খুলনা | বৃহস্পতিবার | ১৪ মে ২০২৬ | ৩১ বৈশাখ ১৪৩৩

প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা বিপর্যস্ত, ক্ষুব্ধ অভিভাবক

মোংলায় দল হারলেও সরকারি টাকায় ৫০ শিক্ষকের ফুটবল বিলাস

মোংলা প্রতিনিধি |
০১:০৭ এ.এম | ১৪ মে ২০২৬


মোংলা উপজেলায় প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। একদিকে চলছে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের প্রথম সাময়িক পরীক্ষা, অন্যদিকে রয়েছে বিভিন্ন রকম ছুটি। শিক্ষার্থীদের দিকে খেয়াল না করে স্কুলের ক্লাস ফাঁকি দিয়ে এবং সরকারি তহবিল খরচ করে শিক্ষকদের ‘ফুটবল বিলাস’ ও প্রমোদ ভ্রমণের মহোৎসব চলছে। জেলা পর্যায়ের গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টে নিজেদের দল লজ্জাজনক ভাবে হেরে বিদায় নেওয়ার মাত্র দুই দিনের মাথায় শিক্ষার্থীদের ক্লাসে না বসিয়ে ৫০ জন শিক্ষক-শিক্ষিকা সরকারি টাকায় ফাইনাল খেলা দেখার নামে আনন্দ ভ্রমণে মেতে উঠেছেন। শিক্ষক সমিতি ও উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদের এমন চরম উদাসীনতা ও দায়িত্বজ্ঞানহীনতায় ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন স্থানীয় অভিভাবক ও সচেতন মহল। শিক্ষকদের এমন কর্মকান্ডে শিক্ষা বঞ্চিত হয়ে উপজেলা জুড়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো থেকে প্রতিনিয়ত ঝরে পড়ছে শিশুরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মোংলা উপজেলার পৌরসভাসহ ৭টি ইউনিয়নে মোট ১৪টি দল এবারের প্রাথমিক গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টে অংশ নেয়। এর মধ্যে ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ের প্রতিযোগিতা শেষে জেলা পর্যায়ে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে দু’টি দল। এরা হচ্ছে বালক গ্র“পে মোংলা দ্বিগরাজ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং বালিকা গ্রæপে উত্তর বাশতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। নিয়ম অনুযায়ী দল দু’টিকে নিয়ে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন শিক্ষকের মাঠে থাকার কথা থাকলেও ঘটেছে উল্টো ঘটনা। জেলা পর্যায়ের খেলা দেখার অজুহাতে কোনো প্রকার অফিশিয়াল অনুমতি ছাড়াই ১১ জন শিক্ষক-শিক্ষিকা স্কুল ফাঁকি দিয়ে জেলা সদরে অবস্থান নেন। সেখানে খেলার মাঠে না থেকে তারা জেলা শহরের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে বেড়ানোর অভিযোগ উঠে। কিন্তু গত ১০ মে প্রথম পর্বের খেলাতেই মোংলার এই দু’টি দলই হেরে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নেয়।
জানা গেছে ছাত্র-ছাত্রীরা মাঠ থেকে হেরে বিদায় নিলেও শিক্ষকদের ভ্রমণ বিলাস থামেনি। দল বিদায় নেওয়ার ঠিক দুই দিন পর ফাইনাল খেলা দেখার উছিলায় বুধবার সকালে মোংলার প্রায় ৫০ জন শিক্ষক-শিক্ষিকার একটি বিশাল বহর আবারও জেলা সদরের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। অভিযোগ উঠেছে এই বিশাল প্রমোদ ভ্রমণের পেছনে খরচ করা হচ্ছে সরকারি টাকা, যা মূলত প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন ও শিশুদের কল্যাণে বরাদ্দ ছিল। অথচ খেলায় মোংলার কোনো অস্তিত্ব না থাকা সত্তে¡ও সরকারি টাকায় শিক্ষকদের এই আনন্দ ভ্রমণকে ‘বিলাসিতা’ ও ‘অর্থের অপচয়’ হিসেবে দেখে ক্ষুব্ধ অভিভাবকেরা।
স্থানীয় অভিভাবকদের অভিযোগ, বর্তমানে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে প্রথম সাময়িক পরীক্ষা চলছে এবং বছরের প্রথম থেকেই তেমন পড়াশুনা করতে পারেনি শিক্ষার্থীরা। এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে শিক্ষকেরা ক্লাসে উপস্থিত থেকে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া বা খাতা মূল্যায়নের পরিবর্তে মাঠের বাইরে বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। শিক্ষকদের এই ভ্রমণ পিপাসু মানসিকতা ও দায়িত্বহীনতার কারণে মোংলার প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। নিয়মিত ক্লাস না হওয়া এবং শিক্ষকদের উদাসীনতার কারণে দরিদ্র পরিবারের শিশুরা পড়ালেখার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে এবং প্রতিনিয়ত স্কুল থেকে ঝরে পড়ছে শিশুরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক অভিভাবক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমাদের ছেলে মেয়েরা পরীক্ষায় কী লিখবে তা নিয়ে আমরা চিন্তিত। আর শিক্ষকেরা সরকারি টাকা উড়িয়ে দল হেরে যাওয়ার পরও জেলা শহরে আনন্দ ফুর্তি করছেন। দেখার যেন কেউ নেই। শিক্ষক সমিতি এবং স্থানীয় শিক্ষা কর্মকর্তাদের যোগসাজসেই এই অনিয়ম ঢাকা দেওয়া হচ্ছে বলে দাবি তাদের। পরীক্ষা চলাকালীন এত বিপুল সংখ্যক শিক্ষক কীভাবে স্কুল ফাঁকি দিয়ে এবং অনুমতি ছাড়া স্টেশন লিভ (কর্মস্থল ত্যাগ) করে জেলা সদরে অবস্থান করছেন তা নিয়ে এখন এলাকায় তীব্র সমালোচনা চলছে। সচেতন মহল অবিলম্বে এই ‘ভ্রমণ বিলাসী’ শিক্ষকদের চিহ্নিত করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং মোংলার প্রাথমিক শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
এই চরম অনিয়ম ও শিক্ষকদের স্টেশন লিভ (কর্মস্থল ত্যাগ) করার বিষয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা পিন্টু রঞ্জন দাসের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কোনো সদুত্তর বা আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দিতে রাজি হননি। তবে মোংলা উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ললোন কুমার মন্ডল ঘটনার সত্যতা পরোক্ষভাবে স্বীকার করে বলেন, গোল্ডকাপ টুর্নামেন্ট ফাইনাল খেলা দেখার জন্য উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আবেদন জানালে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শিক্ষকদের ফুটবল খেলা দেখতে যাওয়ার জন্য অনুমতি দিয়েছেন। তবে চলতি পরীক্ষা ও পাঠদান বর্জন করে এত বিপুল সংখ্যক শিক্ষকের একসঙ্গে জেলা শহরে অবস্থান করার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুতর এবং নিয়মবহির্ভূত। 
মোংলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মারমিন আক্তার সুমী বলেন, ছাত্র-ছাত্রীদের পড়াশোনার ক্ষতি করে কোনো ধরনের ভ্রমণ বিলাস বরদাশত করা হবে না। এছাড়া সরকারি টাকা অপচয়ের যে অভিযোগ উঠেছে, তা খতিয়ে দেখতে উপজেলা শিক্ষা অফিসারদের সাথে যোগাযোগ করা হচ্ছে। অনুমতি ছাড়া কর্মস্থল ত্যাগ (স্টেশন লিভ) এবং দায়িত্ব অবহেলার প্রমাণ মিললে জড়িত শিক্ষকদের বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। 

প্রিন্ট

আরও সংবাদ