খুলনা | রবিবার | ২৬ এপ্রিল ২০২৬ | ১৩ বৈশাখ ১৪৩৩

যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি দুই পিএইচডি শিক্ষার্থীকে খুন পূর্বপরিকল্পিত, খুনি রুমমেট : পুলিশ

খবর প্রতিবেদন |
০১:৪১ এ.এম | ২৬ এপ্রিল ২০২৬


যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার (ইউএসএফ) দুই নিখোঁজ বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থীর রহস্যময় অন্তর্ধানের ঘটনা চাঞ্চল্যকর মোড় নিয়েছে। নিখোঁজের এক সপ্তাহ পর স্থানীয় সময় শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) সকালে টাম্পা বে এলাকার হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজের ওপর থেকে ২৭ বছর বয়সী জামিল আহমেদ লিমনের নিথর দেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় লিমনের রুমমেট হিশাম আবুঘারবিয়েহকে (২৬)  গ্রেফতার করে তাঁর বিরুদ্ধে পূর্বপরিকল্পিত ভাবে জোড়া খুনের অভিযোগ এনেছে হিলসবরো কাউন্টি শেরিফ কার্যালয়। তবে লিমনের সঙ্গে নিখোঁজ হওয়া অপর শিক্ষার্থী নাহিদা বৃষ্টি (২৭)-এর এখনো নিখোঁজ থাকলেও পুলিশ ধারণা করছে তিনিও নিহত হয়েছেন। 
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন হিলসবরো কাউন্টি শেরিফ চ্যাড ক্রনিস্টারের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) ট্যাম্পা বের হাওয়ার্ড ফ্রাঙ্কল্যান্ড ব্রিজ থেকে লিমনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ময়নাতদন্তকারী দল লিমনের মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানে কাজ করছে। লিমনের বন্ধু নাহিদা বৃষ্টির সন্ধানেও ওই ব্রিজের পাশে সমুদ্রের তলদেশে ডাইভ টিম দিয়ে অনুসন্ধান চালানো হচ্ছে।
পুলিশ নাহিদার পরিবারকে জানিয়েছে, লিমন ও অভিযুক্ত হিশামের শেয়ার করা এ্যাপার্টমেন্টে বিপুল পরিমাণ রক্তের চিহ্ন পাওয়া গেছে। সেই রক্তের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করেই গোয়েন্দাদের আশঙ্কা নাহিদা আর বেঁচে নেই। 
নাহিদার ভাই জাহিদ প্রান্ত সিএনএনকে বলেন, ‘পুলিশ আমাদের জানিয়েছে, লিমনের বাসায় প্রচুর রক্ত পাওয়া গেছে, যা থেকে নাহিদাও নিহত হয়েছেন বলে তাঁরা মনে করছেন।’
এদিকে শুক্রবার সকালে হিশামের পারিবারিক বসতি থেকে একটি সহিংসতার ফোনকল পাওয়ার পর পুলিশ সেখানে পৌঁছালে চরম উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। হিশাম নিজেকে ঘরের ভেতর ব্যারিকেড দিয়ে আটকে রাখেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশের বিশেষায়িত সোয়াত টিম এবং ক্রাইসিস নেগোশিয়েটরদের তলব করা হয়। দীর্ঘক্ষণ অবরুদ্ধ থাকার পর হিশাম হাত উঁচু করে আত্মসমর্পণ করেন।
গ্রেফতারের পর হিশামের বিরুদ্ধে শারীরিক নির্যাতন, অবৈধভাবে বন্দি রাখা, তথ্য-প্রমাণ লোপাট, মৃত্যুর খবর না দেওয়া এবং বেআইনিভাবে মরদেহ সরানোর মতো একাধিক গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে। পুলিশের ভিডিওচিত্রে দেখা যায়, হিশামকে হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
তদন্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ২৬ বছর বয়সী হিশাম আবুঘারবিয়েহ ইউএসএফ-এর সাবেক ছাত্র। এর আগেও ২০২৩ সালে দু’বার তাঁর বিরুদ্ধে শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছিল। হিশামের আপন ভাই তাঁর বিরুদ্ধে আদালতে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে আবেদন করেছিলেন। সেই আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল, হিশাম তাঁর মা এবং ভাইয়ের ওপর আক্রমণ করেছেন। যদিও পরে কিছু মামলা খারিজ হয়ে যায়, তবে তাঁর সহিংস আচরণ গোয়েন্দাদের নজরদারিতে ছিল। লিমনের মরদেহ উদ্ধারের আগে হিশামকে দু’বার জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও তিনি পরে পুলিশের সঙ্গে অসহযোগিতা শুরু করেন।
অভিযুক্ত হিশাম আবুঘার’িয়েহ ইউএসএফর সাবেক শিক্ষার্থী। লিমনের মরদেহ উদ্ধারের পর শুক্রবার সকালে তাঁকে তাঁর বাড়ি থেকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের সময় তিনি নিজেকে ঘরের ভেতরে অবরুদ্ধ করে রাখলে সোয়াট টিম এবং ক্রাইসিস নেগোশিয়েটরদের ডাকতে হয়। পরে একটি সাঁজোয়া যান বাড়ির সামনে হাজির হলে তিনি হাত তুলে আত্মসমর্পণ করেন। হিশামের বিরুদ্ধে এর আগে নিজের মা ও ভাইকে মারধরের অভিযোগ এবং পারিবারিক সহিংসতার একাধিক মামলা ছিল।
লিমনের ভাই জুবায়ের আহমেদ-এর আগে জানিয়েছিলেন, লিমনের পরিকল্পনা ছিল গবেষণার কাজ শেষে বাংলাদেশে ফিরে শিক্ষকতা করা। তিনি বলেন, ‘আমরা পাথর হয়ে গেছি। আমরা শুধু সত্যিটা জানতে চেয়েছিলাম। দু’জন শিক্ষার্থী এভাবে হঠাৎ কোথাও উধাও হয়ে যেতে পারে না।’
লিমনের মরদেহ উদ্ধারের পর থেকেই নিখোঁজ নাহিদা বৃষ্টির পরিণতি নিয়ে চরম উৎকণ্ঠা ছিল। 
শনিবার সকালে বৃষ্টির ভাই জাহিদ হাসান প্রান্ত ফেসবুক পোস্টে তাঁর বোনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে লিখেছেন, ‘আমার বোন আর আমাদের মাঝে নেই।’ তবে প্রতিবেদনটি লেখা পর্যন্ত মার্কিন পুলিশ বৃষ্টির মরদেহ উদ্ধার বা তাঁর মৃত্যুর বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা দেয়নি। নাহিদা একই বিশ্ববিদ্যালয়ের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে পিএইচডি করছিলেন।
গত ১৬ এপ্রিল সকাল ৯টার দিকে জামিল লিমনকে তাঁর ক্যাম্পাসের বাইরের বাসভবনের সামনে শেষবারের মতো দেখা যায়। এর ঠিক এক ঘণ্টা পর সকাল ১০টার দিকে নাহিদা বৃষ্টিকে ক্যাম্পাসের ন্যাচারাল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেস বিল্ডিংয়ের কাছে দেখা গিয়েছিল। ১৭ এপ্রিল তাঁদের কোনো খোঁজ না পেয়ে একজন পারিবারিক বন্ধু পুলিশকে খবর দেন। এরপর থেকেই ফ্লোরিডার স্থানীয় পুলিশ ও এফবিআই এই অনুসন্ধানে যুক্ত হয়। গত বৃহস্পতিবার পুলিশ এই নিখোঁজ সংবাদটিকে ‘বিপদগ্রস্ত’ হিসেবে চিহ্নিত করে।
জামিল লিমন ইউএসএফ-এ ভ‚গোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগে পিএইচডি করছিলেন। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল-কীভাবে জেনারেটিভ এআই (যেমন: চ্যাটজিপিটি, জেমিনি ইত্যাদি) ব্যবহার করে দক্ষিণ ফ্লোরিডার ক্রমহ্রাসমান জলাভ‚মি পর্যবেক্ষণ করা যায়। তাঁর ভাই জুবায়ের আহমেদ কান্নায় ভেঙে পড়ে সিএনএন-কে বলেন, ‘আমার ভাই অত্যন্ত বিনয়ী এবং হাসিখুশি মানুষ ছিল। আমরা একদম নিস্তব্ধ হয়ে গেছি। দু’টি শিক্ষার্থী এভাবে হঠাৎ করে হারিয়ে যেতে পারে না।’
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, জামিল ও নাহিদা বৃষ্টির মধ্যে বিয়ের আলোচনা চলছিল। লিমনের পরিকল্পনা ছিল এই গ্রীষ্মেই বাংলাদেশে ফিরে পরিবারের সঙ্গে দেখা করা এবং পিএইচডি শেষে দেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করা।
লিমনের মরদেহ পাওয়া গেলেও নাহিদা বৃষ্টির কোনো হদিস না মেলায় পুরো বাংলাদেশি কমিউনিটিতে উদ্বেগ বাড়ছে। শেরিফ চাড ক্রনিস্টার বলেছেন, ‘এটি একটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক ঘটনা। আমরা বৃষ্টির নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের জন্য প্রতিটি সূত্র খতিয়ে দেখছি।’ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট মোয়েজ লিমায়েম শোক প্রকাশ করে বলেন, ‘আমাদের কর্মী ও শিক্ষকবৃন্দ শিক্ষার্থীদের পরিবারের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছেন। আমরা সবাই নাহিদার জন্য প্রার্থনা করছি।’
মেডিকেল এক্সামিনার বর্তমানে লিমনের মৃত্যুর সঠিক কারণ নির্ণয়ে কাজ করছেন। ময়নাতদন্তের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন পেলে বোঝা যাবে লিমনের ওপর ঠিক কীভাবে হামলা চালানো হয়েছিল এবং নাহিদা বৃষ্টির নিখোঁজ থাকার সঙ্গে এর সম্পর্ক ঠিক কতখানি।
ইউনিভার্সিটির প্রেসিডেন্ট মোয়েজ লিমায়েম এই ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন এবং নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে সব ধরনের সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন। বর্তমানে হিশাম আবুঘারবিয়েহকে কারাগারে রাখা হয়েছে এবং তাঁর বিরুদ্ধে পূর্বপরিকল্পিতভাবে দু’জনকে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ