খুলনা | সোমবার | ২৭ এপ্রিল ২০২৬ | ১৪ বৈশাখ ১৪৩৩

তুরস্কের প্রস্তাবিত ৪ দেশীয় সামরিক জোট নিয়ে সতর্ক অবস্থানে সৌদি-মিসর

খবর প্রতিবেদন |
০২:২৩ এ.এম | ২৭ এপ্রিল ২০২৬


ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যসহ পুরো অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ দ্রুত বদলে যাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে তুরস্ক, সৌদি আরব, মিসর ও পাকিস্তানকে নিয়ে একটি নিরাপত্তা জোট গঠনের জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে আঙ্কারা। আঙ্কারার দীর্ঘদিনের লক্ষ্য ছিল পশ্চিমা বিশ্বের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আঞ্চলিক অস্থিরতা মোকাবিলায় একটি নিজস্ব কাঠামো তৈরি করা। তবে প্রস্তাবিত এই চারদেশীয় সামরিক জোট গঠনের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দেশগুলোর ভিন্ন ভিন্ন হুমকি-সংক্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গি, রাজনৈতিক মতপার্থক্য এবং সামরিক সক্ষমতার ব্যবধান।
২০২৫ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সৌদি আরব ও পাকিস্তান একটি কৌশলগত প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে, যেখানে একে অন্যের ওপর আক্রমণকে নিজেদের ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য করার বিধান রাখা হয়েছে। ওয়াশিংটনের প্রভাব কমে আসছে, এমন উপলব্ধির পর সৌদি আরব তাদের সামরিক অংশীদারত্ব বাড়ানোর যে উদ্যোগ নিয়েছে, এই চুক্তি তারই অংশ। এরপর থেকেই তুরস্ক এই কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হওয়ার একক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ফেব্র“য়ারিতে প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোয়ানের সৌদি সফরের সময় বিষয়টি সরাসরি আলোচ্যসূচিতে না থাকলেও ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই তুরস্ক তাদের কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়ে দেয়।
তুরস্কের এই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা কেবল কূটনৈতিক আলোচনার টেবিলে আটকে আছে। বিশ্লেষকদের মতে, দেশগুলোর মধ্যে গভীর ঐতিহাসিক সন্দেহ ও ভূ-রাজনৈতিক ভিন্নতা দূর না হওয়া পর্যন্ত এই সামরিক জোটকে বাস্তবে রূপ দেওয়া অত্যন্ত কঠিন একটি কাজ।
গত ১৭ থেকে ১৯ এপ্রিল অনুষ্ঠিত আন্তালিয়া কূটনৈতিক ফোরামের সাইডলাইনে চার দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বৈঠকে বসেন। এটি ছিল ইসলামাবাদ (২৯ মার্চ) ও রিয়াদের পর তাদের তৃতীয় বৈঠক। এই জোট বাস্তবায়িত হলে পূর্ব ভূমধ্যসাগর থেকে ভারত মহাসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত একটি বিশাল শক্তি বলয় তৈরি হবে। ওয়াশিংটনভিত্তিক ফিন্যান্সিয়াল ইন্ডাস্ট্রি রেগুলেটরি অথরিটির বিশ্লেষক জিশান শাহ বলেন, ‘এই চারদেশীয় জোটের অর্থ হবে, গত ১০০ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো আঞ্চলিক দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিজেরাই নিচ্ছে।’
বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, এই চার দেশের মোট জনসংখ্যা প্রায় ৫০ কোটি এবং তাদের সম্মিলিত জিডিপি ৩.৩ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি। তাদের রয়েছে বিশাল সামরিক বাহিনী এবং জ্বালানি তেলের নিয়ন্ত্রণ।
প্রস্তাবিত এই জোটের সম্ভাবনা থাকলেও সৌদি আরব ও মিসর এই বিষয়ে বেশ সতর্ক। এর পেছনে রয়েছে বেশ কিছু জটিল চ্যালেঞ্জ।
ইরান ইস্যুতে দেশগুলোর দৃষ্টিভঙ্গিতে বড় ফারাক রয়েছে। সৌদি আরব সরাসরি ইরানের হামলার শিকার হওয়ায় তাদের হুমকি-সংক্রান্ত ধারণা বেশ কঠোর। বিপরীতে, তুরস্ক ও পাকিস্তান ইরানের সঙ্গে কাজের সম্পর্ক বজায় রেখেছে। এই ভিন্নতা একটি ঐক্যবদ্ধ কৌশলগত মতাদর্শ তৈরির পথে বড় বাধা।
আঙ্কারা ইসরায়েলের কঠোর সমালোচনা করছে, অন্যদিকে পাকিস্তানের মন্ত্রী খাজা আসিফ এ মাসেই ইসরায়েলকে ‘অশুভ’ ও ‘মানবতার জন্য অভিশাপ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। যদিও পরে তিনি ওই পোস্ট মুছে ফেলেন। এরদোয়ানও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গাজায় ‘গণহত্যার’ অভিযোগ তুলেছেন। এই পরিস্থিতিতে ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, তুরস্কের নেতৃত্বাধীন এই প্রচেষ্টা মূলত একটি ‘চরমপন্থি সুন্নি অক্ষ’ তৈরি করছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইঙ্গিত দিয়েছেন, তিনি এই নতুন সমীকরণকে সন্দেহের চোখেই দেখছেন।
তুরস্ক ন্যাটোর সদস্য। ন্যাটোর অনুচ্ছেদ ৫ অনুযায়ী, জোটের কোনও সদস্যের ওপর হামলা হলে সবাই সম্মিলিতভাবে সাড়া দেবে। এই পরিস্থিতিতে তুরস্ক যদি ন্যাটোর বাইরে কোনও ব্লকে যোগ দেয়, তবে তা গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান ও সমন্বয় নিয়ে পশ্চিমা মিত্রদের সঙ্গে বিরোধ বা সংঘর্ষ তৈরি করতে পারে।
দীর্ঘ সময় ধরে তুরস্কের সঙ্গে মিসর ও সৌদি আরবের সম্পর্ক বেশ শীতল ছিল। ২০১৩ সালে মিসরের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর থেকে তুরস্কের সঙ্গে মিসরের সম্পর্ক এক দশকের জন্য ভেঙে গিয়েছিল। যদিও ২০২০ সালের পর থেকে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা চলছে এবং ২০২৫ সালে তুরস্ক-মিসর সামরিক চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে, তবু পুরনো অবিশ্বাস পুরোপুরি কাটেনি।
জোট গঠনের পথে আরেকটি বড় বাধা হলো সামরিক সামঞ্জস্যহীনতা। চার দেশের মধ্যে যৌথ মহড়া বা সম্মিলিত কমান্ড কাঠামোর অভাব রয়েছে। জিশান শাহের মতে, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে সামরিক স্তরে ভালো সমন্বয় থাকলেও সৌদি আরবের সঙ্গে তুরস্ক বা মিসরের তেমন গভীর সম্পর্ক নেই। এ ছাড়া যুদ্ধের অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রেও আকাশ-পাতাল পার্থক্য রয়েছে। তুরস্ক সিরিয়া, লিবিয়া, আজারবাইজান ও ইউক্রেনে সরাসরি যুক্ত থেকে যুদ্ধের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। পাকিস্তানও ভারত ও আফগানিস্তান সীমান্ত নিয়ে নিয়মিত চাপে থাকে। বিপরীতে, সৌদি আরব ও মিসরের সা¤প্রতিক প্রত্যক্ষ যুদ্ধের অভিজ্ঞতা সীমিত।
জিশান শাহ সতর্ক করে বলেন, ‘এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যেখানে তুরস্ক ও পাকিস্তানকে প্রাথমিক যুদ্ধের বড় বোঝা বহন করতে হবে, যতক্ষণ না মিসর ও সৌদি আরব তাদের সামরিক মান উন্নত করতে পারছে।’

প্রিন্ট

আরও সংবাদ