খুলনা | বুধবার | ১৩ মে ২০২৬ | ৩০ বৈশাখ ১৪৩৩

মোংলায় নিখোঁজ মিরাজের মায়ের বুকফাটা আর্তনাদ

‘যদি অপরাধী হয় বিচার করো, তার পরেও বাজানরে আমার বুকে ফিরিয়ে দাও’

মাহমুদ হাসান, মোংলা |
০২:২১ এ.এম | ১৩ মে ২০২৬


এক মাস তিন দিন ধরে মোংলা চিলা ইউনিয়নের জয়মনির ঘোল এলাকার আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে আছে মা তাছলিমা বেগমের বুকফাটা বিলাপে। গত ১০ এপ্রিল জনসম্মুখে মিরাজ শেখ (৩০) কে তুলে নিয়ে যায় কয়েকজন অপরিচিত ব্যক্তি। তখন থেকেই নিখোঁজ তাছলিমা বেগমের একমাত্র ছেলে।থানা জিডি, প্রতিমন্ত্রীসহ সরকারের বিভিন্ন দফতরে আবেদন করেও আজ অবধি কোনো সন্ধান মেলেনি তার। প্রশাসন থেকে শুরু করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতিটি দ্বারে দ্বারে ঘুরে ক্লান্ত এক মা এখন কেবলই তার সন্তানের 'জীবিত অথবা মৃত দেহের দেখা পেতে চান। নিখোঁজ মিরাজের মা-বাবা স্ত্রী ও ৪ বছরের একটি পুত্র সন্তান রয়েছে। 
পেশায় সুন্দরবনের জেলে ও জীবিকার তাগিদে মোটরসাইকেল চালক মিরাজ শেখ গত ৬ এপ্রিল স্থানীয় বাচ্চু ও রফিকুলকে সঙ্গে নিয়ে সুন্দরবনে মাছ ধরতে যান। চার দিনের পরিশ্রম শেষে ১০ এপ্রিল তারা লোকালয়ে ফিরে আসেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, ওইদিন সন্ধ্যা ৭টার দিকে জয়মনির ঘোল এলাকার একটি দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় হঠাৎ কয়েকজন অপরিচিত লোক মিরাজকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যায়। সেখানে উপস্থিত সাধারণ মানুষ কিছু বুঝে ওঠার আগেই একটি নৌযানে করে তাকে দ্রুত ওখান থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। এরপর থেকে পরিবারের সাথে তার আর কোনো যোগাযোগ নেই।
সন্তানের একটি ধুলোবালি মাখা ছবি বুকে জাপটে ধরে কাঁদতে কাঁদতে মা তাছলিমা বেগম বলেন “আমার কলিজার টুকরো মিরাজরে মানুষের সামনে থেইকা ধইরা নিয়া গেল। এক মাস পার হইয়া গেল, কেউ কইতে পারে না ও কই আছে। ও যদি কোনো দোষ কইরা থাকে তবে দেশের আইন আছে, বিচার হোক। কিন্তু ওরে কেন লুকাইয়া রাখা হইছে? আমার পোলারে কি ওগো কিছু করেছে, ওরে মনে হয় মাইরা সাগরে ভাসাইয়া দিছে?”
বিলাপ করতে করতে তিনি আরও বলেন, আমি কোনো বিচার চাই না, আমি শুধু আমার পোলার মুখ খানা একবার দেখতে চাই। ও কি খাইতে পাইছে? ওরে কি খুব মারছে? আমি আল্লাহর কাছে বিচার দিছি, কিন্তু প্রশাসনের কাছে হাত জোড় করি, আমার একটি মাত্র পোলা-আমার পোলারে আমার কোলে ফিরাইয়া দেন।”
মিরাজের নিখোঁজের ঠিক ১২ দিন পর গত ২২ এপ্রিল দুপুরে তার বন্ধু বাচ্চুকে মোংলা কোস্ট গার্ডের একটি দল নিজ বাসা থেকে তুলে নিয়ে যায়। রাতে বাচ্চুকে মোংলা থানায় সোপর্দ করা হলেও মিরাজের বিষয়ে তারা কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেনি। স্থানীয়দের এবং পরিবারের প্রবল সন্দেহ কোস্ট গার্ডের কোনো অভিযানের সময়ই মিরাজকে তুলে নেওয়া হয়েছে। তবে বাহিনীর পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক স্বীকারোক্তি পাওয়া যায়নি।
মিরাজের স্ত্রী মুক্তা খাতুন স্বামীর জীবন রক্ষায় এবং তাকে ফিরে পেতে গত ১ মে মোংলা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। এছাড়া সরকারের পরিবেশ বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলামসহ সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত আবেদন জানানো হয়েছে। কিন্তু তদন্তের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় পরিবারের উদ্বেগ এখন আতঙ্কে রূপ নিয়েছে।
মিরাজ ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তার নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে অভাবের ছায়া নেমে এসেছে পরিবারটিতে। একদিকে একমাত্র ছেলের শোকে শয্যাশায়ী মা তাছলিমা, অন্যদিকে দুই চোখে অন্ধকার দেখছেন তার স্ত্রী। স্থানীয় জয়মনি এলাকার বাসিন্দাদের মাঝেও এই রহস্যজনক নিখোঁজের ঘটনায় চাপা ক্ষোভ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে।
সুন্দরবনে দস্যু দমনে কোস্ট গার্ডের ‘অপারেশন ম্যানগ্রোভ শিল্ড’ সফল হচ্ছে বলে যখন খবর আসছে, ঠিক তখনই লোকালয় থেকে একজন সাধারণ মানুষের এমন অন্তর্ধান প্রশাসনের পেশাদারিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। জয়মনিবাসী ও নিখোঁজ মিরাজের পরিবারের এখন একটাই দাবি, অবিলম্বে মিরাজকে উদ্ধার করে জনসমক্ষে আনা হোক।
নিখোঁজের বিষয়ে জানতে চাইলে মোংলা সহকারী পুলিশ সুপার  মোংলা সার্কেল) মোঃ রেফাতুল ইসলাম বলেন, মিরাজ শেখের নিখোঁজের ঘটনায় তার পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। আমরা বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তদন্ত করছি। তাকে উদ্ধারের জন্য আমাদের গোয়েন্দা তৎপরতা ও অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অন্য কোনো ইউনিট তাকে আটক করেছে কি না, সে বিষয়েও আমরা তথ্য সংগ্রহ করছি। নিখোঁজ যুবকের অবস্থান নিশ্চিত করতে পুলিশ সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
প্রশাসনের প্রতি সাধারণ মানুষের এখন একটাই দাবি, অবিলম্বে নিখোঁজ মিরাজকে খুঁজে বের করে তার মায়ের কোলে ফিরিয়ে দেওয়া হোক এবং এই রহস্যের জট খুলে জনমনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনা হোক। তাছলিমা বেগমের চোখের জল যেন কোনো ভাবেই রাষ্ট্রীয় অবহেলার প্রতীক হয়ে না দাঁড়ায়, সেটাই এখন দেখার বিষয়। 

প্রিন্ট

আরও সংবাদ