খুলনা | মঙ্গলবার | ০৫ মে ২০২৬ | ২২ বৈশাখ ১৪৩৩

শাপলা চত্বরে হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় নিহত ৫৮ জনের পরিচয় শনাক্ত: চিফ প্রসিকিউটর

খবর প্রতিবেদন |
০২:২৯ পি.এম | ০৫ মে ২০২৬

 

এক যুগ আগে শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের মহাসমাবেশে নারকীয় হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় নিহত ৫৮ জনের পরিচয় শনাক্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম।

আজ মঙ্গলবার (৫ মে) দুপুরে নিজ কার্যালয়ের সংবাদ সম্মেলনকক্ষে সাংবাদিকদের তিনি এ তথ্য জানান।

চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ২০১৩ সালের ৫ মে রাজধানীর মতিঝিলে শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের মহাসমাবেশ ঘিরে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ নিয়ে হওয়া মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার তদন্তে বেশ কিছু তথ্য উঠে এসেছে। ওইদিন শুধু ঢাকাতেই ৩২ জনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। তাদের পরিচয় আমরা শনাক্ত করতে পেরেছি। এর মধ্যে কয়েকজনের ময়নাতদন্ত হয়েছে। এছাড়া পরদিন তথা ৬ মে নারায়ণগঞ্জে নিহত হওয়া ২০ জন, চট্টগ্রামে ৫ জন, কুমিল্লায় একজনসহ ৫৮ জনের পরিচয় আমরা শনাক্ত করেছি।

তিনি বলেন, এ মামলার তদন্তকাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। তদন্তের স্বার্থে আসামিদের নাম প্রকাশ করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে এরইমধ্যে সাবেক একাধিক আইজিপি গ্রেপ্তার রয়েছেন। এছাড়া সরকারপ্রধান থেকে শুরু করে তৎকালীন বাহিনী প্রধানদের যারা জড়িত, তাদের নামও আমরা পাচ্ছি। তদন্তের স্বার্থে এ মুহূর্তে নাম প্রকাশ করছি না। তবে আমাদের এ মামলাটির তদন্ত কাজ প্রায় ৯০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। আগামী ৭ জুনের মধ্যে তদন্ত শেষ হবে বলে আশাবাদী। এরপর ফরমাল চার্জ আকারে দাখিল করা হবে।

আমিনুল ইসলাম বলেন, প্রত্যেক নিহতের পরিবারের সঙ্গে আমরা কথা বলেছি। হেফাজতে ইসলামের সদস্যরা যারা খুনের শিকার হয়েছেন, তাদের পরিবারের সদস্যদের বক্তব্যও আমরা নিয়েছি। সবমিলিয়ে পর্যাপ্ত সাক্ষ্য আমরা পেয়েছি।

সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে আসামি করা হবে কিনা জানতে চাইলে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, আমরা একটি তদন্তের মধ্যে পেয়েছি যে, তিনি ঘটনার সময় দেশের বাইরে ছিলেন। যদি তিনি দেশের বাইরে থাকেন, সেটাও আমরা পর্যালোচনা করে দেখছি। সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসেবলিটি থাকলে বিষয়টিও দেখা হবে।

জানা যায়, পবিত্র কোরআন ও মহানবী (সা.)-এর প্রতি অবমাননার প্রতিবাদসহ ১৩ দফা দাবিতে ২০১৩ সালের ৫ মে ‘ঢাকা অবরোধ’ নামের ওই কর্মসূচির ডাক দেয় হেফাজতে ইসলাম। আলেম সমাজ ও মাদ্রাসা শিক্ষার্থীসহ সারা দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ এতে অংশ নেয়। ঢাকা অবরোধ শেষে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে জড়ো হয় আন্দোলনকারীরা।

হেফাজতের কর্মসূচি ঘিরে দিনভর উত্তেজনা ছিল সেখানে। সেদিন সন্ধ্যার আগেই দুজনের মরদেহ আনা হয় শাপলা চত্বরে নির্মাণ করা অস্থায়ী মঞ্চের সামনে। মধ্যরাতে সমাবেশে আসা আলেম ও মাদ্রাসাছাত্রদের ওপর হামলে পড়ে যৌথ বাহিনী। গুলি, টিয়ারশেল আর সাউন্ড গ্রেনেডের মুখে খালি হয়ে যায় পুরো এলাকা। হতাহত হন অনেকে।

এর আগে ২০২৫ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে নিহতদের মধ্যে ৯৩ জনের পরিচয় প্রকাশ করে হেফাজতে ইসলাম। তখন বলা হয়েছিল, এটি প্রাথমিক তালিকা। যাচাই-বাছাই শেষে এ সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। তারও আগে ২০২১ সালের ১০ জুন মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, চলমান অনুসন্ধানের প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে তারা শাপলা চত্বরে নিহত ৬১ জনের নাম সংগ্রহ করেছে। এর এক মাস পর সংস্থাটির সাধারণ সম্পাদক আদিলুর রহমান খানকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২০১৪ সালে শাপলায় নিহত ৪১ জনকে নিয়ে ‘শহীদনামা’ নামে বই লিখেন হাবীবুল্লাহ সিরাজ।

শাপলা চত্বরে গণহত্যার ১৩ বছর পার হলেও বিচার পায়নি ভুক্তভোগীদের পরিবার। আওয়ামী লীগ আমলে সে বাস্তবতাও ছিল না। জুলাই অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পরপরই হেফাজতের পক্ষে বাদী হয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ করেন সংগঠনের যুগ্ম মহাসচিব আজিজুল হক ইসলামাবাদী। এতে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকারের নাম উল্লেখ করে ৫৪ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দাখিল করা হয়।

আসামিদের মধ্যে আরও রয়েছেন সাবেক স্বরাষ্টমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান, সাবেক তিন আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকার, বেনজীর আহমেদ, এ কে এম শহিদুল হক, পুলিশের সাবেক উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোল্যা নজরুল ইসলাম।

আজিজুল হক ইসলামাবাদী বলেন, ‘তৎকালীন সরকারের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা, মন্ত্রী-এমপিরা জেলে আছেন। বিচার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। সাক্ষী সংগ্রহ করা হয়েছে। আমাদের বিশ্বাস, শাপলা চত্বরে হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী জালিমদের বিচারের মুখোমুখি করতে পারব।’

প্রিন্ট

আরও সংবাদ