খুলনা | শুক্রবার | ০১ মে ২০২৬ | ১৮ বৈশাখ ১৪৩৩

শ্রমিকের প্রতি মালিকের করণীয়

ড. মুহাম্মদ বেলায়েত হুসাইন |
০২:২২ এ.এম | ০১ মে ২০২৬


মহান আল্লাহ তা’য়ালা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন পরস্পরের উপর নির্ভরশীল করে। মানুষ সমাজবদ্ধ হয়ে বাস করলেও সামাজিক অবস্থান কিন্তু সবার একই রকম নয়। কেউ ধনী, কেউ গরীব, কেউ উঁচু বংশের, কেউ নীচু বংশের, কেউ দক্ষ, কেউ অদক্ষ, কেউ মালিক, কেউ শ্রমিক। আবার এক এক জন এক এক বিষয়ে পারদর্শী। মানুষ তার নিজের বেঁচে থাকার, পরিবারকে ভরণ-পোষণের, অপরের কল্যাণে এবং সৃষ্টি জীবের উপকারে যে কাজ করে, তা-ই শ্রম। আর এই শ্রমে নিয়োজিত ব্যক্তিকে শ্রমিক বলা হয়। শ্রমিকগণ আমাদের মতই মানুষ হিসাবে আমাদেরই অধীনে ন্যস্ত থাকায় আমাদের উপর তাদের ন্যায়সংগত অধিকার রয়েছে।
একজন শ্রমিকের প্রথম অধিকার তার শ্রমের ন্যায্য মূল্য পাওয়া। মহান আল্লাহ তা’য়ালা হাদীসে কুদসীতে বলেছেন-‘এমন তিনটি লোক আছে কেয়ামতের দিন আমি তাদের শত্র“ হয়ে দাঁড়াব। এর মধ্যে তৃতীয় ব্যক্তিটি হচ্ছে, যে পারিশ্রমিকের বিনিময়ে কোন লোক নিয়োগ করে অতঃপর তার কাছ থেকে পুরোপুরি কাজ আদায় করে নেয় কিন্তু তার বিনিময়ে কোন পারিশ্রমিক দেয় না।’ পারিশ্রমিক আদায়ে দীর্ঘসূত্রতা খাদেমদের জন্য একটি কষ্টকর ব্যাপার। সময়মতো বেতন না পেলে তাদের অনেকে ভোগান্তির শিকার হতে হয়। এজন্য শ্রমিকের পারিশ্রমিক আদায়ের তাড়া সম্পর্কে রসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-‘শ্রমিকের পারিশ্রমিক তার ঘাম শুকানোর আগেই দিয়ে দাও।’ (ইবনে মাযাহ)
মালিক শ্রমিকের উপর সামর্থের বাইরে কাজের বোঝা চাপিয়ে দিবে না। এ প্রসঙ্গে রসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, শোনো ধনাঢ্য ব্যক্তিরা, যারা তোমাদের কাজ করছে তারা তোমাদেরই ভাই (ভৃত্য নয়)। আল্লাহ তা’য়ালা এদেরকে তোমাদের অধীন করেছেন। (তোমাদের মাধ্যমে তিনি ওদের রিযিক পৌঁছে দিচ্ছেন) সুতরাং সামর্থের বাইরে তাদের উপর কাজের বোঝা চাপিয়ে দিও না, যদি কিছু বেশি দায়িত্ব তাদের দিতেই হয় তাহলে তুমি নিজে (অথবা অন্য কারো দ্বারা) তাদের সহযোগিতা করো। (বুখারী)
আবু কুলাবা রাযিয়াল্লাহু আনহু আনহু বলেন, হযরত সালমান ফারসী যখন একটি প্রদেশের গভর্নর, তখন এক ব্যক্তি তার কাছে গিয়ে দেখলো, তিনি নিজ হাতে আঁটা তৈরি করছেন। লোকটি জিজ্ঞেস করলেন, এ কী ব্যাপার? হযরত সালমান বললেন আমি আমার খাদেমকে একটা কাজের জন্য বাইরে পাঠিয়েছি। দু’টো কাজেরই দায়িত্ব তার ঘাড়ে চাপানো আমি পছন্দ করিনা। (রাহে আমল)
মালিক নিজেকে কোন দিক দিয়েই শ্রেষ্ঠ মনে করবে না। একে অপরকে ভাই হিসেবে গ্রহণ করবে। শ্রমিক-মালিকের মধ্যে চিরদ্ব›দ্ব মিটিয়ে নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ‘শ্রমিক-মালিক সম্পর্ককে ভ্রাতৃত্বের বাঁধন পরিয়ে দিয়েছেন। হযরত আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রসূলাল্লাহ্  সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন, যখন তোমাদের মধ্য থেকে কারো খাদেম রান্নার গরম ও ধোঁয়ার কষ্ট সহ্য করে তার জন্য খানা তৈরি করে, তারপর সে তার নিকট নিয়ে আসে, তখন মনিবের উচিত, সে যেন এই খাদেমকেও খানার মধ্যে নিজের সাথে বসায় এবং সেও খায়। যদি সেই খানা কম হয় (যা দুইজনের জন্য যথেষ্ট না), তবে মনিবের উচিত, যেন খানা থেকে এক দুই লোকমা হলেও খাদেমকে দিয়ে দেয়। (মুসলিম)
হযরত যুবাইর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খাদেমের সাথে একত্রে বসে খেতে বলেছেন। শ্রমিককে এমন কাজের দায়িত্ব বাধ্যতামূলকভাবে অর্পণ করা যাবেনা যা তার সামর্থ্যে কুলাবে না।
এক হাদীসে আছে, তাদের উপর ততখানি চাপ দেওয়া যেতে পারে, যতখানি তাদের সামর্থ্যে কুলায়। সাধ্যাতীত কোন কাজের নির্দেশ কিছুতেই দেওয়া যেতে পারে না। (মুসলিম)
মালিকের আরেকটি অবশ্য পালনীয় কর্তব্য হলো, শ্রমিককে তার ওপর আল্লাহর ফরজকৃত যাবতীয় ইবাদত যেমন সালাত ও সিয়াম ইত্যাদি সম্পাদনের সুযোগ প্রদান করা।
এছাড়াও শ্রমিকের ভুল-ক্রটিগুলোকে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখা। মানুষ মাত্রই ভুল হয় আর তা ইচ্ছায় হতে পরে আবার অনিচ্ছায়ও হতে পারে। আর ক্ষমা একটি মহৎ গুণ। আমাদের সন্তানেরা কত ভুল করে সে গুলোকে আমারা ভুলই মনে করি না তেমনি ভাবে একজন খাদেমকে নিজের সন্তানের মত মনেকরে তার ভুল-ক্রটিগুলোকে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখা।
এক ব্যক্তি নবী কারীম রসূলাল্লাহ্ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খেদমতে হাজির হয়ে আরজ করল, ইয়া রসূলাল্লাহ! আমি (আমার) খাদেমের ভুল-ক্রটি কতবার ক্ষমা করব?  নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চুপ থাকলেন। ঐ ব্যক্তি আবার  আরজ করল ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমি (আমার) খাদেমের ভুল-ক্রটি কতবার ক্ষমা করব?  নবী কারীম রসূলাল্লাহ্ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করলেন, দৈনিক সত্তর বার। (তিরমিযী)
আমাদের খুব ভালোভাবে মনে রাখতে হবে, কোন কাজই নগণ্য নয় এবং যারা এসব কাজ নিয়োজিত তারাও হীন বা ঘৃণ্য নন। ইসলাম শ্রম দ্বারা উপার্জনকে সর্বোত্তম ঘোষণা করে শ্রমকে অতি উচ্চ মর্যাদায় মূল্যায়ন করেছে।
একবার রসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, কোন ধরনের উপার্জন শ্রেষ্ঠতর? তিনি উত্তরে বললেন, নিজ দৈহিক শ্রমলব্ধ উপার্জন। (আহমদ)
আমাদের প্রিয় নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজ হাতে কাপড়ে তালি লাগিয়েছেন, মাঠে মেষ চরিয়েছেন এছাড়া ব্যবসা পরিচালনাও করেছেন। খন্দকের যুদ্ধে নিজ হাতে পরিখা খনন করেছেন।
এ থেকে বোঝা যায় ইসলাম কোন কাজকেই ছোট করে না দেখে শ্রমিকের সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করেছে।
মহান আল্লাহ তা’য়ালা আমাদেরকে এইসব মেহনতী, শ্রমজীবী, অধিকার বঞ্চিত, মজলুম শ্রমিকদের কল্যাণকামী হওয়ার তৌফিক দান করুন। আমিন। আল্লাহই সর্বজ্ঞ। 
সংকলক : লেখক ও গবেষক।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ