খুলনা | রবিবার | ১০ মে ২০২৬ | ২৭ বৈশাখ ১৪৩৩

পুলিশ সপ্তাহের কল্যাণ প্যারেড

দলীয় আনুগত্য নয়, পুলিশ চলবে আইন অনুযায়ী: প্রধানমন্ত্রী

খবর প্রতিবেদন |
০৫:০১ পি.এম | ১০ মে ২০২৬

 

পুলিশ কোনো দলের অনুগত হবে না, বরং প্রচলিত আইন অনুযায়ী পরিচালিত হবে—এই বলে স্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

‘পুলিশ সপ্তাহ ২০২৬’ উপলক্ষে আজ রোববার (১০ মে) রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ লাইনস মিলনায়তনে আয়োজিত পুলিশের ‘কল্যাণ প্যারেডে’ তারেক রহমান এ কথাগুলো বলেন। রুদ্ধদ্বার এই আয়োজনে উপস্থিত থাকা পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা প্রথম আলোকে এ তথ্য জানান।

আজ বেলা ১১টার দিকে শুরু হয় পুলিশের কল্যাণ প্যারেড (পুলিশের কল্যাণে সভা)। চলে বেলা ১টা পর্যন্ত। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী, পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। এ ছাড়া সারা দেশ থেকে অনলাইনে যুক্ত ছিলেন পুলিশের সংশ্লিষ্ট সদস্যরা। অনুষ্ঠানে উপস্থিত বিভিন্ন পর্যায়ের পুলিশ সদস্যরা নিজেদের দাবিদাওয়া তুলে ধরেন। পরে প্রধানমন্ত্রী পুলিশ সদস্যদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন।

অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ফ্যাসিবাদী সরকার নিজেদের হীন স্বার্থে পুলিশ বাহিনীকে জনগণের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিল। সেই অন্ধকার সময় পেরিয়ে এখন সময় এসেছে নতুনভাবে এগিয়ে যাওয়ার। জনগণের বিশ্বাস অর্জনই এখন পুলিশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

তারেক রহমান বলেন, প্রযুক্তিগত দক্ষতাসম্পন্ন একটি আধুনিক, মানবিক ও সুদক্ষ পুলিশ বাহিনী ছাড়া জনগণের কাঙ্ক্ষিত সেবা নিশ্চিত করা কঠিন। সরকার সেই লক্ষ্যেই কাজ করছে। পুলিশের যৌক্তিক চাওয়া-পাওয়া ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করা হবে।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে পুলিশের ভূমিকার প্রশংসা করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনে দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে, পুলিশ চাইলে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব করা পালন সম্ভব।

একই সঙ্গে তারেক রহমান বলেন, অতীতে দেশের মানুষ পুলিশের ভিন্ন চিত্র দেখেছে। বাংলাদেশ যেন আর কখনো ফ্যাসিবাদী শাসনে ফিরে না যায়, সেটিই হোক পুলিশ সপ্তাহের অঙ্গীকার।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নসহ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। অতীতে দলীয় স্বার্থে পুলিশকে জনগণের মুখোমুখি দাঁড় করানো হয়েছিল। সেই অন্ধকার সময় পেরিয়ে এখন নতুনভাবে এগিয়ে যাওয়ার সময় এসেছে। পুলিশের কাজ ‘দুষ্টের দমন আর শিষ্টের লালন’। থানায় গিয়ে যেন সাধারণ মানুষ কিছুটা হলেও রাষ্ট্রের মালিকানা অনুভব করতে পারেন, সেটি নিশ্চিত করা পুলিশের দায়িত্ব। কারণ, মানুষ বিপদে পড়েই থানায় যায়। সেখানে গিয়ে তাঁর বিপদ কমবে—এমন বিশ্বাস মানুষের মধ্যে তৈরি করতে হবে।

পুলিশ সদস্যদের উদ্দেশে তারেক রহমান বলেন, আইনের প্রয়োগের পাশাপাশি মানবতার ছোঁয়া থাকলে পুলিশের কাজ জনমনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তিনি পুলিশকে মাঠপর্যায়ে সরকারের ‘অ্যাম্বাসেডর’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, পুলিশ কোনো দলের অনুগত হবে না, বরং আইন অনুযায়ী পরিচালিত হবে। কোনো নিরপরাধ মানুষ যেন হয়রানির শিকার না হয়, তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি। তিনি থানাগুলো এমনভাবে গড়ে তোলার কথাও বলেন, যাতে কোনো ব্যক্তি সুপারিশ বা মধ্যস্থতা ছাড়াই নির্ভয়ে অভিযোগ জানাতে পারেন, আর প্রতিকারও পান।

কমিউনিটি পুলিশিং ও ওপেন হাউস ডের মতো উদ্যোগ অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, জনগণের সঙ্গে পুলিশের আত্মিক সম্পর্ক তৈরি হলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সহজ হবে।

সাইবার অপরাধ, কিশোর গ্যাং, আর্থিক জালিয়াতি, মাদক ও অনলাইন জুয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তারেক রহমান। বিশেষ করে সাইবার বুলিং নারীদের জন্য বড় সমস্যা হয়ে উঠেছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। বলেন, আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে মাদক সরবরাহকারী ও মাদকের উৎসকে টার্গেট করে অভিযান পরিচালনা জরুরি। মাদক, সন্ত্রাস ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট বলে জানান তিনি।

বাংলাদেশ পুলিশকে প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক বাহিনীতে রূপান্তরের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, অপরাধ বিশ্লেষণ সক্ষমতা বাড়ানো, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ও বৈজ্ঞানিক তদন্তপদ্ধতির বিস্তৃত প্রয়োগ এখন সময়ের দাবি। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), বিগ ডেটা অ্যানালাইসিস ও সাইবার সক্ষমতা জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

মানবাধিকার রক্ষা ও আইনের শাসন নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গুম, অপহরণ কিংবা বিচারবহির্ভূত কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার রক্ষা করা পুলিশের নৈতিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব।

পুলিশের বদলি, পদোন্নতি ও নিয়োগে মেধা–যোগ্যতা–দক্ষতা–সততাকে প্রাধান্য দেওয়ার কথা বলেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, পুলিশ সদস্যদের আবাসনসংকট সমাধান, চিকিৎসাসেবা, রেশন ও ঝুঁকি ভাতা বৃদ্ধির বিষয়গুলো সরকারের সক্রিয় বিবেচনায় রয়েছে।

দেশের বর্তমান পরিস্থিতির কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দুর্নীতি, দুঃশাসন, দুর্বল শাসনকাঠামো, অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও ভঙ্গুর অর্থনীতির মধ্যে সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। এর মধ্যেই বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতির মতো চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে। ফলে সব প্রত্যাশা অল্প সময়ে পূরণ সম্ভব না হলেও সরকার ধাপে ধাপে সব অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করবে।

বক্তব্যের শেষ দিকে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অস্ত্রের শক্তির চেয়ে মানবিকতা, ন্যায়বিচার ও নৈতিকতাই বড় শক্তি। একটি সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর, গণতান্ত্রিক, নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশ গড়াই সরকারের লক্ষ্য।

অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন আইজিপি আলী হোসেন ফকির। এরপর পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের সদস্যরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে তাঁদের দাবি তুলে ধরেন। কল্যাণ প্যারেডে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী বক্তব্য দেন। পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ পুলিশ সদস্যদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন। এরপর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পুলিশের উদ্দেশে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দেন। সব শেষে পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (অতিরিক্ত আইজিপি) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে বক্তব্য দেন। অনুষ্ঠান শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পুলিশ সপ্তাহের কেক কাটেন। পরে তিনি পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেন।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ