বন্দ ছিল। রেণীকে পরামর্শ দিলেন, “সাহেব! এস.ডি.ও তোমার সজাতি, ওকে মির্জাপুর অফিস স্থানান্তরিত করতে বলো”। এ প্রস্তাবের পর কিছুদিনের মধ্যে মহকুমা অফিস বর্তমান খুলনা শহরে স্থানান্তরিত হয়। কুইন্সল্যান্ড সাহেবের মতে রেণীকে শাসনে রাখার জন্যই মহকুমার সৃষ্টি হয়। 
মহকুমা স্থাপনের কারণ প্রসঙ্গে মি. জেমস ওয়েস্টল্যান্ড তাঁর যশোর সংক্রান্ত রিপোর্টে উল্লেখ করেন যে, “-A subdivision, the first established in Bengal was set up here (Khulna) in 1842. It’s chief object was to hold in check mr. Rainey, who had Purchased a Zamindari in the vanity and resided at Nehalpur and who did not seen inclined to acknowledge the restraints of law.” 
মূূলত অত্যাচারী নীলকর মি. রেণী ও শিবনাথ ঘোষের ঠেলাঠেলিতে সৃষ্ট খুলনা। যা বাংলাদেশের সর্বপ্রথম মহকুমা। আর এর শুরু থেকে খুলনা শহর আন্তর্জাতিক লবণ বাণিজ্যের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৮৮২ খ্রীস্টাব্দের ২৫ এপ্রিল খুলনা জেলা সৃষ্টি সম্পর্কে এলাকায় একটি গ্রাম্য ছড়াও সাক্ষ্য দেয় যে, “রেণী সাহেব আর শিবনাথ ঘোষের ঠেলাতে। জেলা হ’ল খুলনাতে”।
খুলনা তখন দিল্লীর অধীন : দেশভাগ হলো। সৃষ্টি হলো দু’টি নতুন দেশ। হিন্দুদের জন্য হিন্দুস্তান, আর মুসলমানদের জন্য পাকিস্তান। দেশভাগে সারা পাকিস্তানের মানুষ আনন্দে উদ্বেলিত। দুর্ভাগ্য! 
খুলনার মানুষের মনে হরিষে বিষদ। বাউণ্ডারি নিয়ে বিরোধ। তাই খুলনা তখনও দিল্লীর অধীন। সারা পাকিস্তানে চাঁদতারা খচিত পতাকা উঠছে। কিন্তু ১৯৪৭ সালের ১৪-১৭ আগস্ট এই ৩ দিন খুলনার অলি গলিতে ভারতীয় পতাকা পতপত করে উঠছে। কী হবে, কী হতে যাচ্ছে এই উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠায় বিনিদ্র রজনীতে খুলনাবাসি। দেখা দিল নানা শঙ্কা। আমরা কী দিল্লীর অধীনে থেকে আবারও হা-হুতাশ করব? এক মহাদুর্যোগ। এই দুর্যোগ ঘনঘটায় কে এগিয়ে আসবেন।
এরই মধ্যে ইস্পাত কঠিন দৃঢ় প্রত্যয়ে এক ঝাঁক কাফেলা নিয়ে খুলনাবাসির মাঝে হাজির হলেন ভারতের নির্যাতিত নিষ্পেষিত তথা মুসলিম জনগোষ্ঠির অকৃত্রিম বন্ধু, ভালবাসার প্রতীক, বাংলার কৃতি সন্তান, পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের লীডার অব দি হাউস, সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী, (তথ্য, যোগাযোগ, পররাষ্ট্র) উপমহাদেশের অন্যতম বাগ্মি খান-এ-সবুর। খুলনাকে ভারতের রাহু থেকে মুক্ত করতে একদল তরতাজা যুবক সেদিন খান-এ-সবুরের নেতৃত্বে রাস্তায় নেমে পড়েছিলেন। ভারতীয় নেতৃত্বের সাথে দেন দরবার করেছিলেন। 
আইন-আদালতে দিকভ্রান্তের মত ছুটে গিয়েছিলেন। শুধু এক দফা, এক দাবি হিন্দুস্তানের রাহু থেকে খুলনাকে আশু মুক্ত করে পাকিস্তানভুক্তির জোরালো দাবি। তাঁরা সেদিন স্বপ্ন দেখেছিলেন, স্বপ্নের পেছনে অবিরাম গতিতে ছুটেছিলেন। উদ্দেশ্য একটাই; খুলনাবাসিকে দিল্লীর শৃঙ্খল থেকে যে কোন মূল্যে মুক্ত করতে হবে। 
হিন্দুস্তানের বিচার আদালতে আরজ পাকিস্তান আন্দোলনের নেতা মি. জিন্নাহ’র নির্দেশে খুলনার নেতৃবৃন্দ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে, খুলনা জেলার পক্ষ থেকে জেলা মুসলিম লীগের সভাপতি খান-এ-সবুর, সেক্রেটারি এস.এম.এ মজিদ ও খুলনার অন্যান্য নেতৃবৃন্দ কলকাতার আলীপুর বেলভেডিয়ার সীমানা কমিশনের নিকট আরজি পেশ করতে যাবেন। 
যাদের ছিল অসামান্য অবদান : খান-এ-সবুর খুলনাকে পাকিস্তানভুক্তির ব্যাপারে সেদিন দুঃসাহসিক এক কৌশলী ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন। তিনি তখন কলকাতায় অবস্থান করছিলেন; উকিলব্যারিস্টারদের সাথে শলা-পরামর্শ করছিলেন। অতঃপর নিখিল বঙ্গ মুসলিম লীগের পক্ষে নিয়োজিত আইনজীবী হামিদুল হক চৌধুরী জুন মাসেই বিচার আদালতের কাছে খুলনার পাকিস্তানভুক্তির আবেদন পেশ করেন। 
তাঁর সহযোগি হিসেবে ছিলেন এলাহাবাদ হাইকোর্টের আইনজীবী মহম্মদ ওয়াসীম। “আরজি পেশের দিন বেলভেডিয়া ভবনে খান-এ-সবুর, ডাঃ মোজাম্মেল হোসেন, হিমায়েত উদ্দিন (রোকা মিয়া), আবদুল হক চৌধুরি, এস.এম.এ মজিদ, এড. সৈয়দ শামসুর রহমান (যশোর), মোস্তাগাওসুল হক, এ.এফ.এম আব্দুল জলিল” সহ খুলনা মুসলিম লীগের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন”।
এই মামলার শুনানিতে শেষ পর্যায়ে শেরে বাংলা এ. কে ফজলুল হক ও তাঁর সহকারি এ.এস. এম সায়েম অংশগ্রহণ করেছিলেন। তাঁরা সফলতার পরিচয় দিয়েছিলেন। এই সায়েম সাহেব পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম প্রধান বিচারপতি ও রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন। খান-এ-সবুরের ভূমিকা সেদিন খুলনার জমিদার শৈলেন ঘোষ, জমিদার মহেন্দ্র ঘোষসহ হিন্দু নেতাদের ষড়যন্ত্রকে এ.কে ফজলুল হক রাষ্ট্রপতি এ.এম.এম সায়েম এই সেই কলকাতার বেলভেডিয়া ভবন যেখানে ১৮ আগস্ট ১৯৪৭ সালে খুলনার ভাগ্য নির্ধারিত হয়েছিল প্রতিহত করে হুলিয়া মাথায় নিয়ে মুসলীম জনগোষ্ঠিকে ঐক্যবদ্ধ করলেন।  
মমতাময়ী মা সবুরুন্নেসার নিকট কলকাতা যাবার পূর্ব মুহূর্তে তিনি বলেছিলেন, “যদি খুলনা (খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট) পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করতে পারি তবেই মা তোমার কোলে ফিরে আসবো”। সবুর সাহেব সেই থেকে খুলনাকে ভারতের নাগপাশ থেকে মুক্ত করার আন্দোলনে মাঠে নেমে পড়লেন।
আগেই উল্লেখ করেছি পশ্চিম পাকিস্তানের গুরুদাসপুর এবং তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের খুলনা সামগ্রিকভাবে ১৪ আগস্টের ঘোষণার পরেও হিন্দুস্তানের অন্তর্ভূক্ত থাকে। সারা খুলনায় তখন হিন্দুস্থানের পতাকা অফিস-আদালত তথা বাড়িতে বাড়িতে উড়তে থাকে। ১৯৪৭ সালের ঐতিহাসিক জুন ঘোষণায় বড়লাট লর্ড লুই মাউন্টব্যাটেন খুলনাকে পাকিস্তানের বহির্ভূত রেখে বিবৃতি প্রদান করেন।
ফলে ১৪ আগস্ট থেকে ১৭ আগস্ট পর্যন্ত খুলনা ছিল হিন্দুস্তানের নিয়ন্ত্রিত পশ্চিম বাংলার একটি জেলা মাত্র। এই ৩ দিন খুলনা জেলার মানুষের চোখে মুখে যেন ছিল বিষাদের কালো ছায়া। খান-এসবুর তখন বাংলা আইন পরিষদের সদস্য। এ অঞ্চলের মাটি-মানুষ সম্পর্কে তাঁর স্বচ্ছ ধারণা রয়েছে। তিনি বসে থাকেননি। জান প্রাণ বাজি রেখে খুলনাকে পাকিস্তানভুক্তির দাবি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। ছুটে গেলেন দিল্লির রাজ দরবারে। অনেক বোঝাপড়া করলেন। নানা যুক্তিতর্ক তুলে ধরলেন। আইনজীবী নিয়োগ করলেন। 
অতঃপর বাউণ্ডারি কমিশনের কাছে আপিল পেশ করলেন। খান-এ-সবুরের নেতৃত্বে এক ঝাঁক উদীয়মান ঝান্ডাবাহী তরুণদের নেতৃত্বে প্রতীক্ষিত খুলনাবাসির আশা পূর্ণ হলো। অবশেষে খান এ-সবুর সেদিন খুলনাবাসির হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছিলেন। জীবনযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে মৃত্যুর পরোয়ানা মাথায় নিয়ে তিনি খুলনাকে পরাধীন মুক্ত করেন। স্বাধীন খুলনার এই অজানা ইতিহাস আজকের প্রজন্ম অনেকে জানে না। তাঁদেরকে জানান হয় না। শুধু ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট থেকে ১৭ আগস্ট এই ৩ দিন স্মৃতি হয়ে থাকবে। 

লেখক : সম্পাদক আজাদ বার্তা, কলামিস্ট ও আইনজীবী।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ

অন্যান্য

প্রায় ১৭ ঘণ্টা আগে