খুলনা | সোমবার | ২৭ এপ্রিল ২০২৬ | ১৪ বৈশাখ ১৪৩৩

চারিদিকে শুধুই সংকট, পরিচালনায় হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ

নানা প্রতিকূলতার মধ্যে দিয়ে চলছে খুলনা বিভাগের উপকূলীয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সেবা কার্যক্রম

নিজস্ব প্রতিবেদক |
১২:০৭ এ.এম | ২৭ এপ্রিল ২০২৬


খুলনা বিভাগের সরকারি স্বাস্থ্য সেবার বর্তমানে বেহাল দশা। নামমাত্র জনবল, জরাজীর্ণ ভবন ও ডরমেটরি আর চিকিৎসক-কর্মচারি সংকটে জনগণ স্বাস্থ্য সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বিশেষ করে খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরার উপকূলীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোর অবস্থা আরও করুন। দীর্ঘদিন এ অব্যবস্থাপনা চলতে থাকলেও প্রতিকারের কোনো পদক্ষেপ নেই সংশ্লিষ্ট উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের। এ বিভাগের ১০ জেলায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসমূহে ডাক্তারদের মঞ্জুরিকৃত পদের ৫০ শতাংশই শূন্য। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির জনবলের ক্ষেত্রে মঞ্জুরিকৃত পদের ৭০ শতাংশ জনবল শূন্য। ফলে এ সকল প্রতিষ্ঠানের সেবার মান নিয়ে প্রতিনিয়ত প্রশ্ন উঠলেও কর্তৃপক্ষের নীরব হয়েই থাকতে হয়। তবে নতুন সরকারের অধীনে সমস্যা সমাধান হবে এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দীর্ঘ বছর যাবৎ নানা প্রতিকূলতার মধ্যে দিয়ে খুলনা বিভাগের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসমূহের সেবা কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে কর্তৃপক্ষ। অধিকাংশ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ভবন জরাজীর্ণ আর চিকিৎসকদের ডরমেটরির বেহাল দশা। এছাড়া চিকিৎসক, ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণির জনবল সংকটও চরমে। উপকূলীয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সমূহের সার্বিক ব্যবস্থাপনার চিত্র আরো জটিল। 
বাগেরহাট : জেলার উপকূলীয় উপজেলা শরণখোলায় মিষ্টি পানির তীব্র সংকট ও নানা প্রতিকূলতার মধ্যে দিয়ে চলছে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্যসেবা। সরেজমিন দেখা যায়, প্রায় ২ লাখ জনগোষ্ঠীর জন্য ৫০ শয্যার হাসপাতালটিতে প্রতিদিন গড়ে ৬০ জনের উপরে রোগী ভর্তি থাকে। এছাড়া বহিঃর্বিভাগে গড়ে প্রতিদিন ৪শ’ জনের উপরে রোগী আসে। রোগীদের সাথে স্বজনেরা থাকে। ফলে হাসপাতালটিতে কর্মকর্তা কর্মচারীসহ আন্তঃবিভাগ ও বহিঃবিভাগের রোগী ও সাথে আসা স্বজন মিলিয়ে প্রতিদিনই ১৫-১৬শ’ লোকের সমাগম থাকে। অথচ পরিচ্ছন্নতা ও পয়ঃনিষ্কাশন কর্মী না থাকায় ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতে প্রতিনিয়ত হিমশিম খেতে হচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে। এছাড়া হাসপাতাল ভবনটিও জরাজীর্ণ। বিভিন্ন জায়গা থেকে পলেস্তারা প্রতিনিয়ত খুলে খুলে পড়ছে। চিকিৎসকদের ডরমেটরির অবস্থা খুবই খারাপ। সেখানেও ছাদ থেকে পলেস্তারা খুলে পড়ছে। দৈনন্দিন পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজে ব্যবহৃত একমাত্র মিষ্টি পানির উৎস হাসপাতালের ভিতরের পুকুরটি দীর্ঘদিন সংস্কারের অভাবে ভরাট হয়ে গেছে। যার ফলে গরমের সময় পুকুরটিতে পানি থাকে না। ফলে তীব্র লবণাক্ত পানি দিয়ে দৈনন্দিন সকল কাজ সারতে হচ্ছে। সবকিছু মিলিয়ে এক কঠিন প্রতিকূলতা ও প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়ে চলছে হাসপাতালটির কার্যক্রম। বর্ষাকালে হাসপাতালের প্রায় ৭০ শতাংশ জায়গায় তৈরি হয় জলাবদ্ধতা। ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনা ভেঙে পড়ায় দীর্ঘদিনের এই সমস্যাটি এখনো সমাধান হয়নি।
সার্বিক বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ প্রিয় গোপাল বিশ্বাস বলেন, হাসপাতালটির অবকাঠামগত সমস্যা, ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণির জনবল সংকট, ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনা, মিষ্টি পানির উৎসের সমস্যা গুলো দীর্ঘদিনের। আমি বিভিন্ন ফোরামে দীর্ঘদিন যাবৎ বলে আসছি এবং যোগদানের পর থেকেই সার্বিক বিষয়ে লেখালেখি করে আসছি। তবে এখনো পর্যন্ত সমস্যার তেমন কোন সমাধান মেলেনি। প্রায় একই চিত্র উপকূলীয় উপজেলা রামপাল, কয়রা ও পাইকগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের।
উপকূলীয় উপজেলা রামপালের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডাঃ সুকান্ত বলেন, প্রায় ২ লাখ জনসংখ্যার এ উপজেলায় ৫০ শয্যার হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ৬০ থেকে ৬৫ জন রোগী ভর্তি থাকে। জরুরি বিভাগ ও বহিঃর্বিভাগে স্বাস্থ্য সেবা নিতে আসে আরো ৪ থেকে ৫শ’ জন। একই সাথে রোগীর স্বজনরা থাকে। সব মিলিয়ে ১৫ থেকে ১৬শ’ লোক প্রতিদিন হাসপাতাল কম্পাউন্ডে আসে। তিনি বলেন, চিকিৎসক সংকটতো রয়েছে, পাশাপাশি তৃতীয় ও ৪র্থ শ্রেণির জনবল সংকটের কারণে প্রতিনিয়ত পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতাসহ পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা নিশ্চিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এছাড়া  চিকিৎসকদের ডরমেটরি সংকটের কারণে রুম শেয়ারিং করে চিকিৎসকরা বসবাস করছেন। ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণির কর্মচারী ও নার্সদের ডরমেটরির কোনো  ব্যবস্থা নেই। আমি আমার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে সমস্যাগুলো নিয়মিত জানিয়ে আসছি। তিনি আরো বলেন, বর্তমানে আরেকটি সমস্যা এখানে যোগ হয়েছে। সারাদেশে চলমান লোডশেডিং-এর প্রভাব আমার হাসপাতালেও পড়েছে। আইপিএস নেই, জেনারেটর থাকলেও তেলের কোন ব্যবস্থা নেই। ফলে ওয়ার্ডে রোগীদের যেমন গরমে কষ্ট হচ্ছে একইভাবে চিকিৎসক, কর্মকর্তা, কর্মচারী সবাই গরমে কষ্ট করে দায়িত্ব পালন করছে। তবে বড় সমস্যা হচ্ছে প্যাথলজিতে। বিদ্যুৎ না থাকলে পরীক্ষা-নিরীক্ষাগুলোর রিপোর্ট সময়মতো দেওয়া যাচ্ছে না। ফলে সেবা প্রত্যাশীদের ভোগান্তি হচ্ছে। 
খুলনা : জেলার উপকূলীয় পাইকগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ আহসানারা বিনতে আহমেদ বলেন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রতিদিন ৭০/৮০ জন রোগী ভর্তি থাকে। জরুরি বিভাগ, আন্তঃবিভাগ ও বহির্বিভাগে গড়ে ৫০০ রোগী প্রতিদিন স্বাস্থ্য সেবা নিতে আসে। সাথে রোগী স্বজনেরা থাকে। এছাড়া কর্মকর্তা-কর্মচারী মিলিয়ে হাসপাতাল কম্পাউন্ডে প্রায় ২ হাজার লোকের প্রতিদিন সমাগম থাকে। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসকসহ ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণির জনবলের চরম সংকট রয়েছে। পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা, পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিতে প্রতিদিন হিমশিম খেতে হয়। এছাড়া চলমান লোডশেডিংয়ে প্রচন্ড ভোগান্তিতে স্বাস্থ্য সেবা প্রদান করতে হচ্ছে। সেবা প্রত্যাশী রোগী ও কর্মরত চিকিৎসক, কর্মকর্তা-কর্মচারী সবাই তীব্র গরমে অস্বস্তি ভোগ করছে। 
তিনি বলেন, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটিতে আইপিএস নেই। নামমাত্র ১টি জেনারেটর আছে। যার মাধ্যমে শুধুমাত্র ওটি রুমের কার্যক্রম চালানো যায়। চিকিৎসকদের ডরমেটরি বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে অনেক আগেই। এছাড়া হাসপাতাল ভবনের ছাদ থেকে পানি ভেতরে প্রবেশ করে। বিভিন্ন জায়গা থেকে পলেস্তারা খুলে খুলে পড়ছে। দ্রুত সংস্কার করা প্রয়োজন। 
প্রায় একই চিত্র উপকূলীয় উপজেলা কয়রা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের। উপজেলা স্বাস্থ্য ও প প কর্মকর্তা ডাঃ মোঃ রেজাউল করীম জানান ২০ শয্যার ভবনে চলছে ৫০ শয্যার সেবা কার্যক্রম। ৩০ শয্যার ভবনের নির্মাণ কাজ শুরু হয়েও বন্ধ হয়ে গেছে ৩ বছর আগে। চিকিৎসক সংকট তো রয়েছেই। পাশাপাশি ৩য় ও ৪র্থ চতুর্থ শ্রেণির জনবলের রয়েছে চরম সংকট। চিকিৎসকদের ডরমেটরি থাকার উপযোগি না হলেও কোনরকম ঝুঁকি নিয়েই জরাজীর্ণ ডরমেটরিতে রুম শেয়ারিং করে চিকিৎসকরা থাকছেন। পরিবার-পরিজন দূরে রেখে উপকূলীয় উপজেলাতে স্বাস্থ্য সেবা দিয়ে যাচ্ছেন চিকিৎসকরা। 
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এমন চিত্র খুলনা বিভাগ জুড়েই। এসব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে জেলা সদর হাসপাতালের দূরত্ব প্রায় ৮০ থেকে ১০০ কিঃমি। ফলে নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা উপকূলীয় অঞ্চল সমূহে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সমূহের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় জনবলের ব্যবস্থা, ২৪ ঘন্টা বিদ্যুৎ বা বিকল্প বিদ্যুৎ ব্যবস্থা নিশ্চিত করার মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবার  প্রতিবন্ধকতা দূর করা । 
সার্বিক বিষয়ে খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য উপ-পরিচালক ডাঃ মোঃ মুজিবুর রহমান বলেন, বিষয়গুলো আমি অবগত আছি। খুলনা বিভাগের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সমূহের সমস্যা নিয়ে মন্ত্রণালয়ে বৈঠক হয়েছে। সরকার নতুন করে সারাদেশে ১ লক্ষ জনবল নিয়োগ করবে আশা করছি। জনবল নিয়োগ হলে ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণির জনবল সংকট কেটে যাবে। এছাড়া জরজীর্ণ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ভবনসহ চিকিৎসক, নার্স, ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ডরমেটরি পর্যায়ক্রমে নির্মাণ ও সংস্কার  করা হবে। বিদ্যুতের সমস্যা সমাধানে এইচইডির সাথে কথা বলে বিকল্প বিদ্যুৎ ব্যবস্থার জন্য আলোচনা চলছে বলে তিনি জানান।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ