খুলনা | শনিবার | ০৯ মে ২০২৬ | ২৬ বৈশাখ ১৪৩৩

সাগরপথে মানবপাচারের ভয়ঙ্কর রুট অপরাধীরা যেন পার না পায়

|
১২:৩০ এ.এম | ০৯ মে ২০২৬


বিদেশি মুদ্রা আয়ের অন্যতম উৎস হলো জনশক্তি রপ্তানি। বলা হয়ে থাকে, রেমিট্যান্স হলো দেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি। অথচ পরিতাপের বিষয় এই যে বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা বিশাল অপরাধচক্র বিদেশে নেওয়ার কথা বলে অগণিত মানুষের সর্বস্ব কেড়ে নিচ্ছে। তাদের বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন তো পূরণ হয়ই না, অনেকের জীবনও রক্ষা হয় না।
স¤প্রতি কক্সবাজার থেকে যাত্রা করা একটি ট্রলার আন্দামান সাগরে ডুবে যাওয়ার পর বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে। ওই ট্রলারে প্রায় পৌনে ৩০০ মানুষকে মালয়েশিয়ায় নেওয়া হচ্ছিল। কিন্তু মাঝসাগরে পাচারকারী চক্র ও যাত্রীদের মধ্যে হট্টগোলের কারণে ট্রলারটি ডুবে যায়। এতে ২৬৪ জন গভীর সমুদ্রে হারিয়ে যান।
মাত্র ৯ জনকে কাকতালীয়ভাবে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। এ ঘটনার খুঁটিনাটি জানতে মাঠে নামে সাংবাদিকদের অনুসন্ধানী টিম। প্রায় এক মাস অনুসন্ধানের পর বেরিয়ে আসে ভয়াবহ সব তথ্য। কক্সবাজার-টেকনাফ এলাকায় গড়ে উঠেছে বিশাল পাচারচক্র, যাদের কাজই হলো নানা প্রলোভন দেখিয়ে কোনোক্রমে লোকদের ট্রলারে তুলে দেওয়া।
অনুসন্ধানে বেশ কয়েকজন পাচারকারী হোতার নাম-পরিচয় জানা গেছে। মৌলভি আব্দুর রহিম, ফয়েজ ওরফে নানা মাঝি, সৈয়দ হোসেন, শাকের মাঝিসহ আরো অনেকের অপতৎপরতা সম্পর্কে জানতে পেরেছে কালের কণ্ঠ। তাঁরা কেজিতে মাছ বিক্রির মতো মাথা হিসেবে মানুষ বিক্রি করে থাকেন। জড়িতরা একসময় মাঝি থাকলেও এখন তাঁরা ‘মানুষ শিকারি’। জানা গেছে, ২০০৫ সাল থেকেই সাগরপথে মানবপাচার শুরু হয়।
২০১০ সালের দিকে এই প্রবণতা ব্যাপক বৃদ্ধি পায়। ২০১৫ সালে থাইল্যান্ড সীমান্তে বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গাদের গণকবর আবিস্কৃৃত হওয়ার পর অনেকের টনক নড়ে। কিন্তু অবৈধ পথে মানবপাচার বন্ধ হয়নি। বিশেষ করে রোহিঙ্গা শিবির ও এলাকার উঠতি বয়সীদের টার্গেট করে থাকে পাচারচক্র। শুধু রোহিঙ্গা ক্যাম্পেই রয়েছে ওই চক্রের ৩৩ এজেন্ট। ট্রলারডুবির ঘটনায় যাঁরা নিখোঁজ রয়েছেন, তাঁদের স্বজনদের দুঃখ-কষ্ট অবর্ণনীয়। আজও অপেক্ষায় আছেন অনেকে। কালের কণ্ঠের টিম এমন কয়েকজনের সাক্ষাৎ পেয়েছে। দুই ছেলেকে হারিয়ে দিশাহারা কৃষক জিয়াউর রহমান। জয়নালের মা এখনো ছেলের আশায় দিন গুণছেন। ইটভাটায় কাজ করেন এনায়েত, তাঁর ছেলেও সেই মরণযাত্রায় শামিল হয়েছিলেন। অন্তঃসত্ত¡া মুবিনা এখনো স্বামী আসার পথ চেয়ে বসে আছেন। এমন অসহনীয় বেদনার ভার বইছেন প্রতারণার শিকার বহু মানুষ।
মানবপাচার সক্রিয় হওয়ার পেছনে বিবিধ কারণ রয়েছে। স্বল্প আয়ের সাধারণ মানুষ, অল্প খরচে বিদেশে যাওয়ার প্রস্তাব সহজে নাকচ করতে পারেন না। রয়েছে সচেতনতার অভাব। আবার সরকারের কড়া নজরদারি না থাকাও এর বড় কারণ। অনেক সময় বিভিন্ন এজেন্সিও বিদেশগামীদের সঙ্গে প্রতারণা করে থাকে।
আমরা মনে করি, সরকার যদি বৈধ পথে বিদেশযাত্রা সহজ করে, তাহলে সাধারণ মানুষ অবৈধ পথে পা বাড়াবেন না। এ জন্য সরকারি সেবা সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আনতে হবে।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ