খুলনা | সোমবার | ২৭ এপ্রিল ২০২৬ | ১৪ বৈশাখ ১৪৩৩

যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি শিক্ষার্থী হত্যা

চ্যাটজিপিটিতে লাশ গুমের উপায় জানতে চান অভিযুক্ত, মিললো চাঞ্চল্যকর তথ্য

খবর প্রতিবেদন |
০৩:৩৪ পি.এম | ২৭ এপ্রিল ২০২৬

 

যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডায় (ইউএসএফ) অধ্যয়নরত দুই বাংলাদেশি শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমন ও নাহিদা সুলতানা বৃষ্টিকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় প্রতিনিয়ত মিলছে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। জানা গেছে, ওই দুই বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থীকে হত্যার দায়ে অভিযুক্ত হিশাম আবুঘরবেহ এআই চ্যাটবট চ্যাটজিপিটি’র কাছে লাশ ব্যাগে ভরে ডাস্টবিনে ফেলে দেয়ার বিষয়ে জানতে চেয়েছিলেন।

আদালতের একটি নথিতে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে বলে জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসি।

২৬ বছর বয়সি হিশামকে জামিল লিমন এবং নাহিদা বৃষ্টিকে হত্যার দায়ে 'ফার্স্ট-ডিগ্রি মার্ডার' বা পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে। গত শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) লিমনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। তিনি অভিযুক্ত হিশামের রুমমেট ছিলেন, যিনি নিজেও ইউএসএফ-এর প্রাক্তন ছাত্র।

প্রসিকিউটরদের দাখিল করা নথিতে বলা হয়েছে, লিমন ও বৃষ্টিকে শেষবার জীবিত দেখার তিন দিন আগে, ১৩ এপ্রিল রাতে হিশাম চ্যাটজিপিটিকে প্রশ্ন করেন, ‘কাউকে কালো প্লাস্টিকের ব্যাগে ভরে ডাস্টবিনে (ডাম্পস্টার) ফেলে দিলে কী হয়?’ চ্যাটজিপিটি এর উত্তরে বলে যে, ‘এটি খুবই বিপজ্জনক’। এর পর হিশাম পাল্টা প্রশ্ন করেন, ‘তারা (তদন্তকারীরা) কীভাবে এটি খুঁজে বের করবে’। 

তবে চ্যাটজিপিটির নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ওপেনএআই এ বিষয়ে এখনো কোনো মন্তব্য করেনি বলে জানিয়েছে এনবিসি নিউজ।

আদালতের নথি অনুযায়ী, ১৭ এপ্রিল হিশামের এক রুমমেট তাকে কিছু কার্ডবোর্ড বক্স তাদের অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সের ডাস্টবিনে ফেলতে দেখেন। সেই ডাস্টবিন তল্লাশি করে পুলিশ লিমনের স্টুডেন্ট আইডি এবং তার নামের ক্রেডিট কার্ড উদ্ধার করে।

সেখানে পাওয়া একটি ধুসর রঙের টি-শার্টের ডিএনএ পরীক্ষার পর লিমনের এবং একটি কিচেন ম্যাটের ডিএনএ বৃষ্টির জিনের সাথে মিলে যায়।

শুক্রবার পুলিশ হাওয়ার্ড ফ্রাঙ্কল্যান্ড ব্রিজের পাশে একটি ভারী প্লাস্টিকের ব্যাগ থেকে লিমনের বিকৃত দেহাবশেষ উদ্ধার করে। ময়নাতদন্তের প্রাথমিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ধারাল অস্ত্রের অসংখ্য আঘাতের কারণে লিমনের মৃত্যু হয়েছে। পুলিশ ধারণা করছে, নিখোঁজ বৃষ্টিও আর জীবিত নেই এবং হিশামই তার দেহ সরিয়ে ফেলেছেন।

প্রতিবেদন অনুসারে, রোববার (২৬ এপ্রিল) তল্লাশিকালে ‘মানুষের দেহাবশেষ’ উদ্ধার করা হলেও তা এখনো শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।

তদন্তকারীরা জানান, হিশাম প্রথমে দাবি করেছিলেন যে তিনি ১৬ এপ্রিল লিমন ও বৃষ্টিকে ক্লিয়ারওয়াটার নামক জায়গায় নামিয়ে দিয়ে এসেছেন। কিন্তু লিমনের ফোনের লোকেশন ডেটা এবং সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, হিশামের গাড়ি সেই রাতে হাওয়ার্ড ফ্রাঙ্কল্যান্ড ব্রিজে দীর্ঘক্ষণ থেমে ছিল, যেখানে পরে লিমনের মরদেহ পাওয়া যায়।

তদন্তকারীরা আরও অভিযোগ করেছেন, হিশাম সেই রাতে বড় ডাস্টবিন ব্যাগ, লাইসল (পরিষ্কারক) এবং সুগন্ধি স্প্রে (ফেব্রেজ) কিনেছিলেন এবং তার অ্যাপার্টমেন্টে রক্তের দাগ পাওয়া গেছে। এছাড়া তিনি বৃষ্টির ব্যবহৃত গোলাপী রঙের ফোন কভারসহ বেশ কিছু জিনিসও ফেলে দিয়েছিলেন।

হিশামের পক্ষে লড়ছেন হিলসবোরো কাউন্টি পাবলিক ডিফেন্ডার অফিসের হোমিসাইড ব্যুরো প্রধান জেনিফার স্প্র্যাডলি। তিনি একটি ইমেইলের মাধ্যমে জানিয়েছেন, এই বিষয়ে তাদের কোনো মন্তব্য নেই।

তদন্তকারীরা জানান, হিশামকে যখন প্রথম জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়, তখন তার বাঁ হাতের একটি আঙুলে ক্ষত দেখা যায় এবং পরে তার পায়েও জখমের চিহ্ন পাওয়া যায়। তিনি দাবি করেছিলেন, পেঁয়াজ কাটার সময় দুর্ঘটনাবশত এই জখম হয়েছে।

নথি অনুযায়ী, গোয়েন্দাদের জিজ্ঞাসাবাদের সময় লিমন ও বৃষ্টির অবস্থান সম্পর্কে জানার কথা অস্বীকার করেন হিশাম। বলেন, তারা কখনও তার গাড়িতে ছিল না। কিন্তু পরে যখন তাকে এমন তথ্য দেখানো হয় যা থেকে বোঝা যায় যে লিমনের ফোনটি ক্লিয়ারওয়াটারে ছিল, যেখানে আবুঘারবিয়েহর গাড়িটিও ছিল, তখন তিনি তার বক্তব্য পরিবর্তন করেন।

আদালতের রেকর্ড অনুযায়ী, হিশামের বিরুদ্ধে হত্যা ছাড়াও শারীরিক নির্যাতন, বেআইনি আটক, মৃত্যুর খবর না দেয়া, মৃতদেহ সঠিক স্থানে না রাখা এবং আলামত নষ্ট করার অভিযোগ আনা হয়েছে। বর্তমানে তিনি জামিন ছাড়াই হিলসবোরো কাউন্টি জেলে আটক আছেন। আগামী মঙ্গলবার তার মামলার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে।

এর আগে, লিমন ও বৃষ্টিকে শেষ কোথায় দেখা গিয়েছিল তা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন। প্রতিবদেন অনুসারে, জামিল লিমনকে সবশেষ গত ১৬ এপ্রিল সকালে টাম্পায় সাউথ ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে প্রায় তিন ব্লক দূরে তার বাড়িতে দেখা গিয়েছিল। আর নাহিদা বৃষ্টিকে সবশেষ দেখা যায় একইদিন সকালে ক্যাম্পাসের প্রকৃতি ও পরিবেশ বিজ্ঞান ভবনে।

লিমনের ভাই জুবায়ের আহমেদের উদ্ধৃতি দিয়ে মার্কিন সংবাদমাধ্যমটি জানিয়েছে, বৃষ্টি ও লিমন দু’জনেই ছিলেন ২৭ বছর বয়সি সম্ভাবনাময় বাংলাদেশি ডক্টরাল শিক্ষার্থী, যাদের শুরুটা হয়েছিল বন্ধু হিসেবে এবং সময়ের সাথে সাথে একে অপরের প্রতি অনুভূতি তৈরি হয়– এমনকি তারা বিয়ের কথাও ভাবছিলেন।

১৭ এপ্রিল এক পারিবারিক বন্ধুর মাধ্যমে লিমন ও বৃষ্টি নিখোঁজ হওয়ার খবর জানানো হয় এবং দিন গড়ানোর সাথে সাথে ফ্লোরিডায় থাকা তাদের বন্ধুরা ও বিদেশে থাকা আত্মীয়রা উত্তর জানার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন।

গেল শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) টাম্পার হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজে লিমনের মরদেহ পাওয়া যায়। এ ঘটনার হিলসবরো কাউন্টি শেরিফ চ্যাড ক্রনিস্টার বলেন, এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক একটি ঘটনা, যা আমাদের সম্প্রদায়কে নাড়া দিয়েছে।

শেরিফের কার্যালয় জানিয়েছে, লিমনের রুমমেটের বিরুদ্ধে লিমন ও বৃষ্টিকে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে বৃষ্টির মরদেহ এখনও পাওয়া যায়নি।

সিএনএন বলছে, টাম্পা বে এলাকা থেকেও লিমন-বৃষ্টির অভাব বহুদূর পর্যন্ত অনুভূত হচ্ছে। উভয় শিক্ষার্থীই তাদের গ্রীষ্মের ছুটিতে বাংলাদেশ ভ্রমণের পরিকল্পনা করেছিলেন।
সূত্র: এনবিসি নিউজ, সিএনএন

প্রিন্ট

আরও সংবাদ